‘আমার মামলা খাইলো ডাক্তারে’

বিশেষ প্রতিনিধি
জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তাহিরপুরের খৈলসাজুরির শিরিনা বেগম। তিনি গ্রামের কাজিম উদ্দিনের স্ত্রী। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এই নারী। হাসপাতাল ছেড়ে যাবার সময় হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক রিয়াদ হাসানের স্বাক্ষর করা ছাড়পত্রও নেন তিনি। ১৪ দিন পর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. ফয়েজ আহমদ, মেডিকেল অফিসার সুমন চন্দ্র বর্মণ ও মেডিকেল অফিসার ডা. নিলুফা ইয়াসমিনের স্বাক্ষর করা মেডিকেল সার্টিফিকেটের ছায়ালিপিও তাকে দেওয়া হয়। ঘটনার বিচার পাবার জন্য শিরিনা বেগম স্বামী কাজিম উদ্দিন থানায় ধরণা দিয়ে কোন লাভ হয় নি। পরে আদালতে মামলা দায়ের করেন স্বামী কাজিম উদ্দিন। আদালত মারামারি’র সার্টিফিকেট চাইলে শিরিনার স্বামী কাজিম উদ্দিন ভর্তির ছাড়পত্র ও ডাক্তারের দেওয়া সার্টিফিকেটের ছায়ালিপি দাখিল করেন। আদালত এক পর্যায়ে ছায়ালিপি নয়, সার্টিফিকেটের মূল কপি চান। হাসপাতালের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে জানানো হয় শিরিনা হাসপাতালেই ভর্তি হন নি, আগে দেওয়া সার্টিফিকেটের কোন রিকুজিশন ফরমও হাসপাতালে পাওয়া যায় নি।
সোমবার দুপুরে আগের দেওয়া ছাড়পত্রের কপি ও সার্টিফিকেটের কপি দেখিয়ে শিরিনার স্বামী কাজিম উদ্দিন এ প্রতিবেদককে বললেন,‘আমরা গরিব মানুষ, মার খাইলে-সই খাইছি, বিচার পাওয়ার যেগা (জায়গা) নাই, দেখইন ভাই আগের কপিগুলো, এগুলো কি আমি বানাইছি, আদালতে মামলা করছি, অখন (এখন) ডাক্তাররা সার্টিফিকেট দেয় না।’ কাজিম উদ্দিনের এই আকুতি শুনে দিনভর এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে যেটি বুঝা গেছে, তাহিরপুর হাসপাতালে মামলার রিকুজিশন ফরম চুরির ভুত আছে!
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাহিরপুরের খৈলসাজুরির কাজিম উদ্দিনের সঙ্গে একই গ্রামের প্রভাবশালী জমির আলীর বাড়ীর সীমানা নিয়ে বিরোধ ছিল। এই বিরোধের জের ধরে কাজিম উদ্দিনের স্ত্রী শিরিনা বেগমকে প্রতিপক্ষের লোকজন বেধড়ক মারপিট করে। মার খেয়ে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর তাহিরপুর হাসপাতালে ভর্তি হন শিরিনা (২৫)। ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। হাসপাতাল ছাড়ার সময় ছাড়পত্রে আবাসিক চিকিৎসক রিয়াদ হাসান ‘শারীরিক আক্রমণ’ এর কথা লিখে দেন। কাজিম উদ্দিন প্রভাবশালী পরিবারের জমির আলীসহ তার তিন ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য দুই-তিন দিন থানায় গেলেও পুলিশ মামলা নেয় নি। পরে ১৯ দিন পর এই বছরের দুই জানুয়ারি ঘটনার বিচার চেয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন শিরিনার স্বামী কাজিম উদ্দিন।
কাজিম উদ্দিন জানালেন, তার স্ত্রীকে বেধড়ক মারপিট করেছে গ্রামের প্রভাবশালী জমির আলী ও তার তিন ছেলে। স্ত্রী চারদিন তাহিরপুর হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাতর ছিলেন। চারদিন পর ছাড়পত্র দিয়ে বিদায় করা হয় তাকে। ছাড়পত্রে কেবল ‘শারীরিক আক্রমণ’ লিখা হয়। এরপর পহেলা জানুয়ারি সার্টিফিকেটের একটি ফটোকপি তাকে দেওয়া হয়। ওটাতে উল্লেখ ছিল,‘বাম কাধে জখম, বাম হাতে জখম, মুখের বাম দিকে জখম, পেছনে নোখের আছর’। এই কাগজ নিয়ে এখানে-ওখানে ঘুরলেও তিনি বিচার পান নি। কোথাও বিচার না পেয়ে আদালতে মামলা করেন। আদালতের পক্ষ থেকে পরে সার্টিফিকেটের মূল কপি চাওয়া হয়। তিনি আদালতের চিঠি নিয়ে গিয়ে আরএম’র পায়ে ধরে সার্টিফিকেট দেবার জন্য অনুরোধ করেন। তার স্ত্রীও অনেক অনুনোয় বিনয় করেন আরএমওকে। পরে তার হাতে ডা. নিলুফা ইয়াসমিনের স্বাক্ষর করা ‘এই নামে কোন রোগী ওই সময় হাসপাতালে ছিল না’ উল্লেখ করা কাগজ গত তিন এপ্রিল তুলে দেওয়া হয়।
কাজিম উদ্দিনের আইনজীবী আব্দুল কাদির জিলানী বললেন, কাজিম উদ্দিন ঘটনার বিচার চেয়ে এই বছরের দুই জানুয়ারি মামলা দায়েরের পর আদালত মেডিকেল সার্টিফিকেট দেবার আদেশ দেন। সাত জানুয়ারি সার্টিফিকেটের ছায়ালিপিসহ দরখাস্ত জমা দেওয়া হয়। তাহিরপুর হাসপাতালের পক্ষ হতে এই মামলার সার্টিফিকেট আদালতে দেওয়া হয় নি। আমাদেরও দেওয়া হয় নি। আগামী ২৩ অক্টোবর মামলার ধার্য্য তারিখে এই বিষয়টি আদালতকে অবগত করা হবে।
ডা. নিলুফা ইয়াসমিন এখন আর তাহিরপুর হাসপাতালে নেই। তিনি সদর হাসপাতালে বদলি হয়েছেন।
তার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে আমার কাছে সোমবার সারাদিনই ফোন এসেছে। আমি যখন সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে বদলি নিয়ে ব্যস্ত, তখন কোন নাম ঠিকানা ছাড়াই কেবল একটি নম্বর দেওয়া চিঠি দিয়ে আমাকে বলা হয় মামলার রিকুজিশন ফরম দেখে সার্টিফিকেট দেবার জন্য। ডা. রিয়াদ হাসান তখন হাসপাতালের আরএমও’র দায়িত্বে। আমি অনেক খুঁজেছি এই মামলার কোন রেকর্ড পাই নি। আগে-পিছে’র রিকুজিশন ফরম আছে, এটা নেই। আমি সেভাবে লিখেই চিঠি দেই। এখন বিষয়টি জেনে আমি বিব্রত বোধ করছি। মামলার রিকুজিশন ফরম কোথায় গেলো, যারা কাগজ রাখেন বা আবাসিক চিকিৎসকই এই বিষয়ে জবাব দেবেন। এটি অবশ্যই খুঁজে দেখা প্রয়োজন, আমিও মনে করি। পহেলা জানুয়ারিতে ডাক্তারী রিপোর্টে ডা. ফয়েজ আহমদ, ডা. সুমন চন্দ্র বর্মণ স্বাক্ষর করার পর, তাদের স্বাক্ষর দেখে আমি স্বাক্ষর করেছিলাম।
তাহিরপুর হাসপাতালের অফিসে কর্মরত পরিসংখ্যানবিদ আজরফ হোসেন ও অফিস সহকারী আঞ্জুমান আরা কাগজীকে এই মামলার রিকুজিশন ফরম কোথায় গেলো, জানতে চাইলে তারা বললেন, ‘কিভাবে এটি নাই হলো, এটি খোঁজা হয়েছে কি-না, সেটি আমরা জানি না। আবাসিক মেডিকল অফিসারকে জিঙ্গেস করলে জানতে পারবেন।
তাহিরপুর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. রিয়াদ হাসান দুপুরে ঘটনাটি কিভাবে ঘটলো ডা. নিলুফা ইয়াসমিনকে জিজ্ঞেস করার কথা বলেছিলেন।
বিকাল সাড়ে পাঁচটায় বললেন, আমরা খুঁজে দেখেছি গেল বছরের ১২ ডিসেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর শিরিনা বেগম ভর্তি ছিলেন হাসপাতালের রেজিস্টারে এটি লিখা আছে। তাঁর মামলার রিকোজিশন ফরমও আছে। ডা. নিলুফা ইয়াসমিন এক্ষেত্রে অনেকটা স্ববিরোধিতা করেছেন। আদালতকে সার্টিফিকেট না দিলে শিরিনা বেগম কিভাবে পেলেন, সেটিও বুঝা যাচ্ছে না। বিষয়টি অন্যরা দেখেন, এজন্য এই বিষয়ে সকল জবাবও আমি দিতে পারছি না।