আতংকে গ্রামে ফিরেনি মেয়ে ও শিশুরা

বিশেষ প্রতিনিধি
‘‘গাঁওয়ের হকলে (সবাই) যখন আইয়া দোষারোপ করা শুরু করছইন, আমার চোখে পানি আসে। ছেলেটি এসে আমার হাত ধইরা কয়, ‘মা বিশ^াস করো আমি ইতা করছি না। কেমনে অইছে আমি জানি না।’ তোর জন্য এখন হকল বিপদে পড়ছে। ছেলেটি আমার মুখের দিকে থাকাইয়া হাত ছাইরা চলে গেছে। আমি জানি না আমার ছেলে ইটা করছে কী-না। আমার ছেলে কইরা থাকলেও গাঁওয়ের হকলের বাড়িত তারা হামলা করলো কেনে? অখন হকলে (সবাই) আমরারে দোষারোপ কররা।’’
নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপনের মা নিভা রানী দাস চোখের পানি ঝড়াতে ঝড়াতে বলছিলেন, তার ছেলে অপরাধ করলে সে যেন শাস্তি পায়, এটি তিনিও চান। কিন্তু যারা নিরীহ গ্রামবাসীর বাড়ি-ঘর লুটপাট করেছে, মন্দির, দেবতা ভাঙচুর করেছে, তারাও যেন শাস্তি পায়।
ঝুমনের বোন মনিকা রানী দাস বললো, আমার ভাইতো পুলিশের হেফাজতে, কিন্ত তার আইডি এখনো সচল, এটা কী করে হয়। কীভাবে এসব হচ্ছে বুঝতেই পারছি না।
হামলার সময় ঝুমনের স্ত্রী সুইটি রানী দাস ঝাপির (ধান রাখার পাত্র) নীচে লুকিয়েছিল। বাড়ি তছনছ করে ফেরার সময় হামলাকারীদের একজন তার শাড়ির আচলের একটি অংশ দেখে আবার ফিরে এসে তাকে চুলে ধরে ঘাড়ে রোল দিয়ে আঘাত করে। এসময় হাত জোড় করে সুইটি মাপ চায়। হামলাকারীদের একজন বলে ওঠে ও ঝুমনের বউ মাপ করা যাবে না। আরও দুইজন বলতে কানের স্বর্ণের দুল এবং গলার চেই খুলে দে। ঘরে টাকা থাকলে তাড়াতাড়ি বের করে নিয়ে আয়। গলার চেইন, কানের দুল এবং আমার শ্বাশুরির সামান্য টাকা সঙ্গে সঙ্গেই তুলে দেবার পর ফিরে যায় ওরা।
গ্রামের মেয়ে ও শিশুদের অনেকে এখনো ফিরে নি
বুধবার সকাল ৮টায় দা, রামদা, ছুলপি, লাটিসোটা নিয়ে গ্রামের দিকে যখন শত শত মানুষ স্লোগান দিয়ে দিয়ে আসছিলো, গ্রাম ছেড়ে হাওরের দিকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ছুটে সবাই। নারী শিশুসহ হাওরের ওপারের গ্রামগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নেয় তারা। এদের মধ্যে পুরুষদের কেউ কেউ বিকালেই বাড়ি ফিরেন, বয়স্ক মহিলারাও বাড়ি আসেন। ভয়ে আতঙ্কে গ্রামের সোমত্ত মেয়ে ও শিশুদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন নি এখনো অনেকে। দূরের গ্রামগুলোর আত্মীয় স্বজনের বাড়িতেই আছে এরা।
গ্রামের ষাটার্ধো ভানু রঞ্জন দাস জানালেন, তাঁর মেয়ে সুপ্রিয়া রানী দাস (১৬) হাওরের ধানক্ষেত দিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে মামার বাড়ি গিয়ে ওঠেছে। এখনো সে ভয়ে বাড়ি আসতে চাচ্ছে না। আমিও সাহস পাচ্ছি না তাকে ফিরিয়ে আনতে। কীভাবে আনি, যারা এসে হামলা করেছে তাদের সঙ্গে মিলে মিশে কয়েক পুরুষের এখানেই কেটেছে। তারা এভাবে বাড়ি এসে হামলা করতে পারার ঘটনা চিন্তা করতেও কষ্ট হয়। এখন মেয়েকে বাড়ি আনতে সাহসই পাচ্ছি না।
একই ধরণের মন্তব্য করলেন, রনধীর দাস (৪০)। বললেন, মেয়ে আইভী (১৪) ও ছেলে শুভ (৯) কে বাড়ি আনেননি। ওরাও আসতে চাইছে না। উল্টো তারা (স্বামী-স্ত্রী) যেন তাদের কাছে চলে যাই আমরা কান্না কাটি করে বলছে ছেলে-মেয়ে। মেয়েটি বলছে, বাবা যেভাবে বড় বড় রামদা নিয়ে এসেছিল। আমরা আর বাড়ি যাব না।
গ্রামের সীমা রানী তালুকদার ও প্রসেন দাস ২ শিশু কন্যা নিয়ে দৌঁড়ে হাওর পারি দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টা পর্যন্ত বাড়ি আসেননি এরা। বললেন, দুপুর ১২ টায় গ্রামে র‌্যাব ও পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে খবর পেয়ে বাড়ি ফিরেছি। এসে দেখি ঘরের ভেতরে সব কিছু ভেঙে তছনচ। চালের ড্রাম থেকে চালগুলো নিয়ে বাইরে ফেলা হয়েছে। শোকেস ভেঙে স্বর্ণালংকার টাকা পয়সা সব নিয়ে গেছে।
গ্রামের ফুলতারা রানী দাস ও রঞ্জনা রানী চৌধুরী বললেন, বেশির ভাগ পরিবারের সোমত্ত মেয়ে ও শিশুদেরকে বাড়ি এখনো আনেন নি অভিভাবকরা।
আওয়ামী লীগের সহায়তা বিতরণ
সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বৃহস্পতিবার বিকালে নোয়াগাঁওয়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে দলের পক্ষ থেকে সহায়তা তুলে দেন। এসময় দলের নেতা সুবীর তালুকদার বাপ্টু, ঈশতিয়াক শামীম, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসিকুর রহমান রিপন সঙ্গে ছিলেন। এছাড়া দিরাই উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রঞ্জন রায়, দিরাই পৌরসভার সাবেক পৌর মেয়র মোশারফ মিয়া। জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা অ্যাডভোকেট বিশ^জিৎ চক্রবর্তী, পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিমল বণিকসহ সংগঠনের নেতারা ক্ষতিগ্রস্তদের শান্তনা দিতে গ্রামে যান।
প্রসঙ্গত. জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের সমর্থকরা বুধবার হামলা, লুটপাট ও ভাংচুর করেছে নোয়াগাঁও গ্রামের ৮৮ টি বাড়িতে। এসময় গ্রামের ৫ টি মন্দির ভাংচুর করা হয়। নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মাওলানা মামনুল হককে কটাক্ষ করে কথিত স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় বুধবার সকাল ৮ টা থেকে ১০ টার মধ্যে এই তা-ব চালানো হয়।
গত সোমবার সুনামগঞ্জের দিরাই স্টেডিয়ামে হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বক্তব্য দেন। এসময় ধর্মীয় উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন মামুনুল হকসহ হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা।