৬ ডিসেম্বর ও ঐতিহ্যমন্ডিত ইতিহাসের ধারাক্রম

গতকালকের দিনটি সুনামগঞ্জের জন্য ছিল বিশেষ তাৎপর্যমন্ডিত। ১৯৭১ সনের এই দিনে অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর তারিখে অগ্রসরমাণ মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে সুনামগঞ্জ শহর থেকে পালিয়ে যায় পাকবাহিনি। মুক্ত হয় সুনামগঞ্জ। এদিনেই ছাতক শহরও হানাদার মুক্ত হয়। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের এই দুই গৌরবের ঘটনা ছাড়াও এই জনপদের দুই কৃতী ব্যক্তির একজন যেমন এই দিনে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে মৃত্যুবরণ করেছিলেন তেমনি আরেক কীর্তিমানের জন্ম হয়েছিল একই তারিখে । মরমি কবি হাছন রাজা ৬৮ বছরের জীবনকাল শেষে ১৯২২ সনের ৬ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে ১৯০১ সনের ৬ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাউল কামাল পাশা। এইসব ঐতিহাসিক ঘটনা ও কৃতী পুরুষদের কারণে ৬ ডিসেম্বর তারিখটি আমাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ববহ। এরকম স্মৃতিবহ তারিখগুলো নানাবিধ চেতনা ও আবেগের ঝুড়ি নিয়ে সকলের সামনে হাজির হয় প্রতিবছর। ব্যক্তি মানুষ বিশেষ এই দিনটির সাথে জড়িত ঘটনা ও ব্যক্তিদের স্মরণে, বন্দনায় বিশেষ বিশেষ কর্মসূচীর আয়োজন করে তারিখটির মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট হন। মানুষের সভ্যতার পরম্পরার বৈশিষ্ট্যই এরকম। নতুবা অতীতের সাথে বর্তমানের মেলবন্ধন ঘটত না। মানুষ যদি স্মৃতিকাতর না হত, মানুষ যদি অতীত দ্বারা আন্দোলিত না হত, মানুষ যদি ইতিহাসের ধারাবাহিকতার ভার বহন না করত; তাহলে মূলত কোন ইতিহাসই তৈরি হত না। ইতিহাস মানুষ তৈরি করে আবার মানুষই সেটি ধরে রাখে, এগিয়ে নেয়; এইভাবেই সভ্যতার বিকাশ ঘটে। সুতরাং অতীতে সংঘটিত যেকোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপঞ্জি বা স্মৃতিপুঞ্জ মানব সভ্যতার চিরকালীন সম্পদ। এই সম্পদ ক্রমাগত বর্ধনশীল। ৬ ডিসেম্বর তারিখটি তাই আমাদের নিকট অমূল্য সব ঐশ্বর্য্যম-িত একটি দিবস। এই দিনের স্বর্ণপ্রভাযুক্ত সূর্যোদয় আমাদের সকলের মুখাবয়বকেই রাঙিয়ে তুলে।
৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ ও ছাতক শহর মুক্ত হওয়ার ঘটনা এবং হাছন রাজার মৃত্যু ও কামাল পাশার জন্ম; এই সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে সমৃদ্ধ করার উপাদান। এই সবগুলো ঘটনাই পরষ্পর পরষ্পরকে সমৃদ্ধ করে নিজেরা একটি ঐকতান তৈরি করেছে। সেই ঐকতানটি হল, বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ। সেই ইতিহাসের কোন সুদূর সময়ে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা, ক্রমাগত প্রচেষ্টায় তাঁরা নিজেদের একটি জাতিতে পরিণত করেছিলেন, জাতিগত অহংকারের বীজ বপন করেছিলেন। পরবর্তী প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধারাবাহিকভাবে সেই বীজকে বিশেষ যতœ ও পরিচর্যা করে আজকের সোনার বাংলায় পরিণত করেছে। গুরুত্বপূর্ণ থেকে তুচ্ছ পরিমাণে হলেও সকলের নিরন্তর সাধনার ফসল আজকের এই দেশ-মানুষ, আমরা। সুতরাং আমরা সেইসব ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করি এবং একারণেই ইতিহাসের প্রতি রয়েছে আমাদের দায়বদ্ধতা। লজ্জার বিষয় হল, এই জাতির কিছু মানুষই আবার ইতিহাসের এই ধারাক্রমকে অস্বীকার করে নিজের সাথে নিজে প্রতারণা করে আসছে। এরা নিজস্ব ঐতিহ্যের বদলে ভিন্ন কোন ঐতিহ্য বা আদর্শের দাসত্ব করে তৃপ্তি পায়। ঐতিহাসিক দিবসগুলো সেইসব সংখ্যাল্প জাতিবিরোধীর মুখোশ উন্মোচনের সুযোগ করে দেয়। আমরা দিনগুলোতে যেমন চেতনায় হৃদ্ধ হই তেমনি ঘৃণায় তীব্র হই জাতি-দেশ বিরোধীদের প্রতি।
৬ ডিসেম্বর যেসব ঐতিহাসিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে এই জনপদ, এই তারিখের আগে ও পরে আরও অগণন যেসব তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে; আসুন তার সবই আমরা ধারণ করি। ধারণ করি নিজস্বতাকে সমৃদ্ধ করতে। নিজেকে জানার, সম্মান করার ও হৃদ্ধ হওয়ার এই দিবসগুলো অমলিন থাকুক চিরকাল।