আলোকবর্তিকার বিদায়

সজীব দে
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন প্রথিতযশা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার (৭৬)। শনিবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর ইমপালস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ভর্তি হন হাসান শাহরিয়ার। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ইমপালস হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নমুনা পরীক্ষায় তার করোনা পজিটিভ আসে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দিনগত রাত দেড়টার দিকে হাসান শাহরিয়ারের অবস্থার অবনতি হলে তাকে প্রথমে রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে আনোয়ার খান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু কোথাও আইসিইউ বেড না পাওয়ায় রাত দেড়টার দিকে তাকে ইমপালস হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শনিবার মারা যান। দুই দফা জানাজা শেষে রাত সাড়ে ৮টায় প্রখ্যাত সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারকে রায়ের বাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। প্রথম জানাজা জাতীয় প্রেসক্লাবে এবং দ্বিতীয় জানাজা মরহুমের সেগুনবাগিচার বাসভবন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় প্রেসক্লাবে জানাজার পর জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনসহ বিভিন্ন সংগঠন মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
বাংলাদেশের যে কজন সাংবাদিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি লাভ করেছেন, তাঁদের মধ্যে হাসান শাহরিয়ার অগ্রগণ্য। হাসান শাহরিয়ারকে নিয়ে গর্ব করার মতো অনেক কিছু রয়েছে। ধীরস্থির, অত্যন্ত স্বাধীনচেতা একজন সাংবাদিক তিনি। উপমহাদেশজুড়েই তাঁর সুনাম রয়েছে সাংবাদিকতা অঙ্গনে। অত্যন্ত মহৎ হৃদয়, অপূর্ব জ্ঞানভান্ডার, সদাচারনিষ্ঠ, সত্যিকারের পেশাদারিত্ব কিংবা বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। ছিলেন সর্বমহলে সমাদৃত। হাসান শাহরিয়ারের জন্ম সুনামগঞ্জ শহরে ১৯৪৬ সালের ২৫ এপ্রিল। লেখাপড়া করেছেন সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় ও সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে। ১৯৬৪ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেন অনার্স সহ এমএ ডিগ্রি। ১৯৬৪ সালে সাপ্তাহিক The Democrat পত্রিকায় সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি। ছয় মাসের মধ্যে করাচি মনিং নিউজ পত্রিকায় যোগদান করেন। ১৯৬৬ সালে বিখ্যাত ‘ডন’ পত্রিকায় যোগ দেন। একই সাথে ছিলেন ইত্তেফাকের পশ্চিম পাকিস্তান প্রতিনিধি।
নীতির প্রশ্নে আপোষহীন ছিলেন হাসান শাহরিয়ার। এ দেশের সাংবাদিকতা জগতে তিনি ছিলেন এক আলোকবর্তিকা, তরুণ সাংবাদিকদের কাছে শিক্ষক সমতুল্য। তাঁর শূন্য আসন সহসা পূরণ হবে না। পঞ্চাশ বছরের বেশী সময় ধরে তিনি ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দেশ বিদেশের মর্যাদা সম্পন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। বিদেশি পত্রপত্রিকা ও সংবাদ সাময়িকীগুলোর মধ্যে নিউজউইক ইন্টারন্যাশনাল-এর সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘতম। ১৯৮১ থেকে তিনি এই বিখ্যাত সাময়িকীর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন তিন দশক ধরে। ২০১২ সালে ‘নিউজউইক’ এর মুদ্রিত সংস্করণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত হাসান শাহরিয়ারের যে সব প্রতিবেদন সাময়িকীতে প্রকাশ হয়েছিল, সে সবের একটি সংকলনও রয়েছে। ওই প্রতিবেদনগুলোর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মুক্তি সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে যেসব প্রতিবেদন সাময়িকীতে বের হয়, সেগুলোর অনুবাদও রয়েছে সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার এর ‘নিউজউইক-এ বাংলাদেশ: মুক্তিযুদ্ধ বিজয় এবং তারপর’ গ্রন্থে। এছাড়াও দুবাইভিত্তিক খালিজ টাইমস ও ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এশিয়ান এজ ও ড্যাকান হেরাল্ড-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেছেন। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার রাজনীতির উপর বিশ্লেষণমূলক ও অনুসন্ধানী অসংখ্য প্রতিবেদন লিখেছেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি, পি ভি নরসিমা রাও ও চন্দ্র শেখর, কাশ্মীরি নেতা শেখ আব্দুল্লাহ, পাকিস্তানী নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টো, জিয়াউল হক, বেনজির ভূট্টো ও নওয়াজ শরীফ, কম্বোডিয়ান নেতা প্রিন্স নরাদম শিহানুক, জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোশিকী কাইফু, নোবেল জয়ী মাদার তেরেসা ও পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেটার ইমরান খানের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন হাসান শাহরিয়ার। বলিষ্ট লেখনির মাধ্যমে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেছেন বিশ্ব দরবারে। একাধারে কলাম লেখক ও বিশ্লেষক; দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি ছিলেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন ওভারসিজ করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওকাব), দক্ষিণ এশিয়া প্রেসক্লাব, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিজেএ) ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস ও জাতীয় প্রেসক্লাব সহ দেশি বিদেশী অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সংগঠনের। টরেন্টো ভিত্তিক কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তিনিই প্রথম সাংবাদিক যিনি ২০০৩ ও ২০০৮ সালে এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ইমেরিটাস প্রফেসর আনিসুজ্জামান একটি প্রবন্ধে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান বিষয়ক সংবাদ বিশ্লেষক হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক ভাবে সুখ্যাত। আমাদের সকলের পক্ষে এটি গৌরবের কথা যে, হাসান শাহরিয়ার কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস। সাংবাদিকতা জগতে কতখানি সুনাম ও আস্থা অর্জন করতে পারলে এমন পদে তিনি অধিষ্ঠিত হতে পারেন, তা ভেবেই আমরা রোমাঞ্চিত বোধ করি।’
১৯৬৯ সালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তাঁর বড় ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এসময় হাসান শাহরিয়ার চিফ রিপোর্টার হিসেবে পদোন্নতি পান।
১৯৭১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে আসার জন্য পিআইএর ঢাকা ফ্লাইটের টিকিট ক্রয় করেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে বিদ্রোহী বাঙালিদের দমন করা বা সমুচিত শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গোপনে পিআইএর নিয়মিত ফ্লাইটে সাদা পোশাকধারী সৈন্য ও মিলিশিয়া ঢাকায় পাঠাতে শুরু করে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে। ফলে তাঁর বহু প্রতীক্ষিত ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। এ সম্পর্কে তিনি একটি নিবন্ধে বলেছেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সম্পাদিত সিমলা চুক্তির আওতায় ঢাকায় আমার আসা হলো ঠিকই; কিন্তু রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির বিজয় ও নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর। তা-ও আবার আন্তর্জাতিক রেডক্রসের মাধ্যমে, পাকিস্তানি-বাঙালি বিনিময়ের আওতায়। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে না পারার বেদনায় আমি এখনও ব্যথিত।
তিনি যখন কলেজের ছাত্র, তখনই সম্পৃক্ত হন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এর সঙ্গে। এর পর টানা ৪৫ বছর। এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও অকুতোভয় সম্পাদক মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, তাঁর দুই ছেলে ও নাতি-নাতনিদের অর্থাৎ তিন পুরুষের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেছেন এই বরণ্যে সাংবাদিক। করাচি থেকে তিনি বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে ইত্তেফাক-এ যোগ দেন ১৯৭৪ সালের ১ জানুয়ারি।
অবিভক্ত আসাম-বাংলার বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, খেলাফত আন্দোলন নেতা, ভাষাসংগ্রামী এবং সমাজসেবক মকবুল হোসেন চৌধুরী ও মা বেগম শফিকুন্নেসা চৌধুরীর ছোট ছেলে বিশিষ্ট সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার। মকবুল হোসেন চৌধুরী ও ১৯৫৭ সালের ২০ ডিসেম্বর মকবুল হোসেন চৌধুরী যখন মারা যান তখন সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন হাসান শাহরিয়ার। মেজো ছেলে হোসেন তওফিক চৌধুরী অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘পূর্বদেশ’ এর সিনিয়র রিপোর্টার ছিলেন। বর্তমানে সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিস্ট ।
বিশিষ্ট সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার এর পিতা মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকা সিলেটের ‘যুগভেরী’র (১৯৩২) প্রথম সম্পাদক। এর আগে তিনি সিলেটের ‘যুগবাণী’ (১৯২৫) ও কলকাতার দৈনিক ‘সোলতান’ (১৯৩০)-এর সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘সিলেটপত্রিকা’ (১৯৫৭) সম্পাদনা করেন। ঐতিহ্যবাহী সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মকবুল হোসেন চৌধুরী ১৯৩৭ সালে আসাম ব্যবস্থাপক সভার সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। সুরমা উপত্যকা প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হিসেবে তিনি ১৯২০ সালে ভারতের নাগপুরে অনুষ্ঠিত সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস সম্মেলনে যোগদান করেন। সরকার বিরোধী বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে ব্রিটিশ রাজ তাঁকে দু’বছর কারারুদ্ধ করে রাখে। কিছুদিনের জন্যে তিনি ইন্ডিয়ান জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিভাগের যুগ্ম সম্পাদকের দার্য়িত্ব পালন করেন।