অভয়াশ্রমে মাছ ধরার সর্বনাশা কর্মকাণ্ড বন্ধ করুন

সুরমা নদীর ৩ অভয়াশ্রমে নির্বিচারে মৎস্য নিধনের একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে গতকালের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। সংবাদ থেকে জানা যায়, সুরমা নদীর ব্রাহ্মনগাঁও, ওয়েজখালী ও রামনগর এলাকাকে সরকার অভয়াশ্রম ঘোষণা করে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছেন। মূলত দেশীয় জাতের মাছের বংশবৃদ্ধির জন্য এই উদ্যোগ। এরকম ঘোষিত অভয়াশ্রম সারা দেশজোড়ে বিভিন্ন জলাশয়ে রয়েছে। সরকারের ঘোষণা কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। ঘোষিত অভয়াশ্রমে মাছ ধরার অবৈধ প্রবণতা রোধে বাস্তবে কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাব সুতীব্র। তাই সকল অভয়াশ্রমেই অবাধে মাছ ধরার খবর পাওয়া যায়, যেমন সুরমা নদীর ওই ৩ নির্দিষ্ট অভয়াশ্রমের বিষয়ে খবরে বলা হয়েছে। সবচাইতে উদ্বেগজনক বিষয় হল- অবৈধ মৎস্য শিকারীরা মাছ ধরতে রাসয়নিকেরও ব্যবহার করে থাকে। এতে নদীর পানি দূষণ ঘটে এবং এই দূষণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে অভয়াশ্রম সহ ্পুরো নদীর মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতি হয়। এই সর্বনাশা কর্মকা- কেবল শুরু হয়েছে এমন বলা যাবে না, বরং বহু পূর্ব থেকেই এমন কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এমন অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে নাম-কা-ওয়াস্তে ভ্রাম্যমান অভিযান পরিচালনা করে কিছু জাল জব্দ করার বাইরে আর কোন ব্যবস্থা নেই। কোন অবৈধ মৎস্য শিকারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয়েছে বলেও আমাদের জানা নেই। মামুলী ধরনের জাল ধ্বংসের মাধ্যমে যে এমন কর্মকা- বন্ধ হওয়ার নয় তা সকলেই বুঝতে পারেন। অনেকেই বলে থাকেন, প্রশাসনিক প্রশ্রয় ছাড়া সংরক্ষিত জলাশয়ে অবৈধভাবে মাছ ধরার মত কাজ করার সাহস কেউ পেত না।
নদীর সবচাইতে গভীর অংশকে স্থানীয়ভাবে ডুয়ার বা নিম বলা হয়ে থাকে। ক্ষেত্রভেদে এইসব ডুয়ার বা নিম ২-৩ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই গভীর জলভাগ হল মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মূলত যেকোন জাতের মাছকে বড় করতে চাইলে এসব ডুয়ার বা নিমকে নিরাপদ রাখতে হয়। এ কারণেই সরকার এসব এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করে থাকেন। অভয়াশ্রম ছাড়া নদীর অন্য অংশে বৈধ উপকরণের মাধ্যমে মাছ ধরতে আপত্তি নেই। নদীর উন্মুক্ত অংশ সরকার ইজারা প্রদান করে না। আশির দশকে কিন্তু উন্মুক্ত নদী ইজারা দেয়া হত। জনসাধারণের সুবিধার জন্য সরকার উন্মুক্ত নদীকে ইজারার বাইরে রেখেছেন। কিন্তু মানুষ সরকারের সদিচ্ছার প্রতি কোন সম্মান দেখায় না। তারা লোভের বশবর্তী হয়ে সংরক্ষিত এলাকার মাছ শিকার করে মূলত যে নিজেরই সর্বনাশ করছে তা বিবেচনায় রাখছে না। নিম বা ডুয়ারে বড় হয়ে মাছ যখন আরও মাছের জন্ম দিবে তখন তার সুবিধাভোগী এই মানুষজনই হবে। তারাই বংশানুক্রমে এই নদী-পালিত মাছের সুফল গ্রহণ করবে। কিন্তু লোভের কোন সীমা পরিসীমা নেই। লোভের কারণে কেউ যেমন ভবিষ্যৎ দেখে না তেমনি নিজের সর্বনাশের বিষয়টিও উপেক্ষা করে। এইসব অবিবেচক প্রকৃতি, পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ বিরোধী লোভী মানুষদের উপযুক্ত সাজা দান করতে না পারলে আমাদেরই সমূহ সর্বনাশ। আজ মাছের দেশে দেশী জাতের মাছের যে আকাল দেখা দিয়েছে তার পিছনে এই চরম লোভী মানুষের বিবেচনাহীন কর্মকাণ্ডই প্রধানত দায়ী।
সুরমা নদীর সকল চিহ্নিত অভয়াশ্রমে অবৈধ মাছ শিকারের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ কাম্য। লোক দেখানো অভিযান নয়। মৎস্য অধিদপ্তর জানে এসব এলাকায় কারা মাছ ধরে। তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এরকম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে অন্যরা এমন অনৈতিক কাজ করতে সাহস পাবে না। নদীর তীরবর্তী লোকজনকে সচেতন করে মৎস্যবিনাশী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করাও সমান জরুরি। সর্বোপরি এমন পরিবেশ সরকারকেই তৈরি করতে হবে যেখানে কেউ অবৈধ মাছ শিকারের মত কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার কোন চিন্তাই করতে না পারে।