৩ উপজেলার ধানে ব্লাস্ট ভাইরাসের আক্রমণ

বিশেষ প্রতিনিধি, আমিনুল ইসলাম ও এনামুল হক
সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার হাওরের ব্রি-২৮ জাতের ধান ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ক্রমশই এ রোগ বিস্তার লাভ করায় চিন্তিত হয়ে ওঠেছেন কৃষকরা। কৃষকরা বলেছেন,‘ফসল ভাল হলেও ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ধানের গোছা ( গোটা আসা ধানের গোছা) সাদা হতে থাকায় তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের দায়িত্বশীলরা বলেছেন,‘ব্লাস্ট ভাইরাস থেকে ধান রক্ষা করতে প্রচারপত্র বিলিসহ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা হাওরে গিয়ে ওষুধ স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছেন।’ কৃষি কর্মকর্তারা অবশ্য বলেছেন,‘ধান গাছ একটি পর্যায়ে আসার পর (ধানের গোটা আসার পর) ওষুধ স্প্রে করলে এই ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না, কিন্তু ২-৩ দিন বৃষ্টি হলেই এই ভাইরাস থাকবে না।’ কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি পুরো জেলায় এই পর্যন্ত ১২০ হেক্টর জমির ধান ব্লাস্ট ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। কৃষকদের দাবি আক্রান্ত জমির পরিমাণ আরো অনেক বেশি।
সরেজমিনে তাহিরপুরের শনির হাওর ও মাটিয়ান হাওর ঘুরে দেখা গেছে, ‘কেবল ব্রি-২৮ জাতের ধানই ব্লাস্ট ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। জমিতে চাষ করা ব্রি-২৮ ধানের শীষ (ধানের গোটা) বের হওয়ার পরই শীষ হলুদ রং ধারণ করে সাদা হয়ে যায়। আর শীষের নীচের অংশের গিঁটের ভেতর কালো রং ধারণ করে। ব্লাস্ট ভাইরাসে আক্রান্ত শীষে ধান হয় না। সব ধানই সাদা রং ধারণ করে চিটা হয়ে যায়।
তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে উচ্চ ফলনশীল ব্রি-২৮ ধানের শীষ বের হলেই ব্লাস্ট
ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। হাওরের জমিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এ রোগটি। আক্রান্ত জমির ধান গাছে কৃষকরা বালাই নাশক ব্যবহার করছেন। কিন্ত ধানের চারা রোগ মুক্ত হচ্ছেনা।
কৃষকরা জানিয়েছেন, উপজেলার শনির হাওরের একাংশ, আঙ্গারুলি, মাটিয়ান ও দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের লামাগাঁও গ্রামের পাশের হাওরে ২৮ জাতের ধানে ব্লাস্ট ভাইরাস দেখা দিয়েছে।
উপজেলার বালিজুড়ি ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের কৃষক আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, ‘গত বছর ফসল হারানোর পর সারাবছর কষ্টে কাটিয়েছি। এবার জমির ধানে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে আমরা চিন্তিত। রোগ সারাতে জমিতে ছত্রাক নাশক ন্যাটিভো বা ট্রুপার স্প্রে করলেও রোগমুক্ত হচ্ছে না ধান গাছ। এ অবস্থায় নিরুপায় হয়ে পড়েছি আমরা।’
শনির হাওরপাড়ের গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক সেলিম আখঞ্জি বলেন,‘শনির হাওরে ৬ একর জমিতে ব্রি-২৮ জাতের ধান চাষাবাদ করেছি করেছি। ২-৩ দিন আগে থেকে ধানের শীষ সাদা হতে দেখি। কৃষি কর্মকর্তাকে বলার পর তারা এক ধরনের স্প্রে এনে জমিতে দেবার জন্য বলেন। প্রতি একর জমিতে প্রায় এক হাজার টাকা খরচ করে স্প্রে ব্যবহার করছি, কিন্তু কাজ হচ্ছে বলে মনে হয়নি আমার। এই অবস্থা দেখে ভীষণ চিন্তিত আমি। প্রতিদিনই আক্তান্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে।’
একই গ্রামের নজরুল ইসলাম ব্লাস্ট ভাইরাসে আক্রান্ত জমিতে স্প্রে ছিটাতে ছিটাতে বললেন,‘প্রতি কেয়ারে (৩০ শতকে) ৩ থেকে ৪০০ টাকার কীট নাশক স্প্রে করতে হচ্ছে। আমাদের পক্ষে এই টাকা সংগ্রহ করাই কঠিন। কীভাবে ব্লাস্ট ভাইরাস দূর করবো।’
ধর্মপাশা উপজেলার কয়েকটি হাওরে গত দুইদিনে ২৫ হেক্টর জমির বোরো ফসল ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ক্রমশ এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে ব্রি- ২৮ জাতের সতেজ ধান গাছগুলোতে। এতে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কৃষকেরা জমিতে বালাইনাশক ব্যবহার শুরু করেছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত স্প্রে মেশিন না থাকায় বালাইনাশক ব্যবহারের কাজ মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। এদিকে স্থানীয় বালাইনাশক বিক্রেতারা সুযোগ বুঝে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকাও হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কৃষকেরা স্থানীয় বাজার ছেড়ে পার্শ্ববর্তী মোহনগঞ্জ বাজার থেকেও বালাইনাশক ক্রয় করছেন। এতে কৃষকের সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে একের পর এক হাওরের ফসল বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলার মধ্যনগর থানার শালদিঘা, বোয়ালা, কাইল্যানি, বাইনছাপড়াসহ বিভিন্ন হাওরের বোরো ফসলে ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত শুক্রবার সকাল থেকে এসব হাওরের কৃষকেরা তাদের জমিতে ছত্রাক জাতীয় ব্লাস্ট রোগের লক্ষণ দেখতে পান। ধানের শীষ বের হওয়ার পর তা বিবর্ণ হয়ে বিনষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক ও জনপ্রতিনিধিরা শনিবার বিষয়টি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে জানান।
কৃষি কর্মকর্তারা পরামর্শ দিয়েছেন, দ্রুত বালাইনাশক স্প্রে করতে পারলে যে সকল ধান গাছ এখনো আক্রান্ত হয়নি তা রক্ষা করা যাবে। তবে স্প্রে মেশিনের স্বল্পতা এখন প্রধান অন্তরায় এখানে।
মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার জানান, তিনি মোহনগঞ্জ থেকে ২০টি স্প্রে মেশিন মধ্যনগরে সরবরাহ করিয়েছেন। ওইসব হাওরে অর্ধশতাধিক স্প্রে মেশিন সরবরাহ করা হলে বালাইনাশক ব্যবহার দ্রুত শেষ করা যাবে। বালাইনাশক বিক্রেতারা বেশি দামে বালাই নাশক বিক্রি করছেন বলেও জানান তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শোয়েব আহমেদ জানান, মধ্যনগরের কয়েকটি হাওরে ২৫ হেক্টর জমির ফসল ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছে। অনেক আগেই লিফলেট বিতরণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ ব্যাপারে কৃষকদের সচেতন করা হয়েছ এবং তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে স্প্রে মেশিনের স্বল্পতা রয়েছে এখানে। এ রোগ প্রতিরোধে স্থানীয় কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার আঙ্গারুলি হাওরের ব্রি-২৮ জাতের ধানে ব্লাস্ট ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হয়েছে। দ্রুত পুরো হাওরে ছড়িয়ে পড়ছে এই রোগ।
বিশ্বম্ভরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপন কুমার বর্মণ বলেন,‘আঙ্গারুলি হাওরের কমপক্ষে ৫০ হেক্টর জমিতে ব্লাস্ট ভাইরাস আক্রমণ করেছে। এই হাওরে প্রায় চার হাজার হেক্টর জমি রয়েছে। দ্রুত ভাইরাস ছড়ানোয় কৃষকরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।’
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন,‘ব্লাস্ট রোগ সাধারণত ধানে তিন পর্যায়ে দেখা দেখা যায়। ধানের বীজ তলায়, শানের কিটে এবং ধানের শীষ বের হওয়ার সময় ধানের ছড়ায়। এর ফলে ধানের ছড়া ভেঙ্গে যায়। তাহিরপুরে এই পর্যন্ত ৩০ হেক্টর জমিতে এ রোগের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। তবে প্রকৃতি বিরূপ থাকলে দ্রুত এ রোগ আরো বিস্তার লাভ করবে। এজন্য আমরা কৃষকদের ব্লাস্ট রোগাক্রান্ত এবং ভালো দুই ধরনের জমিতেই ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে বলেছি। আমরা কৃষি কর্মকর্তারার সার্বক্ষণিক কৃষকদের পাশে থেকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার সাহা বলেন,‘২ লক্ষ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে এবার বোরো আবাদ করা হয়েছে। ফসলের সার্বিক অবস্থাও ভালোই। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও কোথাও ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ হয়েছে। জেলার ৩ টি উপজেলার ১২০ হেক্টর জমিতে ব্লাস্টের আক্রমণ হয়েছে। বিশেষ করে ২৮ ধানে এ রোগের প্রকোপ বেশী। এ ব্যাপরে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সহ সবাই কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন, লিফলেট বিতরণ করছেন, বিভিন্ন বিষয়ে প্রেসক্রিপশন করছেন। মূলত. জমিতে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় এ রোগ দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে ব্লাস্টের প্রকোপ কমে আসবে।



আরো খবর