৩ ধর্ষণ মামলার রায়/ স্বস্তির সমাজ নির্মাণে এই রায়গুলো তাৎপর্যপূর্ণ

কোনো সমাজ থেকে কখনও শতভাগ অপরাধ প্রবণতা দূর করার কোনো সম্ভাবনা হয়তো নেই কিন্তু সভ্য সমাজে তাৎপর্যপূর্ণ বিচার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অপরাধীদের সাজা প্রদানের মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। তাই যেকোনো দেশের বিচার ব্যবস্থা বা কাঠামোর তৎপরতা বিবেচনা করে ওই দেশের অপরাধ প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অপরাধীরা যখন অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ পায় তখন একদিকে সে যেমন আরও বড় অপরাধীতে পরিণত হয় তেমনি অন্যরাও নতুন নতুন অপরাধে যুক্ত হওয়ার উৎসাহ পায়। মানুষের সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে বিষফোড়ার মতো বিস্তৃত হয়েছে বহুমাত্রিক অপরাধপ্রবণতা। একই সাথে সমাজের ভারসাম্যপূর্ণ স্থিতাবস্থা বা বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে উদ্ভব ঘটেছে নতুন নতুন আইন ও বিচার কাঠামোর। শুধু আইন ও কাঠামো থাকলেই চলে না, দরকার পড়ে আইনের যথাযথ ও দ্রুত প্রয়োগের। এজন্য বিচার ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। স্বাক্ষ্য ও প্রমাণ নির্ভর বিচার ব্যবস্থায় অপরাধীর অপরাধ আদালতে প্রমাণ করতে হয়। এই প্রমাণ করার বিষয়টি খুব জটিল, যা সাধারণ মানুষের জন্য অনেকক্ষেত্রেই সঠিক বিচার পাওয়ার পথকে রুদ্ধ করে। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা, প্রচুর অর্থ খরচের বাস্তবতা, প্রমাণাদি হাজির করার জটিল প্রক্রিয়া; সবকিছু মিলিয়ে আমাদের দেশে আর্থিকভাবে সংগতিহীন মানুষের জন্য ন্যায়সঙ্গত বিচার পাওয়ার বিষয়টি অনেকক্ষেত্রেই সোনার হরিণ পাওয়ার মতো বিষয় হয়ে উঠে। অপরাধের শিকার নির্যাতিত ও অধিকার হারা মানুষের দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও অনেকক্ষেত্রে সুবিচারকে ‘নিরবে নিভৃতে কাঁদতে’ দেখি আমরা। এরকম এক বাস্তবতায় সুনামগঞ্জের আদালত অঙ্গন থেকে বৃহস্পতিবার কিছু আশা জাগানিয়া খবর পাওয়া গেল।
পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে বৃহস্পতিবার তিনটি ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে বলে জানা যায়। এ দিন বাসে এক তরুণীকে ধর্ষণ চেষ্টার মামলায় জড়িত বাস চালককে ৫ বছরের সশ্রম কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, একটি গণধর্ষণের মামলায় ৪ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ও ১২ লাখ টাকা করে জরিমানা এবং অন্য আরেকটি ধর্ষণ মামলার আসামীকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদ- ও ২০ হাজার টাকা জরিমানার রায় এসেছে। এই রায়গুলো সমাজের জন্য অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ। বিচারিক প্রক্রিয়ায় যেখানে অনেক মামলা রায় অবধি পৌঁছাতে পারে না সেখানে তিনটি ধর্ষণ মামলার রায় হওয়া এবং অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করার ঘটনাটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এই বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সকল পক্ষ সমূহ, বিচারক থেকে শুরু করে আইনজীবী ও বাদীপক্ষ; সকলের কার্যকর ভূমিকা ছিল। নতুবা এই মামলাগুলোর সফল নিষ্পত্তি সম্ভব ছিল না। সাধারণ মানুষ হিসাবে আমরা এক দিনে ৩ ধর্ষণ মামলার রায় এবং অপরাধীদের শাস্তির খবর শুনে কিছুটা হলেও স্বস্তি অনুভব করছি। বিচারিক প্রক্রিয়ায় জড়িত পক্ষসমূহকে আমাদের অভিনন্দন।
আইন কেবল বইয়ে লিখা কিছু শব্দ ও বাক্যসমষ্টিমাত্র। এই বইয়ের কথাগুলো অর্থবহ হয়ে তখনই উঠে যখন এর কার্যকারিতার সাথে জড়িত ব্যক্তিগণ দায়িত্বশীল আচরণ করেন তখন। আলোচ্য ৩ ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। আমরা চাই সকল ক্ষেত্রেই এমন দায়িত্বশীল আচরণের দৃষ্টান্ত তৈরি হোক। কেবল তা হলেই আমরা প্রত্যাশার শান্তিপূর্ণ, বসবাসযোগ্য ও অপরাধমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জায়গায় যেতে পারব। আইন ও বিচার ব্যবস্থা এরকম গতিশীল থাকুক এটিই আমাদের আকাক্সক্ষা।