৬০% চিকিসক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন- ফাঁপা বুলি নয়, কার্যকর কিছু করুন

সোমবার ১২ মার্চ ২০১৮ খ্রি. তারিখে জাতীয় দৈনিক সমকালের পুরো প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠা সাজানো ছিলো চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অবস্থান না করা নিয়ে। ৮ কলাম ব্যাপী প্রধান সংবাদ শিরোনাম ছিল ‘কর্মস্থলে থাকেন না ৬০% চিকিৎসক’। এই প্রধান শিরোনামের আওতায় ‘তদারকির দায়িত্ব কার’, ‘গ্রামের কর্মস্থলে থাকতেই হবে:স্বাস্থমন্ত্রী’, ‘কর্মস্থল আকর্ষণীয় করতে হবে’, ‘বাইরোটেশন কাজ করেন চিকিৎসকরা’ উপশিরোনামভূক্ত করে ৪টি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। একই দিনের পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠাটিও ছিল চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে নানাবিধ প্রতিবেদনে ঠাসা। শিরোনামগুলো হলো:- ‘বর্হিবিভাগে রোগীর ভরসা মেডিক্যাল অফিসার’, ‘চিকিৎসকরা যখন ইচ্ছা আসেন, যান’, ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দেখা মিলে না’, ‘হাওরে অবর্ণীয় দুর্ভোগ’, ‘বরগুনায় চিকিৎসক পাওয়া দায়’, ‘ডাক্তার আসেন দেরিতে, যান তাড়াতাড়ি’, ‘দ্বীপাঞ্চলে কেবলই জোড়াতালি’, ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসেন সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন’, ‘কাগজপত্রেই চিকিৎসক পদায়ন বাস্তবতা ভিন্ন’, ‘মোগো চিকিৎসার ভার আল্লার উপর ছাইর‌্যা দিছি’। পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠাটিও ছিল স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রতিবেদনে ভরা। এ পৃষ্ঠার সংবাদ শিরোনাম হলো:- ‘রামেক হাসপাতালে চিকিৎসক থাকছেন, চিকিৎসাও মিলছে’ এবং ‘বড় জেলাতেও একই চিত্র’। ১৬টি ছোট-বড় প্রতিবেদন ছিল সোমবারের দৈনিক সমকালে। বুঝা যায় বেশ পরিকল্পনা করে তারা সারাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বাস্তবতা নিয়ে এই আয়োজনটি করেছেন। বলাবাহুল্য প্রকাশিত ১৬টি প্রতিবেদনের মধ্যে একমাত্র রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের খবরটি ছাড়া বাকি ১৫ প্রতিবেদনই ছিল নেতিবাচক। যেখানে প্রধানত ফুটে উঠেছে কর্মস্থলে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির কারণে স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো ভেঙ্গে পড়ার কাহিনি। সমকালের এই প্রতিবেদনগুলোকে যেকোন ব্যক্তিমাত্রই বাস্তবতার নির্যাস হিসাবে বিবেচনা করবেন। কারণ দেশের প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে, বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় এমন বাস্তবতা নৈমিত্তিক।
প্রতিবেদনে বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয়েছে চিকিৎসক উপস্থিতির হার খুলনায় ৪৭.৬১%, সিলেটে ৪২.৯১%, ঢাকায় ৪২.৬৭%, বরিশালে ৪১.৯২%, রাজশাহীতে ৪০.৯০%, রংপুরে ৪০.৬১%, চট্টগ্রামে ৩৭.৪০% ও ময়মনসিংহে ৩১.৫৩%। মোটামোটি ঢাকার কাছাকাছি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্বলিত ময়মনসিংহ বিভাগে চিকিৎসক উপস্থিতির হার সবচাইতে কম (৩১.৫৩%)। এই পরিসংখ্যানটি আবার পালটে যাবে যদি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মফস্বলের হাসপাতালের মধ্যে তুলনা করা হয় তখন। তখন দেখা যাবে মফস্বলে চিকিৎসক উপস্থিতির হার অনেক কম। সুনামগঞ্জের বাস্তবতা কী? এখানে চিকিৎসকরা অনুপস্থিত থাকবেন কি, যেখানে অনুমোদিত পদের ৬২% ভাগই পদেই কোন পদায়ন নেই। জেলার ২৫০ চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯৪ জন। এই ৯৪ জনের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক নানা কারণে কর্মস্থলে নেই। গড়পড়তা সুনামগঞ্জ জেলায় চিকিৎসক উপস্থিতির হার তাই ২০% এর বেশি হবে না। এমন অবস্থায় একটি অঞ্চলের সরকারি স্বাস্থ্য পরিসেবা কাঠামো যে সব ধরনের কার্যকারিতা হারাবে তাতে আর আশ্চর্য্য কি।
স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর এমন করুণ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশা করেন সাধারণ নাগরিক সমাজ। জনগণের করের টাকায় ডাক্তারি বিদ্যা আয়ত্ব করে (বেসরকারি মেডিক্যাল থেকে পাস করা চিকিৎসকরা বাদে) গণকর্মচারি হিসাবে যোগদানের পর চিকিৎসকরা জনগণের স্বাস্থ্যসেবা দানে এমন অনীহা প্রদর্শন করবেন এটি তারা মেনে নিতে নারাজ। সময় এসেছে, স্বাস্থ্যসেবার এমন করুণ অবস্থা নিয়ে সরকারের বাস্তবিক কিছু উদ্যোগ গ্রহণের। ফাঁপা বুলি নয়, কার্যকারিতা রয়েছে এমন কিছু করার।