অকাল বন্যার হাত থেকে বোরো ফসল রক্ষার জন্য বৃহৎ প্রকল্প প্রয়োজন

রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু

অধ্যক্ষ পরিমল কান্তি দে
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পড়তে হয় বার বার। তবুও কৃষকরা স্বপ্ন দেখে, আশায় বুক বাঁধে। আশা এমন একটি বিশ্বাস যা থেকে অভীষ্ট পথের দিকে নিয়ে যায়। আশা ছাড়া জীবন অন্তঃসার শূন্য। আশা হলো অসীম অন্ধকারের মধ্যেও আলো আর চেতনার শক্তি।
সরকার বছর বছর বোরো ফসল রক্ষার জন্য বাঁধ নির্মাণ করার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। কিন্তু দেখা যায়, যে বছর অকাল বন্যার তীব্র ভাবে ঢল আসে তখন ফসল রক্ষা করা কষ্টকর হয়। প্রাথমিক ভাবে ঢল থেকে রক্ষার জন্য দুর্বল বাঁধ বা কোনটিতে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় ফসল রক্ষা সম্ভব হয় না। তাছাড়া নদীগুলি পলি পড়ে ভরাট হওয়ার কারণে ধারণ ক্ষমতা না থাকায় ফুলে ফেঁপে উঠে তীর সহজে প্লাবিত হয়ে যায়। তাই সঠিক সময়ের মধ্যে মজবুত বাঁধ নির্মাণ শেষ করা এবং সহজে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য নদী খনন করা প্রয়োজন। নদী খনন ছাড়া কেবল ফসল রক্ষা বাঁধ দিয়ে বোরো ফসল রক্ষা করা সম্ভব নয়। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে আমাদের নদীগুলোকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমাদের নদীগুলো প্রায় বিলীন। এর জন্য চাই বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ। এছাড়া সুরমা-কুশিয়ারা থেকে মেঘনা নদী পর্যন্ত যেসব স্থানে ডোবা সড়ক বা যেসব বাঁধ সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতে হবে।
গত ২রা জুন সিলেটে ‘হাওরবাসীর বাজট প্রত্যাশা’ শীর্ষক আয়োজক ‘পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার’ এক সভায় অকাল বন্যার হাত থেকে বোরো ফসল রক্ষার জন্য ৫ বছর মেয়াদী ২০ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প প্রনয়ন ও অর্থ বছরের জন্য বাজেটে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প প্রনয়ন এবং অর্থবছরের জন্য বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের দাবি জানানো হয়। কিন্তু দেশের বাজেট পাশ হলেও বাজেটে এই জাতীয় কোন বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। নিমেষেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কিন্ত আন্তরিক প্রচেষ্টা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে এখন যেসব স্থানে অধিক পলি জমে পানি নিষ্কাশনে বাঁধা সৃষ্টি করছে সেগুলি চিহ্নিত করে ড্রেজিং করে দিলে নদীর উত্তাল ¯্রােতে নদী খননের কাজ কিছুটা এগিয়ে থাকবে। বর্তমানে নদীতে যে উত্তাল ¯্রােতে সেটা সম্ভব।
এবছর হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রি। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ও তলিয়ে যাওয়া ফসল দেখার পর ২টি প্রকল্পের ঘোষণা দেন। তিনি ১৪ টি নদী খনন করা ও ৯০ টি কজওয়ে নির্মাণের কাজ চলতি বছরের শেষদিকে প্রকল্প দুটির কাজ শুরু হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
সুনামগঞ্জে বোরো চাষীরা সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে চাষবাষের কাজ শুরু করেন। পৌষ মাস বা তারও কিছু পরে অর্থাৎ ডিসেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্ত চারা রোপনের কাজ শেষ হয়ে যায়। এপ্রিল-মে মাস পর্যন্ত ফসল কাটা চলতে থাকে। বৃষ্টি শুরু হয় মার্চ বা এপ্রিল মাসের প্রথম থেকে। তখনই সম্ভাবনা থাকে পাহাড়ি ঢল আসার। কাজেই প্রাথমিক ঢল থেকে হাওরগুলিকে রক্ষা করতে হলে হাওরের বাঁধগুলি অবশ্যই সময়মতো শেষ করতে হবে। সেই হিসাবে সম্ভাব্য প্রকল্পগুলির অনুমোদনের কাজ অক্টোবর মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। যদি এর মধ্যে কোন প্রকল্প বাদ দিতে হয়, তা পরে বুঝে বাদ দেয়া যেতে পারে। নভেম্বর মাসের মধ্যে অবশ্যই পিআইসি গঠন করতে হবে। পি.আই.সি গঠনের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দা, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি দেখে, বাঁধ সংলগ্ন হাওরে জমি আছে তাদের নিয়ে গঠন করতে হবে। স্থানীয় শিক্ষক ও অন্যান্য মান্য ব্যক্তিবর্গকে সম্পৃক্ত করা একান্ত দরকার। কোনো অবস্থাই প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষীদের বা সিন্ডিকেটদের থেকে পি.আই.সি কমিটিকে দূরে রাখতে হবে। এজন্য উপজেলা প্রশাসনের উপর দায়িত্ব অর্পন ও প্রভাব সৃষ্টি করা থেকে দূরে রাখতে হবে।
প্রতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে অনেক বাঁধের কাজ শুরুই হয় মার্চ মাসে। কাজেই নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শেষ করার জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয় সরকারি প্রশাসনের নিবিড় তদারকি থাকতে হবে। প্রয়োজনে পি.আই.সি বাতিল করে নতুন পি.আই.সি কে দায়িত্ব দিতে হবে। যেসব স্থানে বাঁধ ভাঙ্গার সম্ভাবনা থাকে সেসব স্থানে কাজ শুরু করার সময় বাঁশের আঁড় দিয়ে মাটি ফেলতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাঁধের কাজ থেকে মাটি কেটে বাঁধে ফেলা হচ্ছে এবং বাঁধের যতটুকু ঢাল থাকার কথা তা দেওয়া হয় না। এতে বাঁধ দুর্বল হয় এবং পানির তোড়ে সহজেই বাঁধ ভেঙ্গে যায়।
বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম বন্ধ করা। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়মতো বাঁধ নির্মান করা এবং সামাজিক কমিটি গ্রহণ করে ও প্রশাসনের তদারকির উপর জোর দিতে হবে।
বোরো ফসলের ক্ষতি হলে একদিকে দেশের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমে যাবে। চালের দাম বাড়বে। এর কষ্ট ভোগ করতে হবে জনগণকে। অন্যদিকে যেসব কৃষকদের ফসল নষ্ট হয় তাদের জীবনে নেমে আসে সর্বনাশ ছাড়া আর কিছু নয়। বাঁধ ভেঙ্গে ফসল নষ্ট হওয়া মানে কৃষকের শিশু সন্তানদের ভবিষ্যৎ লেখাপড়া শেষ। মেয়েদের বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি। ঋণের বোঝা মাথায় নিবে, জমি হারাবে, নিস্ব হবে। ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তগুলো নি¤œবিত্ত হবে এবং শেষতক অনেকেই পথে বসিয়ে ছাড়বে।
এজন্য আশু ভিত্তিক কাজগুলো করে ফেলতে হবে
ক্স পরিকল্পিত ভাবে সঠিক স্থানে বাঁধ নির্মাণ করা।
ক্স কৃষকদের সম্পৃক্ততাসহ গণশুনানির মাধ্যমে পি.আই.সি গঠনে প্রশাসনের অধিকতর পদক্ষেপ গ্রহণ।
ক্স নির্ধারিত তারিখের মধ্যে সকল কাজ সম্পন্ন করা।
ক্স সর্বোপরি জরুরী ভিত্তিতে নদী খনন করা।
তাই এর প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন। একদিকে হাওরের মাছ, ধান দিয়ে দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা হয়। অন্যদিকে হাওরের ফসল রক্ষাসহ হাওরবাসীর জীবন মান উন্নয়নের জন্য এবং স্থায়ীভাবে ফসল রক্ষার দিক বিবেচনা করে বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়ে এখনি কাজ শুরু করার জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি।