আমার বাবা…

ড. সউদ ফারহান চৌধুরী দীপ
বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু। আমার বাবা। আজ তার জন্মদিন। কিন্তু আজ আর তাকে সরাসরি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হবে না। কারণ, বিগত ২৪ শে ফেব্রুয়ারি আমাদের সবাইকে ছেড়ে আরো ভাল এক জায়গায় চলে গেছেন।
অনেকেই বাবাকে নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন। অনেক শোক সভায়, খবরের কাগজে বাবাকে নিয়ে কথা হয়েছে, লেখা হয়েছে। বেশিরভাগ জায়গায় বাবার যে ছবিটা ব্যবহার করা হয়েছে ওইটা আমারি তোলা ২০১২ সালে। নিচের এই লেখাটা হয়ত ওইগুলোরই আরেক অধ্যায়।
আমাদের গাড়ি হওয়ার আগে বাবার একটা ভেস্পা নামের স্কুটার ছিল। এখন হয়তো অনেকেই চিনবে না। সেটার শব্দের মাত্রা ছিল ভালই আর ইউনিক। আমার এখনো মনে পড়ে বিকাল বেলা এই শব্দটা শোনার জন্য অপেক্ষা করার কথা। দৌঁড়ে গিয়ে দেখা বাবা আমাদের জন্য কি আনল জালালাবাদ কনফেকশনারি থেকে। বাবার চেম্বারের প্রতিটা ড্রয়ার চেক করা ছিল আমার নেশা। কত ধরনের কলম, কাগজের দিস্তা, স্টেশনারি আর বাবার জরুরি কাগজপত্র। কতবার বাবা আমাকে দেখেছে ওইগুলো ঘাটতে। কখনই আমাকে বারণ করেনি। বাবা আমাদের এতো কম বকা দিয়েছে যে আমরা মাঝে মাঝে গুনতে বসতাম আর খুবই সহজেই গোনা শেষ হয়ে যেত। বাবার কয়েকটা অদ্ভুত গুণের কথা বলি। আমি বাবাকে জীবনে বড় বড় মন্ত্রীদের সাথেও কথা বলতে শুনেছি, আবার বাসার সামনের মাছ বিক্রেতার সাথেও। কিভাবে জানি বাবা সবার সাথে সবার কাতারে গিয়ে কথা বলতে পারতেন। তাকে কখনো বিরক্ত হতে দেখিনি। সবাই মনে করত বাবা বুঝি তাকেই সব চাইতে পছন্দ করেন। আর বাবা মাঝে মাঝে তথ্য দিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে পারতেন। এইতো কয়েকদিন আগের কথা। বাবাকে ২০১৫ তে জানালাম যে আমার একটা ইন্টারনশিপ হয়েছে ইন্টেলে তাই যেতে হবে আরিজোনা রাজ্যে। তখন আমার আমেরিকার রাজনীতির ধারনা নেই। খবরটা জানানোর পরেই বাবা অভিনন্দন জানিয়ে বললেন- তো যাচ্ছ একজন প্রাক্তন আমেরিকান প্রেসিডেন্সিয়াল কান্ডিডেটের রাজ্যে। আমি কিছুক্ষন চুপ থাকলাম। বাবা বুঝতে পারলেন। তখন বললেন, ওই যে জন ম্যাক্কেইন কে চিন না তুমি তো তার ওখানেই যাচ্ছ। এখনো মনে পড়ে কোন এক সন্ধ্যায় সিলেট থেকে গাড়িতে ফেরার কথা। আমাদের ড্রাইভার, বাবা আর আমি। বাইরে অনেক বৃষ্টি। গাড়ির ভেতর মান্না দের কফি হাইজের সেই আড্ডাটা গান চলছে। হঠাৎ বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা দীপ তুমি কি জান এই যে গানে চারমিনার এর কথা বলে এটা কি। আমি বলি না বাবা জানি না তো। বাবা তখন বললেন, ওই গানে যে সময়টা বলা হচ্ছে ওইসময় চারমিনার নামের একটা সিগারেট অনেক বিখ্যাত ছিল, এইখানে ওটার কথাই বলছে। এরকম আরো কত কিছু শোনা আর জানা বাবার কাছ থেকে। বাবার সবচাইতে পছন্দের ছিল ঘুরে বেড়ানো। কাছের ভারত থেকে শুরু করে ইংল্যান্ড, জার্মানি, আমস্টারডাম, নেদারল্যান্ডস, আমেরিকা, চায়না আরো কত দেশ ঘোরা হয়েছিল তার। শেষের দিকে কানাডার ভিসাটাও নেয়া ছিল কিন্তু যাওয়া হল না। বাবা একবার আমাদের রেখে ইউরোপে গিয়েছিলেন। প্রতিটি শহর থেকে তিনি আমার নামে একটা করে ভিউকার্ড আর ভিউকার্ডের পিছনে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন। এখনো আম্মু যতœ সহকারে ওইগুলো রেখে দিয়েছেন। বাবা কখনোই সেই ছোটবেলা থেকেই আমাদের পড়ালেখায় এত নাক গলাতেন না। প্রথম প্রথম যে কেউ এটাকে বাবার উদাসিনতা ভাবতে পারেন কিন্তু আমি পরে বুঝেছি যে বাবা আসলে আমাদেরকে নিজের উপর নিজের আস্থা বাড়ানোর আর নিজেরটা নিজের বোঝার জন্যই এমন করতেন। তিনি মনে করতেন জোর করা জিনিস খুব একটা দূরে যায় না। এইচএসসি পরীক্ষার পর একদিন বাবাকে বললাম, বাবা আমার সিনেমাটগ্রাফি নিয়ে পড়তে ইচ্ছা করে। বাবা আমার সুরের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে শুরু করলেন কোথায় পড়তে যাওয়া যেতে পারে, কিভাবে আমি ভাল করতে পারি। তার দুইদিন পরেই আমি বললাম থাক বাবা আমার মনে হয় বুয়েটে হয়ে যাবে। তখন আবার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কোন কোনটার ফর্ম কেনা হয়েছে। আমি বললাম শুধুই বুয়েট। বাবা আমাকে বললেন, এতো ওভারকনফিডেন্স না হয়ে কুয়েট, সাস্ট, আইইউটি আর ঢাকা বিশব্বিদ্যালয়ের কিনতে। বাবার সবসময় সবকিছুতেই অতিরিক্ত প্লান রাখার অভ্যাস ছিল। তিনি আমাদের দুই ভাইবোনের জন্যই টাকা সঞ্চয় রেখেছিলেন যদি আমাদের প্রাইভেট বিশ^ব্বিদ্যালয়ে পড়তে হয় এই ভেবে। কিন্তু কখনই আমাদের বুঝতে দেননি। যখন আমরা দুইজনেই পাবলিকে পড়ার যোগ্যতা পেলাম তখনি বাবা জানিয়েছিলেন যে তার একটা ব্যাকআপ প্লান ও ছিল। অনেকের কাছে মনে হত বাবা একজন অল্পভাষী মানুষ। আসলে বাবা ছিলেন একজন হিসেব করে কথা বলা মানুষ। যেখানে কথা বলে কোন লাভ নেই ওখানে উনি কিছুই বলতেন না, আবার যেখানে কথা বলা দরকার অথবা যা বলবেন তার মূল্য পাবেন সেখানে ঠিকই অনেক কথা বলতেন। আমি গর্ব করে ভাবি বাবার এইগুণটা আমি কিছুটা হলেও পেয়েছি। বাবার সিনেমা দেখার অনেক শখ ছিল। সিনেমা হলে আমার প্রথম দেখা সিনেমা ছিল মাটির ময়না যা আমি আর বাবা দুইজন মিলে দেখেছিলাম। বাবা মারা যাওয়ার পর তার চেম্বারের টেবিলে আমি একটা সিনেমার লিস্ট পাই যেটায় শো শ্যানক রিডেম্পসন, ফরেস্ট গাম্প এর মত ছবির নাম লেখা বাবার হাতে। কেউ একজন মনে হয় বাবাকে এইগুলো রেকমেন্ড করেছিল।
এরকম অনেক কিছুই আছে যা অনেকের জানা, আবার অনেকের অজানা। এসব কিছুর মাঝেই বাবা বেঁচে থাকবেন আমার কাছে। হঠাৎ হয়তো কিছু একটা মনে হবে আর ভাবব- আর আল্লাহর কাছে দোয়া করব কতই না ভাগ্যবান ছিলাম আমি। আল্লাহ বাবার জন্য যা ভেবে রেখেছিলেন তাই হয়েছে। আল্লাহর কাছে এখন আমার দোয়া করা ছাড়া কিছুই করার নেই। সবাই বাবার জন্য দোয়া করবেন।