‘অসময়ে নির্মিত দুর্বল বাঁধই গেল বছর ভেঙেছিল’

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের একমাত্র ফসল বোরো ধান অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে রক্ষার জন্য ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং জেলা কমিটির এই মৌসুমের প্রথম সভায় জেলা প্রশাসক এই নির্দেশ দেন।
প্রথম সভায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ১২ উপজেলায় ১৯৪ টি হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ১৮ টি কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে করচার হাওরে ৫, জোয়ালভাঙা হাওরে ৫, চলতি নদীর বাম তীর উপ প্রকল্পে ৩ এবং কালনার হাওরে রয়েছে ৫ টি প্রকল্প। ব্যয় ধরা হয়েছে তিন কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ১১ কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। সবগুলোই দেখার হাওরের। কাজের দৈর্ঘ্য ৫.৮০ কি.মি. এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ২৩ লাখ সাত হাজার টাকা।
তাহিরপুর উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ১৬টি কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে শনির হাওরে ৭, হালির হাওরে ৩, মহালিয়া হাওরে ৫ এবং গুরমার বর্ধিতাংশ হাওরে (প্রকল্প বর্হিভূত) ১ টি কাজ হবে। মোট দৈর্ঘ্য ২১.০৮৬ কি.মি. এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ১৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
জামালগঞ্জ উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ১৩ টি কাবিটা কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে শনির হাওরে ৫, মহালিয়া হাওরে ৬ এবং মিনি পাগনার হাওরে ২ টি। কাজের মোট দৈর্ঘ্য ১৩.৯৮০ কি.মি. এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ ৫৯ হাজার ৬৪১ টাকা।
শাল্লা উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ২৪ টি কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে উদগলবিল হাওরে ১২, ভান্ডাবিল হাওরে ৯ এবং ছায়ার হাওরে ৩টি কাজ করা হবে। ৯.৩৯০ কি.মি দৈর্ঘ্য বাঁধ হবে। ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৯২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ২১টি কাবিটা কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে আঙ্গুরআলী হাওরে ৮, শনির হাওরে ৩, পুটিয়ার হাওরে ৭, হালির হাওরে ১, চলতি নদীর ডান তীরে ২টি বাঁধের কাজ করা হবে। বাঁধের দৈর্ঘ্য হবে ১৬.৭৪১ কি.মি. এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি তিন লাখ ৯৮ হাজার টাকা।
দোয়ারাবাজার উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ২৬ টি কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে নাইন্দার হাওর পোল্ডার-২’ এ ৬টি, দেকার হাওরে ৯, কালনার হাওরে ১১ টি বাঁধের কাজ হবে। দৈর্ঘ্য হবে ১৫৬৩.০০ কি.মি. এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি চার লাখ ৮৭ হাজার টাকা।
ছাতক উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ১৭ টি কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে দেকার হাওরে ১৫ এবং চাউলির হাওরে হবে ২টি বাঁধ। এখানে বাঁধের দৈর্ঘ্য এবং টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হয় নি।
ধর্মপাশা উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ১৫ টি কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে চন্দ্র সোনার থাল হাওরে ৯ এবং সোনামড়ল হাওরে ৬টি। কাজের দৈর্ঘ্য ১৭.৬৬৫ কি.মি. এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ২৬ লাখ ৮৯ হাজার ৭১৯ টাকা।
মধ্যনগর উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ৩টি কাবিটা কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। সবগুলো কাজই ঘোড়াডোবা হাওরে। কাজের মোট দৈর্ঘ্য ৫.৯০৩ কি.মি. এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
দিরাই উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ২৫টি কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে চাপতির হাওরে ১৮, টাঙ্গুয়ার হাওরে ৫ ও হুরামন্দিরা হাওরে ২টি। বাঁধের দৈর্ঘ্য ১৭.৪৭৪ কি.মি. এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৬৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা।
জগন্নাথপুর উপজেলায় বাঁধ মেরামত এবং নদী খাল পুনঃখনন স্কীমের আওতায় ৫টি কাবিটা কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। সবগুলো নলুয়ার হাওর পোল্ডার ১’এ। এখানে বাঁধের দৈর্ঘ্য ও ব্যয় উল্লেখ করা হয় নি।
বৃহস্পতিবার হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভায় বেসরকারি সদস্যরা দাবি করেছেন, অসময়ে নির্মিত, কমপেকসন বিহীন দুর্বল বাঁধই গেল বছর ভেঙে কয়েকটি হাওরের ফসল ডুবেছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে (পিআইসিতে) প্রকৃত কৃষক বা সুবিধাভোগীরা যুক্ত ছিলেন না। বাঁধের কাজে অবহেলা ছিল। এই বছর গণশুনানীর মাধ্যমে প্রকৃত কৃষক বাঁধের পিআইসিতে রাখা এবং সময়মত বাঁধের কাজ শুরু করার দাবি জানানো হয়। বাঁধের ব্যবসা করার জন্য অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প যাতে গ্রহণ না হয় সেই বিষয়ে খেওয়াল রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
সভায় জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাগণ, বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী আমজাদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান, সাংবাদিক পঙ্কজ দে, লতিফুর রহমান রাজু, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশ্মির রেজা, সাধারণ সম্পাদক টিটু পুরকায়স্থ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যে হাওরগুলোতে দুই উপজেলার কৃষকের জমি আছে। সেসব হাওর রক্ষা বাঁধে দুই উপজেলা থেকে পিআইসির সদস্য যুক্ত করতে হবে।
সভায় জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি বাঁধের কাজে সহযোগিতার করার অনুরোধ জানান। তিনি ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেন।