৭২’র সংবিধানকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে-সেলিম

স্টাফ রিপোর্টার
ডাকসুর প্রথম ভিপি ও সিপিবি’র সাবেক সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, অনেকে বলে জাতীয় ঐক্য দরকার। আমিও বলি সবাই এক হয়ে দাঁড়ানো উচিত। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জায়গায় দেশকে ফেরত নিয়ে যেতে হবে। ৭২ সংবিধানের মূল মর্মবস্তু প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই জায়গায় যেতে না পারলে ভিশন ২০৩০, ২০৪০, ২০৫০ বাস্তবায়ন হবে না। ভিশন মুক্তিযুদ্ধ ৭১, এই জায়গাটায় মনকে স্থির করে দাঁড় করাতে হবে। না হলে আমরা এগুতে পারবো না। দেশ স্বাধীন করার পর আমাদের খুবই প্রয়োজন ছিল সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক বিপ্লব সূচনা করার। আমরাও ভুল করেছি। আত্মসমালোচনা করি, আমরা এটাকে গুরুত্ব দেইনি। সেই ভুল ত্রুটির অপরাধ এখন আমাদেরকে দিতে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাতে সুনামগঞ্জ পৌরসভার মুক্তমঞ্চে কমরেড বরুণ রায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ৩ দিনব্যাপী আয়োজনের শেষ দিন আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, গ্রামে বেগুন বিক্রি হয় ৬ টাকায়। এদিকে ঢাকা শহরে বিক্রি হয় ৬০ টাকায়। আপনি বলে দিলেন বাজারের কাজ বাজার করেছে, এটা হবে না। বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। উৎপাদক ও ভোক্তার সমবায় করতে হবে। মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগী থাকতে পারবে না। ক্ষমতা প্রয়োজন মানুষের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। কিন্তু যেনো তেনো উপায়ে ক্ষমতায় গেলে আপনি জিম্মি হয়ে যাবেন। এই কম্পিটিশন আমাদের দেশকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। মানুষকে বাঁচানোর উপায় হলো বারবার প্রসুন কান্তি রায় (বরুণ রায়) দের মতো মানুষের কাছে আমাদের ফিরে আসতে হবে। সবটা যে হয়ে যাবে তা’না, কিন্তু আমরা আগের আদর্শের রাজনীতির সূচনা করতে পারবো। রাজনীতিকে বাঁচানো যাবে।
তিনি বলেন, রাজনীতিতে তর্ক বিতর্ক হবে, অসুবিধা নাই। অনেকে বলে আপনারা কমিউনিস্ট পার্টি কেন সরকারের সঙ্গে চলে আসেন। আমাদের এখানে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। আমরা কেন সরকারের সঙ্গে যাবো। সরকার সরকারের মতো চলুক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, যা সে দাবি করে অসুবিধা নাই। কিন্তু বিরোধী দলও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই থাকা উচিত।
তিনি বলেন, বরুণ রায় কেবল সুনামগঞ্জের কিংবা সিলেটের নেতা নন তিনি সমগ্র বাংলাদেশের একজন জাতীয় নেতা। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ যে পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, এখন বরুণ রায়দের স্মরণ করা ব্যতিক্রমী ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, যারা অস্ত্রের জোরে, ধনসম্পদের জোরে, যারা লুটপাটের বাহাদুরি দেখিয়ে মানুষের ভিতরে ভীতি ও লোভ সঞ্চার করে তার বিরুদ্ধে আদর্শবাদী মানুষকে সামনে নিয়ে আসাও জাতির বড় কর্তব্য। আমি অনেক সময় বলি রাজনীতিতে এখন পলিটিক্স ঢুকে গেছে। কে কয় কেজি চাল দিলাম, কেমন ভাবে ভাওতা দিলাম, বলি। যেনো রাজনীতিতে প্রতারণাটাই এখন বাহাদুরির কাজ। মানুষ মনে করছে এটাই নিয়ম হয়ে যাবে। এখান থেকে আর বের হওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, শামসুর রহমান বলেছিলেন, দেশে এখন কৃষ্ণপক্ষ চলছে। কিন্তু আমাদেরকে তিনি এও আবার বলেছেন, এই কৃষ্ণপক্ষ চিরদিন থাকবে না, আবার শুক্লপক্ষ আসবে। এর প্রমাণও আমরা পাই, উদাহরণ- শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। কেউ কল্পনাও করতে পারে নাই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আবার একটা গণজাগরণ হবে। বঙ্গবন্ধুও বলতেন, বাংলাদেশ পলিমাটির দেশ। বর্ষায় কাদামাটি আর চৈত্র মাসে শক্ত। সেই দিকে বরুণ রায়ও কিন্তু আমাদের নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
বরুণ রায়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ৬৯ গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের সংগ্রামী ছাত্র নেতাদের নিয়ে গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা ব্রিফিং করছিলেন। সেখানে নেতারা বলছিলেন, এটা ড্রেস রিহার্সেল আরও বড় সংগ্রাম আসছে। সেখানে কয়েকজন নেতার সাথে বরুণ দা উপস্থিত ছিলেন। তিনি দরাজ গলায় গেয়েছিলেন, ‘এ বখতকি আওয়াজ হে মিলকে চলো’। বলেছিলেন. ‘আইয়ুব খানকে ধাক্কা দিয়েছি, এখন ইয়াহিয়া খানকে ধাক্কা দিতে হবে।’ মুক্তিসংগ্রামের সময় আগরতলার একটা বাসায় বেস ক্যাম্পে মাঝে মাঝে আমাকে যেতে হতো। সেখানে বরুণ দা কে দেখতাম। বলতেন, খোলা তলোয়ার শিশুর মতো। আমি সেই একই কথা নজরুলের ভাষায় বলতে চাই, ‘এক হাতে তার বাঁশের বাঁশরি, আর এক হাতে রণ তুর্য।’ এটা বরুণ দা সম্পর্কে আমার অন্যতম একটা মূল্যায়ণ। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয় যখন আমি ক্ষেতমজুর আন্দোলন করি সেই সময়।
তিনি বলেন, বরুণ রায় পার্লামেন্টের মেম্বার ছিলেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে আমরা একসাথে কাজ করেছি। আমাদের জাতিকে যদি রক্ষা করতে হয় তাহলে বরুণ দা’দের মতো মানুষকে বারবার স্মরণ করতে হবে। তবে তাকে জাদুঘরে বা সম্মানের আসনের প্রতিষ্ঠা করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হবে না। আমরা কি পারি না প্রতিদিন তাকে আমাদের হৃদয়ে ধারণ করতে। আমাদের জীবনের প্রত্যেকদিন কাজে কর্মে তিনি আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। তিনি সাধারণ মানুষ এবং সাধারণের মানুষ। সাধারণের মানুষ সবাই হতে পারে না। বরুণ রায় সাম্যবাদী সভ্যতার স্বপ্ন দেখতেন, কমিউনিজমের স্বপ্ন দেখতেন, মার্কসবাদ-লেলিনবাদ বিশ্বাস করতেন। এই বিশ্বাস করেছেন বলেই তিনি সাধারণের মানুষ ছিলেন। এটাই তাকে অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িকতা আমদানি করেছিল ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদ। তাদের হাত দিয়েই দেশ ভাগ হলো। সেটাকে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠানিক করা হলো। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক অগতান্ত্রিক ভাবধারাকে নাকচ করে এটা নেগেট করে আমরা বাংলাদেশের জন্ম দিলাম। এটা পাকিস্তানকে দ্বি-খন্ডিত করার সংগ্রাম ছিল না। পাকিস্তানের হাত থেকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম ছিল। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল আচরণের পরিবর্তে একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম। আমাদের লড়াইয়ের দুইটা ধারা ছিল প্রধান। একটা জাতীয়তাবাদী ধারা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ। আরেকটা ছিল বামপন্থি ধারা-ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন। একসময় সমস্ত জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতাকে ভুলে গেলে আমরা কিন্তু শীর্ষ পর্যায়ের তাৎপর্য বুঝতে পারবো না। বিজয়ের মাসে আমরা সংবিধান রচনা করি। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র। একটার সঙ্গে আরেকটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। দুইটা মানবো আর দুইটা মানব না এটা হবে না। মওলানা ভাসানি বলেছিলেন, ভোটের আগে ভাত চাই। কিন্তু আমরা বলেছিলাম- না। ভোটও চাই, ভাতও চাই। মানুষকে যদি রুটি রোজির পথ না দেখাতে পারি তাহলে মানুষের ভেতরে অদৃষ্টবাদী চিন্তা চেতনা প্রসারিত হবে। আর এটার উপর ভিত্তি করে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো বিকশিত হবে। আগুন দিয়ে আগুন নেভানো যায় না। জামায়াত ইসলামীর সাথে ফাইট করতে আপনি হেফাজকে আনবেন এটা হতে পারে না। কে বেশি ইসলাম পছন্দ এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে আপনি সাম্প্রদায়িকতাকে পরিবর্তন করতে পারবেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা গাইতাম, ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।’ কিন্তু এখন ফুলের বাগান না, দেশ ক্যাসিনো আর ক্যাকটাসে ভরে গেছে।
সবশেষে আমি বছরব্যাপী কর্মসূচি এবং সর্বশেষ বরুণ দা’কে নিয়ে তিনদিনব্যাপী আয়োজনের জন্য সমস্ত জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।