আবারও বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়বে?

বৃহস্পতিবার নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়ার ঘোষণা দেয়ার পর চলতি মাসেই ফের আরও ৫ শতাংশ মূল্য বাড়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। দৈনিক সমকাল ১৪ জানুয়ারি ২০২৩ সংখ্যায় এই সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি গ্যাসের দাম বাড়ারও আগাম তথ্য দেয়া হয়। এছাড়া পরবর্তীতে বিদ্যুতের দাম আরও ৫ শতাংশ বাড়িয়ে মোট ১৫ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির পূর্বাভাসও রয়েছে সংবাদটিতে। আইএমএফ এর নিকট থেকে প্রত্যাশিত ঋণ পাওয়ার জন্য তাদের শর্ত পূরণের অংশ হিসাবে এই মূল্য বৃদ্ধির তৎপরতা। আইএমএফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে তাদের ঋণ পেতে হলে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন খাতে বিদ্যমান ভর্তুকি ক্রমাগত হ্রাস করতে হবে। চলতি অর্থবছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দেয়ার জন্য ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। মূল্য বৃদ্ধির লক্ষ্য হলো এই ব্যয় সাশ্রয় করা। বিদ্যুতে লোকসানের অন্যতম কারণ হলো সিস্টেম লসের নামে বিশাল অংকের চুরি। এই চুরি কমানোসহ বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সরলভাবে দাম বাড়ানোর মাধ্যমে সেটি সাধারণ গ্রাহকদের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। সাধারণত বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়া হিসাবে বাজারে বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য ও সেবার দাম বাড়ে। এবারও তা হবে। বাজারের পাগলা অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়ার ঘটনাটি বাজারের অতিশয় পাগলাটে বৈশিষ্ট্যকে আরও বেশি প্রকটিত করবে। নাভিশ্বাস উঠবে মানুষের। নির্বাচনের শেষ বছরে এসে সরকার কেন এমন জনদুর্ভোগতৈরিকারী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছন থেকে যারা কলকাঠি নাড়ছে তারা সুনিপুণভাবে জনঅসন্তুষ্টি উসকে দেয়ার ব্যবস্থাটি বেশ পাকাভাবে বন্দোবস্ত করতে পেরেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো সরকারের দায়িত্বশীল মহল বিষয়টি অনুধাবনে ব্যর্থ হচ্ছে।
আইএমএফ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভর্তুকি হ্রাস করে জনজীবন দুর্বিষহ করে তুলতে ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে কিন্তু তারা উন্নত দেশগুলোতে এই সবক দিতে একেবারেই উৎসাহী নয়। আমরা জানি উন্নত দেশগুলোতে খাদ্য, কৃষি, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন জায়গায় জনগণকে সহায়তা দিতে প্রচুর ভর্তুকি দিয়ে থাকে। সে জায়গায় আইএমএফ’র কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে এরকম অন্যায্য শর্ত আরোপের মাধ্যমে মূলত সেসব দেশের মেরুদ- ভেঙে দেয়ার ব্যবস্থা করে। এসব বিশ্বসংস্থা মানুষের বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জন্য সুবিধাদি যেভাবে সংকোচিত করার জন্য বলে সেভাবে অনুৎপাদনশীল খাতে বিপুল ব্যয় হ্রাস করার কথাও বলে না। অথবা দুর্নীতির মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠিত হয় সে নিয়েও তারা কথা বলে না। কেবল দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে জাতীয় সক্ষমতা বহুল পরিমাণে বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এসবের কিছুই না করে গরিব ও প্রান্তিক মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানোর জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম বাড়ানোর অশুভ প্রবণতা বন্ধ করা দরকার। জাতীয় স্বার্থে সরকারকে নিজের দেশের জনগণের সুবিধা অসুবিধার দিকটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। নতুবা জনগণের সাথে সরকারের যে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হবে তা আর কিছু দিয়ে রোধ করা সম্ভব হবে না।
দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য আমরা আশা করি বিদ্যুৎ বা গ্যাসের দাম বাড়ানোর মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে সরকার পুনর্বার চিন্তা করবে। এর বিকল্প হিসাবে বিদ্যুৎ বা সেবা সেক্টরের বিশাল বিস্তৃত দুর্নীতি বন্ধ করা এবং অপরেটিং খরচ কমানোর মতো অপরিহার্য বিষয়গুলোর দিকে বেশি নজর দিলে আখেরে লাভ হবে। ঘন ঘন দাম বাড়ানোর মাধ্যমে মানুষের ধৈর্যশক্তির পরীক্ষা নেয়া নেহায়েৎ বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এমন কর্মকা- সরকারের বিশাল বিশাল অর্জনকে ম্লান করে দিবে।