অনুকরণীয় বিদ্যাপীঠ

এনামুল হক, ধর্মপাশা
বিদ্যালয়ের নাম ধর্মপাশা ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নামের মধ্যে ক্রমিক সংখ্যা ‘২নং’ শব্দটি শুনেই যেন বিদ্যালয় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন অনেকেই। ফলে বিদ্যালয় ক্যাচমেন্ট এলাকার বিত্তবান বা অভিভাবকেরা এ বিদ্যালয়কে উপেক্ষা করে অন্য বিদ্যালয় বা কিন্ডারগার্টেনে তাদের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানোর প্রবণতা দীর্ঘদিনের। কিন্তু গত কয়েক বছরে এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজমুল হায়দারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় পাল্টে গেছে বিদ্যালয়ে সার্বিক চিত্র। বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য্য বর্ধন, শিক্ষার গুণগত মান, নিয়ম শৃঙ্খলা, সহ-পাঠ্যক্রম কার্যক্রমের (কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজ) ব্যাপক উন্নতি সাধন হয়েছে। ফলে এ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম অনুকরণ করতে অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রায়ই এ বিদ্যালয় পরিদর্শন করে নিজ নিজ বিদ্যালয়ে তা প্রয়োগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ধর্মপাশা উপজেলা সদরের থানা রোডে অবস্থিত এ বিদ্যালয়টি ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়টিতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৩৯৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১০ জন শিক্ষক রয়েছেন। প্রধান শিক্ষক নজমুল হায়দার ২০১৪ সালে এ বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই তিনি বিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে কাজ শুরু করেন। তিনি এসেই দেখেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের সময় ও ছুটির পরে হৈহুল্লুর করে বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যায়। প্রথম শিফটের পাঠদান চলাকালে দ্বিতীয় শিফটের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে এলোমেলোভাবে অবস্থান করে। এতে প্রথম শিফটের শিক্ষার্থীদের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে তিনি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ ও বিদ্যালয় থেকে বাহির হওয়ার জন্য সুশৃঙ্খল নিয়ম তৈরি করে দেন। এখন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করে এবং একইভাবে বেরিয়ে যায়। প্রথম শিফটের পাঠদান চলাকালে দ্বিতীয় শিফটের শিক্ষার্থীরা মাঠে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে। পরে তারা সমাবেশে অংশগ্রহণ শেষে সারিবদ্ধভাবে হাততালি দিতে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে ও ছুটি শেষে সারিবদ্ধভাবে বেরিয়ে যায়।
ইতোমধ্যে সরকারি বরাদ্দে বিদ্যালয়ের ভবন দুটিকে বর্ণিল রূপে সজ্জিত করা হয়েছে। প্রাক প্রাথমিক শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে যা রয়েছে তাই চিত্রকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি দেয়ালে। শিশু শিক্ষার্থীরা যে দিকেই তাকায় সে দিকেই যেন চোখে পড়ে পাঠ্য বইয়ের রঙিন প্রতিলিপি। ফলে পাঠ্য বইয়ের বিভিন্ন বিষয় শিশু শিক্ষার্থীদের অবচেতন মনে গেঁথে যাওয়ার অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একটি দৃষ্টিনন্দন শ্রেণিকক্ষ যখন শিশু শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ্যবইয়ে রূপান্তর হয়েছে তখন বিদ্যালয় নিয়ে অভিভাবকসহ স্থানীয়দের চিন্তাভাবনাতেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। শিশু শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন লেখাপড়ায় মনযোগী তেমনি শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখতেও বদ্ধপরিকর তারা। শৃঙ্খলা মেনে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ ও প্রস্থান করা, শ্রেণি কক্ষে নিজ নিজ ডেস্ক সংগ্রহ ও তা গুছিয়ে রাখার কাজটিও শৃঙ্খলার সাথেই করে থাকে শিক্ষার্থীরা। পড়াশোনার ফাঁকে শিশু মনকে চাঙ্গা করে নিতে শ্রেণিকক্ষেই রয়েছে খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা। এক সময় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী স্কুল ড্রেস সম্পর্কেও ছিল উদাসীন। এখন প্রতিটি শিক্ষার্থী এ ব্যাপারে সচেতন।
সহ-পাঠ্যক্রম কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষ করে তুলতে গড়ে তোলা হয়েছে ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব, সংগীত শিক্ষা দিতে সংগীত ক্লাব ও কম্পিউটারের প্রাথমিক জ্ঞান প্রদানের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে কম্পিউটার ল্যাব। এতে করে শিক্ষার্থীরা তাদের জড়তা কাটিয়ে ইংরেজিতে, সংগীতে ও কম্পিউটার বিষয়ে জ্ঞান লাভ করার সুযোগ পাচ্ছে। শুধু তাই নয় বিদ্যালয়ের ক্ষুদে ডাক্তার টিমের সদস্যরাও যে কোনো শিক্ষার্থীর অসুস্থ্যতায় দিচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। আর প্রতিটি বিষয়ে দায়িত্ব প্রাপ্ত একেকজন শিক্ষক গুরুত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিভাবক শান্তনা রাণী সিংহ বলেন, ‘মাত্র কয়েক বছরে এ বিদ্যালয়ের অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। আমিও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। আমাদের সময়ের বিদ্যালয়ের অবস্থা আর এখনকার পরিবর্তনের মধ্যে রাতদিন ব্যবধান। এখন এই বিদ্যালয় সম্পর্কে সকলের ধারণা ইতিবাচক।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজমুল হায়দার বলেন, ‘এই পবির্তন একদিনে হয়নি। এ জন্য পরিকল্পনা মাফিক এগুতে হয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তা, এসএমসির সভাপতি-সদস্যরা, সহকারী শিক্ষকেরা, অভিভাবকসহ স্থানীয়দের সহযোগীতার ফলেই বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ফলাফলও ভালো করছে। এখন বিদ্যালয় সম্পর্কে সবাই ইতিবাচক। ক্যাচমেন্ট এলাকার অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করতে ভরসা পাচ্ছেন। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটুক দিয়ে বিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।’
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি অ্যাড. আব্দুল আজিজ চৌধুরী বলেন, ‘এর পুরো কৃতিত্ব প্রধান শিক্ষকের। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টির আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অন্যান্য বিদ্যালয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মানবেন্দ্র দাস বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ বিদ্যালয়ে ইতিবাচক পরির্তন এসেছে। অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও এ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম দেখে তাদের বিদ্যালয়ে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই চেষ্টাকে আমি স্বাগত জানাই। এই চেষ্টা অব্যাহত থাকলে আশা করি বছর খানেকের মধ্যে উপজেলা সবকটি বিদ্যালয়ের চিত্র বদলে যাবে।’