ইউএনও ফেরত দিলেন ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা

বিশেষ প্রতিনিধি
মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার গৃহহীনদের গৃহ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জেলা প্রশাসক গেল ৭ জুন কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। দরিদ্র গৃহহীনদের দেওয়া পরিবহন খরচের ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টাকাও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক গত ৬ জুন ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
শাল্লার ১৪৩৫ গৃহহীন পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার গৃহ নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। গেল জানুয়ারি মাসেই এই উপজেলার ঘর প্রদানে স্থানীয়ভাবে অনিয়মের অভিযোগও ওঠে। ঘরের মেঝেতে ইট না দিয়ে যেনোতেনো ভাবে বালু-সিমেন্টের মিশ্রনের মসলা দিয়ে ফ্লোর করে দেওয়া, নিম্নমানের ইট, বালু, পাথর ব্যবহার, নির্মাণের মালামাল পরিবহনের টাকা গৃহহীনদের উপর চাপিয়ে দেওয়া, মিস্ত্রির টাকা গৃহহীনদের দিতে বাধ্য করাসহ নানাভাবে অসহায় মানুষজনের কাছ থেকে টাকা নেবার অভিযোগ ওঠে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এই নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়।
পত্রিকায় সংবাদের প্রেক্ষিতে গত চার ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসক মো.জাহাঙ্গীর হোসেন, ৩ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও ২০ জন ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে নিয়ে শাল্লায় তদন্তে যান। ওখানে একাধিক দলে ভাগ হয়ে নির্মাণাধীন গৃহহীনদের ঘরে ঘরে সরেজমিন যান তাঁরা। ২০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকগণসহ ২৮ জন ম্যাজিস্ট্রেট ওখানকার নির্মাণাধীন প্রত্যেক ঘরে ঘরে যান। এরপর আরও দুই দফায় জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ ২৪ জন ম্যাজিস্ট্রেট ওখানে দিনব্যাপি গিয়ে তদন্ত করেন।
তদন্তকালীন সময়েই গৃহ নির্মাণের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মামুনুর রহমানকে ১৮ ফেব্রুয়ারি স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।
তদন্ত শেষে জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন যেসব ঘরে ইট সলিং না করে মেঝে পাকা করা হয়েছে, সেগুলোতে ইট সলিং করে মেঝে পাকা করার নির্দেশ দেন। পরিবহন খরচ এবং মিস্ত্রি খরচের টাকা দরিদ্র মানুষজন যারা নিজেরা দিয়েছে, ওই টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দেন।
জেলা প্রশাসকের নির্দেশ অনুযায়ী শাল্লার অনিয়ম হওয়া ঘরগুলোতে এখন পুনরায় কাজ চলছে।
উপজেলার নারকিলা গ্রামের নজরুল ইসলাম মঙ্গলবার বিকালে এ প্রতিবেদককে বললেন, তাদের ঘরে মেঝের বালু-সিমেন্টের আস্তরণ তুলে ইট সলিং করে ঢালাই করে দেওয়া হচ্ছে। পরিবহন ও মিস্ত্রি খরচের জন্য যে টাকা তারা দিয়েছিলেন, সেই ৭ হাজার টাকা স্থানীয় ইউনিয় পরিষদ সদস্য এলাছ মিয়া তাদেরকে এনে দিয়েছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য এলাছ মিয়া বললেন, আমি টাকা দেব কোথা থেকে, আমি হুকুম পালন করি, আগে যেভাবে বলা হয়েছিল সেভাবে করেছিলাম, এখন ইউএনও সাহেবসহ কর্মকর্তারা যেভাবে বলছেন নারকিলা ও আশপাশের গ্রামের ১৯ গৃহহীনের ঘরে সেভাবে কাজ করে দিচ্ছি। স্যারদের কথামতই কাজ করছি।
উপজেলাজুড়েই এমন কাজ চলছে বলে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ও সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর হোসেন বললেন, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণে অন্যান্য উপজেলা এবং শাল্লার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অন্য উপজেলায় ঠিকাদাররা গৃহ নির্মাণ করেছে। এই উপজেলা প্রত্যন্ত হওয়ায় এখানে বেশিরভাগ ঘর উপকারভোগীরা করেছে। পরিবহনের বরাদ্দ শুরুতে আসে নাই, এজন্য দিতে পারি নাই, এখন এসেছে, ১৪৩৫ ঘরের প্রত্যেককেই চার হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টাকাই গেল ৬ জুন গৃহহীনদের দিয়েছি আমরা।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সোমবার বিকালে এই প্রতিবেদককে জানান, আমি যোগদানের পরই শাল্লায় গৃহ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। আমি গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় সভায় বলেছিলাম মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া দরিদ্র মানুষজনের উপহারে একটি টাকার অনিয়মও সহ্য করা হবে না। শাল্লায় প্রথমেই ৪ ফেব্রুয়ারি ৩ জন এডিসি, জেলার ১১ ইউএনওসহ ২০ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে ওখানে যাই, বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে দিনভর বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনিয়মের বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করেছি। ১৮ ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে বেশি ঘরের ট্যাগ অফিসার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মামুনুর রহমানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। এরপর মান্যবর বিভাগীয় কমিশনারসহ ২৮ জন ম্যাজিস্ট্রেট, পর্যায়ক্রমে ২৪ জন এবং সর্বশেষ ১৮ জন ম্যাজিস্ট্রেট সরেজমিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনিয়ম যাচাই করেছেন। আমাদের চোখে নানাবিধ ত্রুটি বিচ্যুতি ধরা পড়ে, আমরা সেগুলো সংশোধন করিয়েছি, এখনো সংশোধনের কাজ চলছে। শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা প্রদানে বাধ্য করা হয়েছে। তাকে ৭ জুন শোকজ করা হয়েছে। শোকজের জবাব পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক জানান, প্রথম দফার দেওয়া ৩৯০৮ টি ঘরের মধ্যে ৩৫০০ ঘরের কাজ শেষ। বেশিরভাগ ঘরেই ওঠেছেন গৃহহীনরা। দ্বিতীয় দফায় আগামী ২০ জুন ২০৯ টি ঘরের চাবি প্রদান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন।