আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে

স্টাফ রিপোর্টার
সিংহস্থা শশিশেখরা মরকতপ্রখ্যা চতুর্ভির্ভুজৈঃ
শঙ্খং চক্রধনুঃশরাংশ্চ দধতী নেত্রৈস্ত্রিভিঃ শোভিতা ।
আমুক্তাঙ্গদ-হার-কঙ্কণ-রণৎ-কাঞ্চীক্বণন্নূপুরা
দুর্গা দুর্গতিহারিণী ভবতু নো রত্নোল্লসৎকুণ্ডলা ।।
{শ্রীশ্রীচণ্ডী, মহাসরস্বতীর ধ্যান, শ্লোক – ২}
[সিংহারূঢ়া শশিশেখরা, মরকতমণির তুল্য প্রভাময়ী, চারিহস্তে শঙ্খ, চক্র ও ধনুর্বাণ ধারিণী, ত্রিনয়ন দ্বারা শোভিতা, কেয়ূর, হার ও বলয় এবং মৃদু-মধুর ধ্বনিযুক্তা চন্দ্রহার ও নূপুর পরিহিতা এবং রত্নে উজ্জ্বল কুণ্ডল ভূষিতা দুর্গা আমাদের দুর্গতি নাশ করুন।]
শারদীয় দুর্গোৎসবের পূণ্যলগ্ন মহালয়া। কল্যাণময়ী জগতজননী দুর্গা দেবীকে মর্ত্যে আসার আমন্ত্রণ জানানোর দিন। শুরু হলো বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম দুর্গা পূজার ক্ষণগণনা। আনন্দময়ীর আগমনে, ঢাকের বাদ্যে, শঙ্খ ও উলু ধ্বনি, চন্দনের সৌরভে, ধূপের ধোঁয়া, আরতির অনুষঙ্গে জগন্ময়ীর সামনে নব পরিধানে-সাজে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে সবাই। যান্ত্রিক জীবনের বাইরে গিয়ে স্মৃতির পাতায় সঞ্চিত হবে কিছু আনন্দঘন মুহূর্তের। বড় আনন্দের কয়েকটা দিন। প্রতি বছরের চেনা ছবিটারই আবার ফিরে আসা। আনন্দময়ীর আগমন আমাদের দিনগত পাপক্ষয়লব্ধ জীবনের সমস্ত হতাশা বিপন্নতা শোক ব্যাকুলতাকে ঢেকে দিতেই। আকাশ-বাতাসে এখন কেবলই আগমনীর সুর। মিলন উৎসবে মেতে উঠার দিন যে দোরগোরায় তা মনে করিয়ে দেওয়ার দিন আজ।
‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির/ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা/প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা ………………আজ চিৎ-শক্তিরূপিনী বিশ্বজননীর শারদ-স্মৃতিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা।-
(মাতৃবন্দনা-বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র)
এ বার দেবী দুর্গা গজে চড়ে আসছেন এবং গমন করবেন নৌকায়। আগামী ১ অক্টোবর শনিবার মহাষষ্ঠী তিথিতে হবে বোধন, দেবীর বন্দনা পূজা। ৫ অক্টোবর বুধবার দশমীতে বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠায় মহাশক্তির প্রতীক দেবী দুর্গা। মায়ের মতোই আবির্ভাব ও ভূমিকা তার। এ জন্যই তিনি সকলের মা দুর্গা। প্রতিবছর শরৎকালে দুর্গা দেবী মর্ত্যে আসেন ভক্তদের কল্যাণ সাধন করে শত্রুর বিনাশ ও সৃষ্টিকে পালন করার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে নিয়ে আসেন তার সন্তান গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে। এবারও তার আগমনী বার্তা পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। আজ মহালয়া উদযাপনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। মণ্ডপে মণ্ডপে উচ্চারিত হবে মা দুর্গার আগমনী ধ্বনি।
‘আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে।
সপ্তসিন্ধু কল্লোল রোল বেজেছে সপ্ত তারে, জননী এসেছে দ্বারে।
…………………………
আজ সপ্ত তীর্থ একসাথ হয় হৃদি মন্দির দ্বারে
তুলে নাও বুকে তারে জননী এসেছে দ্বারে, ॥
(হীরেন বসু)
শাস্ত্রীয় বিধান মতে, মহালয়ার অর্থ হচ্ছে মহান আলোয় দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে আবাহন। কন্যা-জায়া-মাতৃরূপে শরৎকালেই দেবী দশভূজা পূজিত হন ঘরে ঘরে। কখনও তিনি উমা, পার্বতী, মহামায়া, কৈলাশি, দুর্গতিনাশিনী, পরমা প্রকৃতি, নারায়ণী, মাহেশ্বরী, গিরিজা, গৌরী, দাক্ষায়ণী আবার কখনও বা মহিষাসুরমর্দিনী দশপ্রহরণধারিণী দেবী দুর্গা। রামপ্রসাদ তো দেবী দুর্গাকে কন্যা বলে অবিহিত করেছেন। কৈলাস থেকে পিত্রালয়ে উমার এই আগমন যেন বিবাহিতা কন্যার বৎসরান্তে পিতৃগৃহে আগমনের রূপকমাত্র। শ্রীশ্রীচণ্ডিতে বলা হয়েছে, জগৎপ্রপঞ্চের অন্তরালে এক মহাশক্তি আছেন। তিনিই মহামায়া। এই মহামায়াই জগৎ সৃষ্টি করেন, পালন করেন আবার প্রলয়কালে সংহারও করেন।
‘আজি কী তোমার মধুর মুরতি
হেরিনু শারদ প্রভাতে।
……………….
মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে জননী,
শরৎকালের প্রভাতে। …’
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
কবির ভাষায় শারদীয় দুর্গা পূজা মানেই শরতের শিশিরভেজা প্রকৃতি, শরতের নবীন ভোরের আলো, কাশফুলের দুলুনি, কখনও কয়েক ছিটে ইলেশগুঁড়ি বৃষ্টি, গালিচার মতো বিছানো শিশির-ভেজা কমলা-সাদা শিউলি ফুলের মধুরতা। যদিও শহুরে জীবনে এসব দেখা যায় না বললেই চলে। তবে কাশফুল ফুটলে শরৎ আসে, না শরৎ এলে কাশফুল এসব নিয়ে বিস্তর তর্ক চলতে পারে। কিন্তু মহালয়া এলেই যে দুর্গাপূজা এসে যায়, তা নিয়ে তর্কের কোনও অবকাশ নেই। মহালয়া এলেই সেই দেবী-বন্দনার সুর ধ্বনিত হয়। দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ। বুকের মধ্যে জাগে আনন্দ-শিহরিত কম্পন, মা আসবেন।
শ্রীশ্রীচণ্ডীর নারায়ণী স্তুতিতে বলা হয়েছে, মহামায়া বিশ্বব্যাপিনী হইলেও নারীমূর্তিতে তাঁহার সমধিক প্রকাশ। দেবীর অংশে নারীমাত্রেরই জন্ম। নারীমূতি জগদম্বারই জীবন্ত বিগ্রহ। প্রত্যেক নারীতে মাতৃবুদ্ধি করা এবং প্রত্যেক নারীকে দেবীমূর্তিজ্ঞানে শ্রদ্ধা করাই মহামায়ার শ্রেষ্ঠ উপাসনা।
ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবীকে আরাধনা করেছিলেন লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য। শ্রীরামচন্দ্র অকালে অসময়ে পূজা করেছিলেন বলে এই শরতের পূজাকে দেবীর অকাল বোধন বলা হয়। পুরাণ মতে, মহালয়ার দিনে, দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধের দায়িত্ব পান। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব ত্রয়ী সন্মিলিত ভাবে ‘মহামায়া’ এর রূপে অমোঘ নারীশক্তি সৃষ্টি করলেন এবং দেবতাদের দশটি অস্ত্রে সুসজ্জিত সিংহবাহিনী দেবী দুর্গা নয় দিন ব্যাপি যুদ্ধে মহিষাসুরকে পরাজিত ও হত্যা করলেন।

আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের তিথীকে বলা হয় মহালয়া। এই কৃষ্ণপক্ষকে বলা হয় পিতৃপক্ষ। পিতৃপক্ষে স্বর্গত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পন করা হয়। সনাতন ধর্মে কোনও শুভ কাজ করতে গেলে প্রয়াত পূর্বজ-সহ সমগ্র জীব-জগতের জন্য তর্পন করতে হয়, কার্যাদি-অজ্ঞলি প্রদান করতে হয়। তর্পন মানে হল খুশি করা। ভগবান শ্রীরাম লঙ্কা বিজয়ের আগে এই দিনে এমনই করেছিলেন। যাদের পিতা-মাতা প্রয়াত তাদের পিতা-মাতার জন্য, সাথে সমগ্র জীব-জগতের জন্য ‘তর্পণ’/কার্যাদি-অঞ্জলি প্রদান করতে হয়। আশ্বিন মাসের এই কৃষ্ণপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনায় যে অমাবস্যাকে আমরা ‘মহালয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করি, সেই দিনটি হচ্ছে পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার সন্ধিলগ্ন। পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার মাধ্যমে এই দিনটিতে আমরা আমাদের এই মানব জীবনকে মহান করে তুলতে প্রয়াসী হই।
মার্কণ্ডেয় পুরাণে বলা হয়েছে, পিতৃগণ তর্পণে/শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন। মহালয়া হচ্ছে পিতৃপক্ষের শেষ দিন এবং দেবী পক্ষের আগের দিন। এক কথায় শারদীয় দুর্গা পূজার সকল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে আজ ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে। আলোর বেণু বাজিয়ে প্রকৃতি আবাহন করছে মায়ের। মা আসছেন। দুর্গতিনাশিনী দেবী মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা- ‘হে মা তোমার অসুরদলনী তেজ ও বিভিন্ন আয়ুধের দ্বারা যেন জগৎসংসারের দুর্গতি, বিভেদ, বিবাদ, অনৈক্য, ব্যক্তিগত ক্ষুদ্রস্বার্থ, সংকীর্ণতা দূর হয় চিরতরে। আমাদের অন্তরে যেন আত্মশক্তির জাগরণ ঘটে।’
ও মা দনুজ-দলনী মহাশক্তি নমো অনন্ত কল্যাণ-দাত্রী (নমো)।
পরমেশ্বরী মহিষ-মর্দিনী চরাচর-বিশ্ব-বিধাত্রী (নমো নমঃ)।।
……………………………..
রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও, মান দাও, দেবতা কর ভীরু মানবে।
শক্তি বিভব দাও, দাও মা আলোক
দুঃখ-দারিদ্র্য অপগত হোক্,
জীবে জীবে হিংসা, এই সংশয় (মাগো) দূর হোক পোহাক এ দুর্যোগ রাত্রি।।
(কাজী নজরুল ইসলাম)