১৭ লাখ টাকার গভীর নলকূপে পানি ওঠেনি

আকরাম উদ্দিন
১৭ লাখ টাকা ব্যয়ের গভীর নলকূপ একদিনের জন্যও কৃষকদের উপকারে আসেনি। শুরু থেকেই নলকূপটি অকেজো থাকায় ৫শ’ বিঘা জমি চাষের আওতায় আসেনি। স্কিমের জমি চাষাবাদের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) কর্তৃক সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ভৈষারপাড় এলাকায় ২০১৬ সালে ১৮ ডিসেম্বর এই গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় দীর্ঘ ২ বছর যাবত অকেজো রয়েছে নলকূপটি।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার উত্তর বাড্ডা এলাকার মেসার্স মাজেদা এন্টারপ্রাইজকে এই গভীর নলকূপ স্থাপনের কার্যাদেশ দেয়া হয়। কার্যাদেশ পেয়ে সুনামগঞ্জ বিএডিসি’র তত্ত¡াবধানে কাজ শুরু করে এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কাজ করার সময় ১.৫ ইঞ্চি টেষ্ট বোরিং না করে সরাসরি ৫৩৮ ফুট বোরিং করে কাজ শেষ করা হয় নলকূপটির। কাজের শেষে ৫ দিন পর বোরিং ওয়াস না করেই পাইপ ফিল্টার স্থাপন করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে গভীর নলকূপ দিয়ে পানি আসা বন্ধ হয়ে যায়।
গভীর নলকূপটি সচল করতে এলাকার কৃষকদের পক্ষে মো. শাহ আলম জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয় ।
এই নির্দেশ পাওয়ার পর সরেজমিনে গিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী শেখ আজমল হোসেন।
তিনি চলতি বছরের ৪ জুলাই তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন নলকূপটির ফিল্টার ফেটে গেছে, এ কারণে পানির সাথে কাদাবালি চলে আসে এবং ৬/১৪ ইঞ্চি পাইপের জুড়ায় ফাটল ধরায় এই ত্রুটি দেখা দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর এই প্রতিবেদন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গত ১০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের নিকট পাঠান। এরপর এই বিষয়ে আর কোন অগ্রগতি হয়নি।
নলকূপ সচল না হওয়ায় ৫শ’ বিঘা স্কিমের জমি পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করতে পারছেন না কৃষকরা।
ভৈষারপাড় গ্রামের কৃষক সারপিন মিয়া, আবুল মারজান, আব্দুল মান্নান ও আব্দুর রউফ বললেন,‘আমরা একই জমিতে একাধিক ফসলের আবাদ করে থাকি। আমাদের আশা ছিল নলকূপ স্থাপন হলে স্কিমের ধানের জমি চাষাবাদ করা যাবে। আমাদের আয় বাড়বে। এলাকার কৃষকদের মুখে হাসি ফুটবে। কিš‘ গভীর নলকূপটির পানিই আমাদের দেখা হয়নি। শুনেছি অকেজো নলকূপের বিল ঠিকাদারকে পরিশোধ করেছেন কর্তৃপক্ষ।’
বাঘমারা গ্রামের সফর আলী, নুরুল হক ও সামছুল হক বললেন,‘নলকূপটি অকেজো থাকায় গ্রামের পাশের হাওরে প্রায় ৫শ’ বিঘা স্কিমের জমি চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। এবারও স্কিমের জমির চাষাবাদের মওসুম এসেছে। যদি এই মওসুমের আগে গভীর নলকূপটি সচল না হয়, তবে স্কিমের জমি অনাবাদী থাকবে।’
ঢালাগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী বলেন,‘আমাদের জীবনমানের উন্নয়নের লক্ষ্যে এই গভীর নলকূপটি সরকারিভাবে স্থাপন করা হয়েছিল। কিš‘ সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের নানা অবহেলায় এখনও অকেজো হয়ে পড়ে আছে। আমাদের কথা কেউ শুনে না।’
গভীর এই নলকূপ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন,‘গভীর নলকূপটি স্থাপনকালেই অকেজো হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে একাধিকবার জানিয়েছি। কিš‘ নলকূপটি সচল করতে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। আমি এলাকার পক্ষ থেকে এই গভীর নলকূপটি দ্রুত সচল করার দাবি জানাই।’
বিএডিসি’র একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এই গভীর নলকূপ স্থাপন, বিদ্যুতের লাইন সংযোগ, পাইপ স্থাপন, ড্রেনেজ ব্যবস্থাকরণসহ প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বিএডিসি’র সিলেট বিভাগীয় ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্প’এর আওতায় কাজের বাস্তবায়ন করা হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে শুধু নলকূপ স্থাপনের জন্য বিল পরিশোধ করা হয়েছে ১২ লাখ ৮০ হাজার ৩৩০ টাকা।
বিএডিসি কর্তৃপক্ষ এই নলকূপ স্থাপনে ১৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে তথ্য দিলেও উপকারভোগী কৃষকরা দাবি করেছেন, এই গভীর নলকূপ স্থাপন করতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
সুনামগঞ্জ বিএডিসি’র সহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান এই নলকূপ বসানোর তদারকিতে ছিলেন। তিনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে নলকূপ অকেজো থাকা অবস্থায় বিল পরিশোধ করতে সহযোগিতা করেছেন এমন অভিযোগ একাধিক কৃষকের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান অবশ্য বলেছেন,‘গভীর নলকূপটি স্থাপনের পর পরীক্ষাকরণের সময় ডিজেল দিয়ে চালু করে যথারীতি পানি পাওয়া গেছে। এর কিছুদিন পর বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে নলকূপটি চালু করার সময় শুনেছি পানি ওঠেনি। গত এক বছর আগে আমি জামালপুরে বদলি হয়েছি। কোনো কিছু জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের বিএডিসি অফিসে গিয়ে জানুন। কাজের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকেও এ বিষয়ে জানার জন্য ফোন করতে পারেন।’
আপনি গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় অকেজো হওয়া নলকূপের বিল পরিশোধ করতে সহযোগিতা করেছেন এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়ভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে মাহমুদুল হাসান বলেন,‘আপনি কেমন সাংবাদিক, এই বিষয়ে জানতে এতো দিন পর আমাকে ফোন দিয়েছেন। আপনার যা খুশি লিখে দেন, আমার কিছুই হবে না। আমি কোনো দিন সুনামগঞ্জে আসবোও না।’ এ কথা বলেই মুঠোফোনের লাইন কেটে দেন তিনি।
উপসহকারী প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বললেন,‘ভৈষারপাড়ের গভীর নলকূপটি আগে বসিয়ে বিদ্যুৎ লাইনের জন্য ডিমাÐনোট দেওয়া হয়েছিল। পরে এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ হয়।’
হাবিবুর রহমান জানান, স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শাহ আলম জানিয়েছেন নলকূপটিতে পানি ওঠছে না। বিষয়টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গভীর নলকূপে পানি ওঠার আগে বিল পরিশোধ করা হলো কীভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘এটি টেকনিক্যাল সমস্যা, পানি ওঠা, না ওঠা লেয়ারের উপর নির্ভর করে।’ লেয়ারের বিষয়টি আগে কেন যাচাই করা হলো না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘এর বেশি জানতে চাইলে আমি এখন ছুটিতে রয়েছি, সুনামগঞ্জে আসলে সরাসরি কথা বললে বুঝানো যাবে।’
বিএডিসি’র সুনামগঞ্জের বর্তমান সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ খালিদুজ্জামান বলেন,‘মাটির গভীরে কোনো সমস্যা থাকায় পানি ওঠছে না নলকূপে। এটা টেকনিক্যাল সমস্যাও হতে পারে। এজন্য আমরা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই নলকূপটি আমরা মেরামত করে দেব। যদি মেরামতের পরেও এই নলকূপে পানি ওঠে না, তখন স্থানান্তর করে স্থাপন করা হবে।’