‘অয়নদের বাড়ীতে এখন আর সুর ওঠে না’

বিশেষ প্রতিনিধি
আমার জন্মের পর থেকে বাড়ীতে গান-বাজনা হয় নি, বা গানের তালিম হয় নি, এমন দিন স্মরণে আসে না, বা বাবা-মা কিংবা আমি কেউ বাড়ীতে না থাকলেও শিল্পীদের কেউ না কেউ এসে তালিম দিয়েছেন এ বাড়ীতে। ১৬ জুনের পর সেটা থেমে গেছে। এখন আর আমাদের বাড়ীতে সুর ওঠে না। বন্যার প্রথম দিন যখন বাড়ীতে যন্ত্রপাতি রেখে যাই, তখন ভাবিনি, সবকিছু এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে, এগুলো আমি আর পাব না, তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে আমি গান রেকর্ডের স্টুডিও করেছিলাম, তবলাসহ যন্ত্রপাতির কিছুই এখন নেই আমার। আমার মা বাবা কেউই বাড়ীর অন্যান্য আসবাবপত্র নিয়ে ভাবেন না, বার বারই কাঁদেন আর বলেন, আমার ছেলের শখের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ, গলায় গান ওঠে না। গান করবোই কিভাবে, গান করার জন্য হারমোনিয়াম তবলারওতো প্রয়োজন। ঢোল-তবলার ছানি-টানি সব গলি গেছে, হারমোনিয়াম ফুলে-টুলে অবস্থা খারাপ, কিবোর্ডও নষ্ট হয়ে গেছে, কিভাবে এগুলো ফিরে পাবো, কেনার সামর্থওতো নেই আমাদের।
সুনামগঞ্জ শহরের শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা সিলেট অঞ্চলের প্রখ্যাত তবলা বাদক অঞ্জন চৌধুরী’র ছেলে অয়ন চৌধুরী বন্যায় ভেসে থাকা কষ্টের এভাবেই বর্ণনা করলেন। বন্যায় অয়নের হারমোনিয়াম, তবলা, ঢোলক, একতারা, কী-বোর্ড, সাউ-কার্ড, মাইক্রোফোন, কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক ও মনিটর ডুবে নষ্ট হয়েছে।
সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্ম অয়ন নিজেও স্বনামধন্য যন্ত্রশিল্পী, গায়ক হিসেবেও পরিচিতি আছে তাঁর।
বন্যায় রেখে যাওয়া কষ্টে কাতর অয়ন এর মা লিপি শ্যাম চৌধুরী চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, ঘরে যখন কোমর সমান পানি, বাইরে তখন মুষলধারায় বৃষ্টি, পথে বুক সমান পানি, নৌকা কিংবা বাহন কোন কিছুই নেই, পানি শনৈ শনৈ করে বাড়ছে, কিভাবে বের হই এই নিয়ে চিন্তা, ছেলে ও তার বাবার বাদ্যযন্ত্রগুলো শোবার কাঠের উপর টেবিল তুলে, এর উপরে রেখে আরেক দুতলায় গিয়ে ওঠলাম। পরের দিন চেষ্টা করেও বাড়ী এসে দেখার সুযোগ হয় নি। তৃতীয় দিন নৌকায় এসে দেখলাম বারান্দার চাল সমান পানি। ঘরে ঢুকা যায় নি। দূর থেকে দেখেই ফিরে গেছি। পাঁচদিন পর এসে দেখেছি কোমর সমান পানিতে ভাসছে সবকিছু, ছেলের ঢোল-তবলা, হারমোনিয়াম, কীবোর্ড এর অবস্থা দেখে ভীষণ মন খারাপ হয়েছে।’
লিপি শ্যাম চৌধুরী জানালেন, ২৯ বছর আগে এই বাড়ীর বউ হয়ে এসেছিলেন। এই সময়ে এমন কোন দিন যায় নি, যেদিন এই বাড়ীতে গান-বাজনা হয় নি। একমাত্র ছেলে অয়নও বুঝতে শেখার পর থেকেই গান গায়। অনেক শুভানুধ্যায়ী এসেও এবাড়ীতে রেওয়াজ করেন। ১৬ জুনের প্রলয়ংকরী বন্যার পর সেটি থেমে গেছে।
কেবল অয়নদের বাড়ী নয়, ভয়াবহ বন্যার পর সুনামগঞ্জের অনেকের বাড়ীতেই হারমোনিয়ামে সা রে গা মা পা বাজে না।
শহরের নবীনগরের যন্ত্রশিল্পী অমিত বর্মণ বললেন, যন্ত্রপাতি সবই ডুবে কয়েকদিন পানির নীচে ছিল। চামড়ার যন্ত্র পানি লাগলেই শেষ। কিছু মেরামত করতে দিয়েছি, টাকার জন্য আনতে পারছি না। পানিতে ডুবে নষ্ট হওয়া বাড়ীতে রাখা কিছু যন্ত্র দেখিয়ে আপসোস করলেন অমিত।

বন্যায় প্রায় ২০০ শিল্পীর বাদ্যযন্ত্র ও পান্ডুলিপি নষ্ট


শহরের ষোলঘর এলাকার কণ্ঠশিল্পী জেলী রানী দাসের কষ্ট তার হারমোনিয়াম মেরামত করার উপযোগি রয়নি। পাঁচ ফুটেরও বেশি উপরে রেখে আত্মীয়ের তিন তলায় বাবা-মাকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। এক সপ্তাহ পর ফিরে দেখেছেন ডুবে পচে গেছে হারমোনিয়াম।
একই অবস্থা শহরের ষোলঘরের যন্ত্রশিল্পী প্রতীক এবং হাছননগরের যন্ত্রশিল্পী বিজনেরও। যন্ত্র দিয়েই জীবিকা ছিল প্রতীক-বিজনের। এরা দুজনই এখন বেকার।
সুনামগঞ্জ জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল বললেন, শিল্পীদের মধ্যে হতদরিদ্র ও নি¤œবিত্তই বেশি। এদের অনেকেই এবারের বন্যায় বসতঘরসহ পরিবারের সবকিছুই হারিয়েছেন। শহরে যারা বাড়ী করে আছেন, তাদের অনেকের চাল সমান পানি ছিল। বাদ্যযন্ত্র, গানের স্কুল বা গানের ঘর নষ্ট হয়েছে অনেকগুলোই। শিল্পকলার হিসাবে কমপক্ষে দুইশ শিল্পীর বাদ্যযন্ত্র ডুবে নষ্ট হয়েছে। অনেকের দীর্ঘদিনের লেখা গানের পান্ডুলিপিও নষ্ট হয়েছে। তিনি সরকার ও মননশীল বিত্তশালীদের সুনামগঞ্জের সংস্কৃতিকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখার অনুরোধ জানান।