যুদ্ধদিনের করুণ স্মৃতি আজও কাঁদায় মুক্তিযোদ্ধা মদরিছ আলীকে

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
অশীতিপর এক যোদ্ধা। চলনে বলনে কুড়ি বছরের তরুণ। চেহারায় এখনও টান টান ঔজ্জ্বলতা হাতছানি দিচ্ছে তাঁর। অকোঁচকানো অবয়বে ঝলঝল করছে সংগ্রামী প্রতিচ্ছায়া। বয়স যাঁর সাথে রসিকতা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ পায় না। বার্ধক্যের বাধ্য-বাধকতাকে তুড়ি মেরে এখনও একাই ছুটেন সদর্পে সবখানে। বয়সের শতক থেকে খানিক দূরে থাকা ওই যোদ্ধাকে দেখলে বোঝা মুশকিল সত্যিকারের বয়স। সুস্থ-সবল অহমিকায় বেঁচে আছেন প্রকৃতির গেঁয়ো জায়গা দখল করে। কথা হয় এ প্রতিবেদকের সাথে তাঁর বসতভিটায় বসে।
তিনি জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের মাহমুদপুর মুক্তিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মদরছি আলী। বয়স আনুমানিক নব্বইয়ের কাছাকাছি। তার মুক্তিযোদ্ধা আইডি নম্বর ০৭০৩০৬০০৩০, মুক্তি বার্তা নং-০৫০২০৭০০৯২। তিনি মুক্তিযুদ্ধে ৫ নম্বর সেক্টরের টেকেরঘাট সাব সেক্টরে অংশগ্রহণ করেন। মুন্সী হরমুজ আলী ও আরপিনা বেগমের ছয় ছেলেমেয়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এই যোদ্ধা একাত্তরে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন দেশমাতৃকার কল্যাণে। শৈশবে পিতামাতাকে হারানো মদরিছ আলী ভাই-বান্ধবের অগোচরে অংশগ্রহণ করেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। তখন তিনি অবিবাহিত ত্রিশোর্ধ্ব যুবক। বর্তমানে তিনি বিবাহিত এক কন্যা সন্তানের জনক। তাঁর এলাকার প্রায় তেরো-চৌদ্দটি গ্রামের মধ্যে একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে জান বাজি রেখে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করেছেন পরাধীন ময়দানে।
যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করা দুর্বার সাহসী মদরিছ আলী কথা বলেন অনর্গল অহংবোধে। যুদ্ধদিনের স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে বিরল অভিজ্ঞতার কথা বিনিময় করেন, আবেগাপ্লুত হন, কাঁদেনও হু হু করে। যেন স্বাধীনতার জ্বলন্ত অগ্নিশিখা তিনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা মদরিছ আলীর কথার রেশ ধরে সামনে চলে আসে একাত্তরের উত্তাল দিনগুলো এবং নয় মাস ধরে চলা পাকিস্তানি বর্বরতার বিভৎস বাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা সৃষ্ট অমানবিকতার চূড়ান্ত ঘটনাপ্রবাহ।
তাঁর সাথে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর নিজ গ্রামের এক পাকিস্তানি দোসর তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজাকার দলে নাম লেখানোর চাপ দেয়। নইলে পাকিস্তানি মিলিটারিরা নাকি তাকে ধরে নিয়ে যাবে। তখন মেরে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয় তাকে। ওই পাকি দালালের দেশবিরোধী বাকচাতুরীপনা ভালো লাগেনি মদরিছ আলীর। এরপর থেকেই গ্রাম ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের নেশা পেয়ে বসে তাকে। সে অনুযায়ী বাড়ি থেকে পালানোর গোপন পথ খুঁজতে থাকেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মদরিছ আলী।
কয়েকদিন পর লুকিয়ে নৌকা করে সাচনা বাজার হয়ে তাহিরপুরের ধাওয়া গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানে খানিক সময় অবস্থানের পর পথ ধরেন শেষ গন্তব্যে। বাদাঘাট পাড়ি দিয়ে তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকা টেকেরঘাটে চলে যান। ওইখানে গিয়ে তার পার্শ্ববর্তী গ্রাম ছেলাইয়ার তৎকালীন আ.লীগ নেতা জমির উদ্দিন মাস্টারের সাথে দেখা হয়। পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রবল আকাক্সক্ষায় বড়ছড়া (ইকে-৪) ক্যাম্পে প্রায় এক মাস প্রশিক্ষণ নেন মদরিছ আলী। তার প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন ভারতীয় মেজর বাট (পুরো নাম জানা যায়নি)। পাঞ্জাবের লাল জসীম ও বার্মাইয়া এক ক্যাপ্টেনের কাছে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে যুদ্ধে নামেন তিনি।
তাহিরপুরের বাদাঘাট কামরারবন্দের মুজাহিদ কমা-ারের নেতৃত্বে প্রথম যুদ্ধে অংশগ্রহণ জাউয়ার জয়কলস ও উজানীগাঁও এলাকায়। এ যুদ্ধে প্রায় দশজন মুক্তিযোদ্ধার অংশগ্রহণ ছিল। তবে কেউ আহত বা নিহত হননি। ওইদিনের যুদ্ধ শেষে টেকেরঘাট ক্যাম্পে ফিরে যান তারা। পরবর্তীতে জামালগঞ্জের লক্ষ্মীপুর-লালপুরে মুজাহিদ কমা-ারের নেতৃত্বে ফের যুদ্ধে অংশগ্রহণ মদরিছ আলীর। এই স্পটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংকারের জন্য সিমেন্ট মজুদ করে রাখা কার্গো ডুবাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকি বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ বাধে। এতে গুলিবিদ্ধ হন মদরিছ আলী। আর প্রফুল্ল নামের এক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন সেখানে। এ সময় তাহিরপুরের রতনশ্রীর বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান ও জামালগঞ্জের চানপুরের আলাউদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন যোদ্ধা ছিলেন তার সাথে।
পরে এখান থেকে নৌকাযোগে বেহেলী ইউনিয়নের আছানপুর গিয়ে আশ্রয় নেন তারা। সেখানকার শামসুল হক মেম্বারের দেওয়া মলম ক্ষতস্থানে লাগিয়ে টেকেরঘাট ক্যাম্পে ফিরে যান। ক্যাম্পে হারিছ উদ্দিন ডাক্তারের চিকিৎসায় সপ্তাহখানেক পর সুস্থ হন মদরিছ আলী। এরপর তাহিরপুরের বীরনগর সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সেখানে শত্রুদলের সাথে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ হয় তাদের। টেকেরঘাট সেক্টরের কমা-ার মেজর মুসলেম উদ্দিনও এ যুদ্ধে অংশ নেন। সেখানেও মদরিছ আলীর ঘাড়ে আংশিক গুলি লাগে। এখানে দুই পাকিস্তানিকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধারা।
পরবর্তীতে তাহিরপুরের কাছারিতে গিয়ে গভীর রাতে ফের যুদ্ধে মুখোমুখী হন তারা। সেখানে ধূর্ত পাকি বাহিনীর রাখা আর্টবোর্ডের তৈরি নকল মানুষ লক্ষ করে গুলি চালায় মুক্তিবাহিনী। সেই রাইফেল চালনায় মদরিছ আলীও ছিলেন। কিন্তু বারবার গুলি চালালেও নকল মানুষটির কিছু হচ্ছিল না। পরে রাত ভোর হয়ে আসলে পরিস্কার হয় বিষয়টি। সেই যুদ্ধে জামালগঞ্জের কালীপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা কাসেম আলী ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এরপর এ স্থান ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধারা তাহিরপুরের সুলেমানপুরে অবস্থান নেন। সেখানে বৌলাই নদীর এপার-ওপারে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। এখান থেকে দিরাইয়ের কাইমামুদপুর স্কুল এলাকায় গিয়ে টানা তিনদিন যুদ্ধে অবতীর্ণ হন মদরিছ আলীর যোদ্ধা দল। সর্বশেষ বানিয়াচঙয়ের বাহুবলে যুদ্ধ শেষে নবীগঞ্জের জিনারপুর ক্যাম্প স্থাপন করে ফের যুদ্ধে অংশগ্রহণ। সেই যুদ্ধে কুলাউড়ার ধ্রুব নামের এক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সেখান থেকে ২১ রাজাকারকে পাকড়াও করেন মুক্তিযোদ্ধারা। সেখানে থেকেই বহুল কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জনের খবর পান বীর মুক্তিযোদ্ধা মদরিছ আলী। বিজয়ের মহানন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন মদরিছ আলীসহ তার সঙ্গীরা। টানা সাত মাসের যুদ্ধ শেষে মাহমুদপুর জ্বালিয়ে দেওয়া বাড়িঘরে ফেরেন তিনি। এরপর থেকে তাদের পৈতৃক বাড়িটি পোড়াবাড়ি হিসেবে পরিচিতি পায় বলে জানিয়েছেন তিনি।
কথোপকথনে তিনি আরও জানান, কমা-ার মুজাহিদ ছাড়াও তাহিরপুরের গোলাম মোস্তফা, গিয়াস উদ্দিন এবং আলী আমজাদ বড় ভাই ও আব্দুর রশিদ তার যুদ্ধকালীন কমা-ার ছিলেন। নবীগঞ্জের রশিদ, বাচ্ছু, উজ্জ্বলপুরের গিরিন্দ্র, তাহিরপুরের আজম আলী, আব্দুর রউফ ছাড়া আরও অনেকে তার সহযোদ্ধা ছিলেন। তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা পাচ্ছেন। সম্প্রতি ঘর নির্মাণের সরকারি বরাদ্দও পেয়েছেন। হাত উচিয়ে নতুন ঘর নির্মাণের কর্মতৎপরতাও দেখিয়ে দেন।
কেমন চলছে স্বাধীন দেশ জিজ্ঞেস করলে রুদ্ধশ্বাস উত্তরে তিনি জানান, কেমন আর চলবে। চারপাশে দুর্নীতি আর দুর্নীতি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে প্রধান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এই দুর্নীতি। এছাড়া বর্তমান ক্ষমতাসীন আ.লীগের নেতারা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বলয়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পথ চলার বিষয়টিতে ক্ষোভ ঢালেন একাত্তরের এই বীর সেনানী।