অ্যাডভোকেট শফিকুল আলমকে নিয়ে শোকগাঁথা

অ্যাড. মলয় চক্রবর্তী রাজু
কয়েকদিন ধরেই তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল একটু মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন। আমিও এই বৃত্তের একজন। প্রতিদিনই ফেসবুক অথবা অন্য সোর্সে খবর নিচ্ছিলাম। খবর আসছিল শ্বাসযন্ত্রের ৭০ ভাগ কাজ করছে না অথবা অক্সিজেন স্বাভাবিকের চেয়ে ২/৩ গুণ বেশী লাগছে। আইসিইউতে আছেন, থাকতে চাইছেন না। কেবিনে নিয়ে আসা হয়েছে, তারপর রাগীব রাবেয়া হাসপাতাল, অবশেষে মৃত্যু ।
শনিবার দিনেই ফেসবুকে অ্যাড. অলক ঘোষ দাদার পোস্টটা পড়ছিলাম কিভাবে উনার মাকে প্রায় যুদ্ধ করে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন। পড়তে পড়তে ভাবছিলাম ঈশ্বর শফিক ভাইকে এভাবেই ফিরিয়ে দেবেন আমাদের কাছে। আবার শুরু হবে তাঁর সাথে রাগ, ভালবাসা, হিংসা ইত্যাদি মানবিক আচরণের খেলা। গোছানোটা খুব ভাল পারেন শফিক ভাই। পরিবেশের কিছু পরিকল্পনা এলোমেলোভাবে ছিল, তাঁকে নিয়ে বসে একটু গুছিয়ে কাজগুলো শুরু করবো ভাবছিলাম।
শনিবার রাত অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম অবশেষে চলেই গেলেন সবাইকে ছেড়ে। শেষ গন্তব্যে, সারাজীবনের ছুটে চলার পরিসমাপ্তি ঘটল। সংবাদটা পাওয়ার পর অসহায়ত্বটা যেন প্রবল হয়ে শরীর মনে ছড়িয়ে পড়লো। কিছুদিন আগে ভাষা (ভাষা রেহেনুমা), তারও আগে মলয়দা (মলয় বিকাশ চৌধুরী) আরো আগে অনেক অনেক নিকটজন। যেন কেড়ে নিয়ে নিল কোভিড-১৯, কিছুই করার থাকেনা।
শফিক ভাইকে নিয়ে প্রথমে যে কথাটি বলতে হয়- খুবই স্মার্ট। রাজনৈতিক জীবনে প্রতিকূলতা একটি স্বাভাবিক জিনিস, এই প্রতিকূলতাকে খুব সুন্দর করে ট্যাকল করতেন শফিক ভাই। সমস্যাটা সাধারণত সমবয়সী বা কাছাকাছি বয়সী রাজনীতিবিদদের মধ্যেই হয়। খুব সুন্দর করে সামলে নিতেন শফিক ভাই এই ধরনের ঘটনা। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট আর উৎসাহী কর্মী। ছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদের প্রিয়পাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষ করে জগ্ননাথপুরের রাজনীতিতে নাম লেখান। অল্পদিনেই কর্মীবান্ধবও হয়ে উঠেন। জগন্নাথপুরে নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে তাঁর অবদান অনেক। তেমনি একজন জয়দ্বীপ সূত্রধর বীরেন্দ্র সজল চোখ নিয়ে বলেন, রাজনীতিতে প্রবেশ করেই কিছুদিনের মধ্যেই বিরাশি-তিরাশির দিকে পাইলগাঁও ইউনিয়নের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। এইসময় কয়েকদিন পাইলগাঁও ব্রজেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন, যে স্কুলের তিনি ছাত্রও ছিলেন। রাজনৈতিক কর্ম তৎপরতা বাড়িয়ে ১৯৮৬ সালে নির্বাচিত হন জগন্নাথপুর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি। রাজনীতি করার পাশাপাশি হয়ত কাজের প্রয়োজনেই একসময় পত্রিকা প্রকাশও করেছেন। “জগন্নাথপুর দর্পন” নামে পত্রিকাটি বেশ কষ্ট করে তিন বছর পর্যন্ত চালান। মাঝখানে ১৯৯১ সালে জগন্নাথপুর পৌর শহরে ব্যারিস্টার মির্জা আব্দুল মতিনের দুহিতাকে ঘরে আনেন। তারপরেই পেশা এবং নেশার টানেই জেলাসদরে চলে আসেন অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম। কিছুদিনের মধ্যেই নিজের প্রতিভাগুনেই সবার দৃষ্টি কেড়ে নেন। আইনজীবী সমাজ ছাড়াও আস্তে আস্তে বিভিন্ন পরিসরে তাঁর যাতায়াত শুরু হয় এবং নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেন। অসম্ভব প্রাণশক্তির অধিকারী শফিকভাই রাজনীতি এবং আইনপেশার বাইরেও নিজের যোগ্যতা দেখিয়ে গেছেন। আমার সাথে তাঁর পরিচয় রাজনীতির মাধ্যমে হলেও ঘনিষ্ঠতা বাড়ে পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে। ওয়ান-ইলেভেনের কালে প্রকাশ্য রাজনীতির চর্চা বন্ধের অফুরন্ত সময়ে আমাকে পরিবেশ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করলেন শফিকভাই। আমি এর সাধারণ সম্পাদক থাকলেও আমার অগুছালো স্বভাবের জন্য শফিক ভাইয়ের উপরেই সব পরিকল্পনার দায়িত্ব থাকত। আমি শুধু প্রোগ্রামগুলো করতাম। এভাবে শফিকভাই নিজেকে আরও বিভিন্ন কাজে জড়িত রাখতে ভালোবাসতেন। জীবন নিয়ে তাঁর কোনো দুঃখবোধ ছিল না। এক মেয়ে এবং দুই ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। সংগ্রাম এবং আদায় কিভাবে করতে হয় তা তাঁর জানা ছিল। তাই জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তিনি সফল হয়েছিলেন।
শোকগাঁথা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারত। কিন্তু এই অকাল মৃত্যুটা মনকে এতোই আঘাত করেছে যে নিজেকে সামলে নিতেও কষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব লেখায় পড়লে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটতে পারে। তাই লেখাটি এখানেই শেষ করছি। RIP শফিক ভাই।