আওয়ামী লীগের দিরাই সম্মেলনে সংঘর্ষ/ নেতৃত্বকে দায়িত্বশীল ও কুশলী হতে হবে

আশংকাকে সত্য প্রমাণ করে অবশেষে দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে বিবদমান দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়েছে। এই সম্মেলন নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সংগঠনের অভ্যন্তরে বিদ্যমান পরষ্পরবিরোধী দুইটি পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও এর পরিণতিতে সম্মেলনের দিন শক্তির মহড়া চলতে পারে বলে আভাস দেয়া হচ্ছিল। তাই হলো। সোমবার অনুষ্ঠিত উপজেলা সম্মেলন অনুষ্ঠানের মঞ্চে ওই দুই গ্রুপের শক্তির মহড়ায় ২০ ব্যক্তি আহত হওয়ার খবর মিলেছে। এদিন আরেক যুবকের মৃত্যু ঘটে যা নিয়ে ধূ¤্রজাল তৈরি হয়েছে। কেউ বলেন নিহত যুবকের উপর এসে ঢিল পড়ায় তিনি আহত হন পরে হাসপাতালে নিলে তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে অনেকে বলছেন যুবকের মৃত্যুর সাথে সম্মেলনের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি হৃদরোগে মারা গেছেন। আহত ২০ জনের মধ্যে একজনের অবস্থা আশংকাজনক বলে তাকে সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সংঘর্ষের কারণে সম্মেলনের কাজ বেশ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, সম্মেলনের জনসভায় একটি পক্ষ মিছিল নিয়ে ঢুকতে চাইলে অপর পক্ষ তাদের সম্মেলনস্থলে আসতে বাধা দেয়। এর ফলে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে উভয় পক্ষ। এমনকি মঞ্চ লক্ষ করেও ঢিল ছুঁড়ার খবর পাওয়া গেছে এবং প্লাস্টিকের চেয়ারকে ঢাল বানিয়ে এসময় নেতৃবৃন্দকে অক্ষত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
দিরাই দিয়ে শুরু হওয়া জেলার আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ইউনিটের সম্মেলনগুলো সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজিত হয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উদাহরণ তৈরি করুক, এমন প্রত্যাশা আমরা ব্যক্ত করেছিলাম সম্পাদকীয় স্তম্ভে। কিন্তু এসবই কাকস্য পরিবেদনায় পরিণত হয়েছে। যে সংঘর্ষকে জেলা কিংবা উপজেলা নেতৃত্ব একটু সচেতন, কৌশলী ও বিজ্ঞ হলেই ঠেকানো সম্ভব হত সেখানে তা না করে সংঘর্ষ পর্যন্ত টেনে নেয়া হয়েছে। যেহেতু এমন পরিস্থিতি নিয়ে আগে থেকেই অনুমান করা হচ্ছিল সেহেতু কেন এরকম পরিস্থিতি রোধে আগাম ব্যবস্থা নেয়া হলো না? একটি উৎসবমুখর সম্মেলনকে নিষ্প্রাণ ও নিষ্প্রভ করে দিয়ে সংগঠনের তৃণমূলের অসংখ্য নেতাকর্মীর মনোকষ্ট তৈরি করা হলো। বিষয়টি নিতান্তই দুঃখজনক এবং আশংকাজনকও বটে।
ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, কোন্দল ও গ্রুপিং নতুন কোনো বিষয় নয়। এর তীব্রতা মাঝে মধ্যেই নানাভাবে প্রকাশ হতে দেখা গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, জাতীয় নির্বাচনেও বহুক্ষেত্রে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করা যায়নি। একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়িয়ে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত করেছেন। এই ধরনের তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব সামনের জাতীয় নির্বাচনের জন্য অশনিসংকেত। এর মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের হাতে সমালোচনার অস্ত্রও তুলে দেয়া হলো। আমরা উদ্বিগ্ন এ কারণে যে, এতে জেলার সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশের যে সুনাম ছিলো তা ব্যাহত হওয়া শুরু করেছে। একটি দলে কেন এরকম সহিংস দ্বন্দ্ব-সংঘাত ঘটে? মোটাদাগে একটি উত্তর হলো, সাংগঠনিক বিষয়বলীর ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ও গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ না করা; অপরটি হচ্ছে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন। যেকোনোভাবে দলীয় পদপদবী বাগিয়ে অনৈতিক পন্থায় প্রভাব বলয় তৈরি ও টাকা রোজগারের ধান্দা। অথচ রাজনীতিকে যাবতীয় কলুষতা থেকে মুক্ত করার জন্য এই দেশের মানুষ কতই না আন্দোলন সংগ্রাম করল। আমরা জানি না কবে কখন রাজনীতির শরীর থেকে এমন রাহুর দশা কাটবে।
যাহোক সামনে আওয়ামী লীগের আরও বহু ইউনিটের সম্মেলন আছে। এবং সর্বত্রই এক বা একাধিক পক্ষের সক্রিয় তৎপরতা সুস্পষ্ট। এসব পক্ষ-বিপক্ষ যাতে শেষ পর্যন্ত সহিংস না হয়ে উঠে তজ্জন্য নেতৃত্বকে দক্ষ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার অনুরোধ আমাদের।