অগ্রহায়ণেই চৈত্রের দশা/ হাওর শুকিয়ে মৎস্য আহরণের অভিযোগ

সাইদুর রহমান আসাদ
পৌর শহরের মল্লিকপুরের বাসিন্দা মো. আব্দুল হান্নান। কালিপুর ও মল্লিকপুরের মাঝামাঝি হাওরে (পুকুর ডুবি বড় নালা চান্দি) তিনি প্রায় ১৫ কেয়ার (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) জমিতে বোরো ফসল আবাদ করেন। এবার আগাম জমি থেকে পানি সরে গেছে। পানির অভাবে জমিতে ধরেছে ফাটল। একারণে বোরো চাষাবাদে অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে তার।
আব্দুল হান্নান জানালেন, এই জমিতে আবাদ করে সারা বছরের খাবার সংগ্রহ করেন তিনি। এবার বিলের ইজারাদার বেশি মাছ ধরার জন্য হাওরের পানি নিষ্কাষণের নালা কেটে দিয়েছে। এতে হাওর শুকিয়ে জমি ফেটে গেছে। এই অবস্থায় তার জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা রয়েছে তার।
শুধু আব্দুল হান্নান নয়, এই হাওরে আবাদকৃত সকল কৃষকদেরই একই অবস্থা। বোরো জমিতে অসময়ে পানি নেমে জমি শুকিয়ে ফেটে গেছে। ‘পুকুর ডুবি বড় নালা চান্দি’ হাওরের মাঝেই ছোট একটি বিলের ইজারা দিয়েছে প্রশাসন। ‘পুকুর ডুবি মৎস্য সমবায় সমিতি নামে’ একটি সংগঠনকে এই বিলের ইজারা দেয়া হয়েছে।
হাওরের সমস্ত মাছ যাতে সহজেই ইজারাদারের গভীর বিলে যায় সেজন্য শুকিয়ে ফেলা হলো জমির পানি। পানি আটকানোর জন্য কৃষকদের দেয়া বাঁধ কেটে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে বিলের ইজারাদারের বিরুদ্ধে। পানির অভাবে তিনশ হেক্টর বোরো জমি অনাবাদি থাকার অশংকা করছেন কৃষকরা । অগ্রহায়ণ মাসে পানি থাকার কথা এই হাওরে, বর্তমান চিত্র একদম উল্টো। দেখলে মনে হবে চৈত্র মাসের খরায় জমি ফেটে চৌঁচির।
এলাকাবাসির অভিযোগ, বিলের মাছ ধরার জন্য ইজারাদার হাওরের নালা কেটে পানি ছেড়েছে। এতে হাওরের পানি শুকিয়ে আবাদি জমি ফেটে গেছে।
এনিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে এলাকাবাসি চলতি মাসের ২২ তারিখ লিখিতভাবে অভিযোগ জানিয়েছেন। তারা অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, গত বছর ইজারাদার বিলের পানি মেশিন দিয়ে শুকিয়ে মাছ ধরার কারণে কিছু জমি পানির অভাবে আবাদ করা যায় নি। এবারও পানি নিষ্কাষণের নালা কেটে পানি শুকানো হয়েছে। এই কারণে হাওরের কয়েকশ একর জমি অনাবাদি থাকার আশংকা রয়েছে।
মল্লিকপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল রকিব বললেন, এই হাওরে আমার ৪ কেয়ার জমি আছে। ইজারাদার তাদের বিলে বেশি মাছ ধরার জন্য হাওরের পানি নিষ্কাষণের খাল কেটে দিয়ে দিয়েছে। এখন আমাদের জমিতে পানি নেই। জমি শুকিয়ে ফেটে গেছে।
কালিপুরের বাসিন্দা মো. গোলাপ মিয়া বললেন, আমাদের পানি আটকিয়ে রাখার জন্য অনেক অনুরোধ করেছি তাদের। শুনেনি তারা, খাল কেটে পানি ছেড়েছে। এখন জমি শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে। এবার আর আবাদ করতে পারবো না।
পৌরসভার প্যানেল মেয়র আহমদ নুর বললেন, এই বিলের চারপাশে প্রায় তিনশ একর ফসলি জমি রয়েছে। প্রতিবছরই বিলের পানি নিষ্কাষণ নিয়ে ইজারাদারের সঙ্গে কথা হয়। বারবার নিষেধ করার পরেও তারা আমাদের কথা শুনেন না। আরও মামলা মোকদ্দমার হুমকি দেয়। তারা প্রতিবছরই বিল শুকিয়ে মাছ ধরে।
তিনি বলেন, আমাদের চার গ্রামের মানুষ এখানে বোরো ধান আবাদ করেন। এবার এখনও বীজ তলা তৈরি হয় নি। ইতিমধ্যেই হাওরের যতো পানি ছিলো সব চেড়ে দিয়েছে তারা। একারণে অনেক কৃষক এবার চাষাবাদ করতে পারবে না।
পুকুর ডুবি মৎস্য সমবায় সমিতির সহসভাপতি মো. ওসমান গনি বললেন, আমরা বিল শুকিয়ে কখনও মাছ ধরি না। সব সময় জাল ফেলে মাছ ধরা হয়। পানি নিষ্কাষণের খালও আমরা কেটে দেই নি। এখানে কেউ বাঁধ দেয় নি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া বললেন, দেখার হাওরের একাংশে (কালিপুর ও মল্লিকপুরের মাঝের জমি) প্রায় ১২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়। এবছরও বীজ তলা তৈরি হচ্ছে। কিছু অসাধু লোক পানি শুকিয়ে মাছ ধরছে। কৃষক ও স্থানীয় কমিশনারের সঙ্গে আলাপ করেছি। মৎস্য অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। যেটুকু পানি আছে, সেটুকু আটকানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করেছি।