আজও বজ্রকণ্ঠ কানে বাজে গোলাম মোস্তফার

বিশেষ প্রতিনিধি ও বিশ্বজিত রায়
১৯৭০ সালের ৯ অক্টোবর। সেদিন ছিল শুক্রবার। বেলা আনুমানিক ১ টা কী সোয়া ১ টা। ধারাম ও কাটাকালি হাওর পারের রাজাপুর গ্রাম ও সেখানকার মানুষের মাঝে উৎফুল্লতা কাজ করছিল। চারপাশের থৈথৈ পানিতে খেলা করছিল মৃদু ঢেউ। রুদ্দুররাঙা প্রকৃতির বুকেও যেন দোলখাচ্ছিল এক অজানা শিহরণ। জলমগ্ন হাওরের বুকে জেগে থাকা অজপাড়াগাঁয়ে নেমে এসেছিল স্বতন্ত্র কিছু। সবকিছুতেই ছিল উৎসুক উদ্দীপনা আর অবারিত মনে অপেক্ষার ব্রত। কখন এসে ভিড়বে মহামানবকে বহনকারী তরী। দু’চোখ ভরে বহু আকাক্সিক্ষত মানুষটিকে শ্রবণ করবে সবাই। অবশেষে পা ফেলে হাওরপাড়ের ওই মাটি ও মানুষকে ধন্য করলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বজ্রকণ্ঠের বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ করলেন সকলকে। দিয়ে গেলেন মুক্তির বারতা। বঙ্গবন্ধুকে নিজ চোখে দেখা রাজাপুর গ্রামের ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ গোলাম মোস্তফা ধন মিয়ার কানে আজও বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ বাজে।
এর আগের দিন জামালগঞ্জের সাচনা বাজারে জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। জনসভা শেষে সাচনা বাজারের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহমান তালুকদারের বাড়িতে বসে নেতা কর্মীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন তিনি। পরে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী লঞ্চ ধর্মপাশার দিকে যায়। পথে জামালগঞ্জের ফেনারবাক ইউনিয়নের সেলিমগঞ্জ বাজারের ঘাটে লঞ্চ থামিয়ে সংংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু। এরপর বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী লঞ্চটি গোলকপুর বাজারের পাশে গিয়ে রাতে নোঙর করে ওখানেই রাত কাটায়। সকালে বঙ্গবন্ধু ধর্মপাশার গাগলাজুর বাজারের জনসভায় বক্তৃতা করেন।
এরপর ধানকুনিয়া হাওর হয়ে লঞ্চটি ধর্মপাশার রাজাপুর গ্রামে পৌঁছায়। বঙ্গবন্ধুর সেই আগমনী বার্তা আজও সসম্মানে বহন করে চলেছে ধর্মপাশা উপজেলার রাজাপুর গ্রাম। ’৭০-র ৯ অক্টোবর নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে সাচনা, সেলিমগঞ্জ, গোলকপুর হয়ে ওয়াকফ ষ্টেটের স্বত্বাধিকারী মরহুম মনফর রাজা চৌধুরীর ছেলে ও সুখাইড়-রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মনছব রাজা চৌধুরী ওরফে মহারাজ মিয়ার বাড়িতে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে তিনি প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টা অবস্থান করছিলেন। ওইদিন জুমার নামাজ আদায় শেষে খাওয়া-দাওয়া সেরে ওই বাড়ির বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু। বক্তব্যে তিনি তাঁর দল আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার আহবান জানিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার আহ্বান জানান।
জাতির জনকের সুখময় স্মৃতি আকড়ে আজোবধি নীরব স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাওরপাড়ের মহারাজ মিয়ার এই বাড়িটি। এ বাড়ির পুরোনো মসজিদ ও বাংলোঘরটি যেন বহন করে চলেছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা। সত্যিই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এই বাঙালির আগমনে ধন্য হয়েছিল রাজাপুর ও সে গ্রামের মানুষেরা।
১৯৭০ সালের ৯ অক্টোবরকে কোনভাবেই ভুলতে চান না গ্রামবাসী। ওইদিন বঙ্গবন্ধু আসার খবরে রাজাপুর গ্রামের ছোট-বড় সকলের মাঝে প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করতে থাকে। বঙ্গবন্ধুকে নিজ চোখে দেখা রাজাপুর গ্রামের ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ গোলাম মোস্তফা ধন মিয়ার এখনো মনে পড়ে, সুঠাম দেহের অধিকারী টগবগে সুদর্শন মানুষটির লম্বা লম্বা ধাপে হাটার স্মৃতি, এখনো ভুলতে পারেননি তিনি বাঙালির সেই মহানায়ককে।
স্বচক্ষে দেখা গোলাম মোস্তফা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি রোমন্থন করে জানালেন, তাঁর পাশে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু জুমার নামাজ আদায় করেছেন।


বললেন, চেয়ারম্যান মনছব রাজা চৌধুরী শেখ সাহেব তার বাড়িতে আসছেন, এমন খবর গ্রামবাসীকে জানালে সবার মাঝে বাড়তি উচ্ছ্বাস ও উৎফুল্লতা কাজ করে ওই দিন। জুমার নামাজের ঠিক আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু রাজাপুর এসে পৌঁছান। কাঠের তৈরি একটি লঞ্চে করে এখানে এসেছিলেন তিনি। এ সময় আব্দুল হেকিম চৌধুরীসহ অনেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিলেন। লঞ্চ থেকে নেমেই বঙ্গবন্ধু প্রথমে বাড়ির সামনের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে বাংলোঘর পার হয়ে সরাসরি চেয়ারম্যানের মূল ঘরে প্রবেশ করেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে বাড়ির সামনের বাংলো বারান্দায় দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন তিনি। পরে কিছু সময় বিশ্রামের পর লঞ্চযোগে ধরমপাশামুখী রওয়ানা দেন বঙ্গবন্ধু।
গোলাম মোস্তফা আরও জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠটা মাইকের আওয়াজের মতো উচ্চস্বরসম্পন্ন। বক্তব্য প্রদানকালে মাইক ছাড়াই তাঁর কণ্ঠে যেন বারুদ বের হয়ে আসছিল। বাঙালির অবিসংবাদিত এই নেতার সাথে হাত মেলানো, খুব কাছ থেকে দেখা ও কাছে দাঁড়িয়ে বক্তব্য শোনাটাই যেন ভাগ্যের ব্যাপার তার কাছে। সে অর্থে তিনি ভাগ্যবান বলে মনে করেন।
বললেন, বঙ্গবন্ধুর সামনে দাঁড়াইয়া বক্তব্য শুনছি, তাঁর ডানে দাঁড়াইয়া নামাজ পড়ছি, কত ভাগ্যবান আমি। তাঁর ডাকে যুদ্ধ শুরু হইল, দেশ স্বাধীন হইল। পরে পাষণ্ডরা তাঁকে হত্যা করলো। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবরে চোখের জল আটকাইয়া রাখতে পারি নাই। এখনও চোখের সামন ভাইসা ওঠে সবকিছু। নেতার মতোই নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। লঞ্চ থাইকা নামার পরে তার সমানে সমানে হাইটা যাইতে পারি নাই, তিনি যে লম্বা লম্বা খাইকে হাটতেন, তাঁর সঙ্গে হাটতে গিয়া আমাদের দৌড়ানো লাগছে।
সুখাইড়-রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মনছব রাজা চৌধুরীর ছেলে আমানুর রাজা চৌধুরী জানিয়েছেন, তাদের বাড়িতে যখন বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন তখন তিনি এক বছরের শিশু। জাতির জনকের আগমনে তাদের বাড়ি বা এ গ্রামই শুধু নয়, এই ইউনিয়নসহ পুরো উপজেলাই ধন্য হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মতো ক্ষণজন্মার পা পড়েছে এই বাড়িতে, তিনি এসেছেন বলেই ইতিহাসের অংশীদার হতে পেরেছেন তারা। এই বাড়ির বাংলো, মসজিদ ও মূলঘর সবখানেই বঙ্গবন্ধুর ছোঁয়া লেগে আছে। তাই বাবার কথা অনুযায়ী পুরো বাড়িটা সংরক্ষণে রাখতে অনেকটা একাকীই বসবাস করছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি রক্ষায় বাংলো ঘরটিকে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’এ রূপান্তর করা হয়েছে বলে জানালেন আমানুর রাজা চৌধুরী।