আজ ১৭ ইউনিয়নে নির্বাচন, এই নির্বাচন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধির সহায়ক হোক

সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ১৯ কেন্দ্র জবরদখলের আশঙ্কা মাথায় নিয়ে আজ জেলার সদর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার ১৭ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১৯ কেন্দ্র জবরদখলের অভিযোগকে প্রার্থীদের নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসাবে ধরে নিলেও সাধারণ ভোটাররা এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যেই থাকেন নির্বাচনের দিন ও পরের আরও কিছু দিন। জয়-পরাজয় সমানভাবে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি রপ্ত করতে না পারার কারণেই ভোটারদের এই অস্বস্তি। সুনামগঞ্জে প্রথম ধাপের নির্বাচন নিয়ে মোটাদাগে কোনো অভিযোগের খবর পাওয়া যায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও জনসমক্ষে এরূপ কোনো আপত্তি উত্থাপন করেননি। নির্বাচনের পর দুই একটি জায়গায় বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেলেও সবকিছু মিলিয়ে প্রথম ধাপে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ বলা যায়। আজ সদর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলায় যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেখানে কোনো আপত্তিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হবে না এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।
আমরা সবসময় বলি, জয়-পরাজয়ের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। ভোটাররা যাকে অধিক সংখ্যায় ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন তিনি মূলত তার নির্বাচনী অধিক্ষেত্রের সকলের প্রতিনিধিরূপেই বিবেচিত হন। তাঁর জয়কে অভিনন্দন জানানো প্রতিদ্বন্দ্বীগণের কর্তব্য। আবার যিনি বিজয়ী হন তিনি সকল মতপার্থক্য ও বিরোধ ভুলে প্রকৃত অর্থে সকলের জনপ্রতিনিধি হয়ে উঠবেন এরকম চর্চাটি একেবারেই আবশ্যক। এই দুইয়ের মাঝে যখন ঘাটতি তৈরি হয় তখনই সমস্যার জন্ম হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য আজ নির্বাচিত হওয়া কিংবা না হওয়াকে কিছু প্রার্থী জীবন-মরণ সমস্যা হিসাবে বিবেচনায় নেন। এর ফলে পরাজয়কে মেনে নিতে না পারার এক বিধ্বংসী অবস্থান গ্রহণ করেন এরা। এর ফলেই নির্বাচনী পরিবেশ হয়ে উঠে অশান্তিময়। সারা দেশে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হতাহতের ঘটনাগুলো এই বেপরোয়া মনোবৃত্তির পরিচয় বহন করে। আমরা গণতন্ত্রের এমন নগ্ন এবং হিংসাত্মক রূপ দেখতে চাই না বলেই প্রতিটি নির্বাচনের সময় একই ধরনের আর্তি প্রকাশ করি।
ভোট গ্রহণের সাথে জড়িত নানা পক্ষের উপরও এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নির্ভর করে। ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তা, কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ফলাফল সমন্বয় ও ঘোষণার সাথে জড়িত রিটানিং কর্মকর্তা; এরা যার যার জায়গায় বিধিমোতাবেক কাজ করলে নির্বাচনী পরিবেশ ভালো থাকে। এর বাইরে প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচ- সংযম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হয়। একসময় আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো উৎসবমুখর ছিলো। মানুষ দলে দলে গ্রামে ফিরে যেত ওই উৎসবে যোগ দিতে। ভোটের দিনের সকালে তারা সুন্দর কাপড় গায়ে চাপিয়ে ভোটকেন্দ্রে হাজির হতেন। ভোট দিতেন, সামাজিক পুনর্মিলনের কাজটিও হয়ে যেতো। বহুদিন পর কারও সাথে দেখা হওয়ার উপলক্ষ হয়ে উঠতো নির্বাচনের দিনটি। মেলার মতো রঙিন হয়ে উঠতো আমাদের গ্রামগুলো। বদলে যাওয়া সময়ের হাত ধরে নির্বাচনের এই সার্বজনীনতা এখন হ্রাস পেয়েছে। মানুষ এখন নির্বাচনকে নিজের প্রতিনিধি তৈরির মাধ্যম ভাবেন না। তবুও ভোট প্রদানে সাধারণ ভোটারদের উৎসাহের কোনো ঘাটতি দেখা যায় না। কেন্দ্রে কেন্দ্রে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট কাস্ট হওয়া থেকে এটি বুঝা যায়। জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের এই জনউদ্যোগটিকে আবারও উৎসবমুখর ও সর্বজনীন জায়গায় নিয়ে যাওয়া আমাদের কাম্য। এই কামনা পূরণের জন্য চাই সর্বস্তরে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ।
দুই উপজেলার ১৭ ইউনিয়নে আজ যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তারা সকলে মিলে নিজেদের এলাকায় গণতান্ত্রিক সৌন্দর্যের জায়গাটিকে উদ্ভাসিত করুন। তারা জয় ও পরাজয়কে সমানভাবে গ্রহণ করুন। তাঁদের উদ্যোগ ও উদ্যম আমাদের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধির সহায়ক হোক। এই কামনা। এই কামনা থেকেই ১৭ ইউনিয়নে আজ জনরায়ে যারা বিজয়ী হবেন তাদের সকলকে আগাম শুভেচ্ছা।