ইরাক প্রবাসীদের ঈদ

মো. শাহাব উদ্দিন শিহাব
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর সমগ্র মুসলিম জাহানের আকাশে ঈদের চাঁদ বয়ে আনে হাসি-খুশি আর আনন্দের বার্তা। ধনী-গরিব সব ভেদাভেদ ভুলে সবাই শামিল হন এক কাতারে। ঈদ যেন সবার হৃদয়ে এঁকে দেয় ভালোবাসার বন্ধন! দূর প্রবাসের আকাশেও প্রতি বছর ঈদের চাঁদ ওঠে। ঈদের আনন্দে মেতে ওঠেন প্রবাসী বাঙালিরাও। তবে এ আনন্দের পেছনে স্বজনদের ছেড়ে আসার যে তীব্র যন্ত্রণা বিরাজ করে তা কেবল প্রবাসীরাই বলতে পারবেন। তবুও থেমে থাকে না ঈদ উৎসব। ভিনদেশের মাটিতেই সকল প্রবাসী এক হয়ে পালন করেন ঈদ। ঈদের আনন্দের মাঝে প্রতিটি প্রবাসীর স্মৃতির অ্যালবামে কেবলই ভেসে ওঠে বাংলাদেশের মানচিত্রের ছবি। একেকটি স্মৃতি যেন একেকটি গল্প।
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রত্যাশা আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না। একের পর এক ঈদ আসে যায়, প্রবাসীদের ঈদ রয়ে যায় নিঃসঙ্গতায়। ফজরের আজানের পর দল বেঁধে ছোটাছুটি করে গোসল সেরে মিষ্টি মুখে নতুন জামা-কাপড় পরে ঈদগাহ মাঠে যাওয়া প্রবাসীদের জন্য যেন শুধুই স্মৃতি। নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় পাশের বাড়ির কেউ ডাক দিয়ে বলে না- সেমাই খেয়ে যাও। শত কর্মব্যস্ততার মাঝে ঈদের ছুটিতে লম্বা ঘুম অধিকাংশ প্রবাসীর ঈদের দিনে মূল কর্মসূচি। ঈদের ঠিক আগের দিন থেকে মন খারাপ হতে শুরু করে। রাত পেরিয়ে সকালবেলা ঘুম ভাঙার পর আশপাশে যখন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে। মনে পড়ে যায় চিরচেনা গ্রামে ঈদ উদযাপনের স্মৃতিগুলো। ঈদ মানেই আনন্দ ঈদ মানেই খুশি। এই কথাটি দেশে থাকতে খুব শুনতে পেতাম। ঈদের আগে কেনাকাটা, বন্ধুদের ইফতার করানো, কোনো শপিং সেন্টারে গিয়ে ঘুরে আসা।
যখন দেশে ছিলাম আমার ঈদ ছিল অন্যরকম। ঈদের দিন সকালে নামাজ পড়ে মা-বাবাকে সালাম করা। আত্মীয় স্বজনের বাসায় বেড়াতে যাওয়া। সকালে ঈদের নামাজ পড়ে মা-বাবা ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় দিয়ে বিকেলে বড় আপাদের বাড়িতে যেতাম। ঈদ উপলক্ষে নানা খেলার আয়োজন করতাম। ভিন্নরকম সাজে সজ্জিত হতো। সবার সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করা বড় ভাইয়া আপুদের কাছ থেকে সালামি নেয়া এইভাবে ঈদের দিন পার করে দিতাম। দেশে থাকতে এভাবেই কাটতো আমার ঈদ। বলতে গেলে আমার ঈদে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ হতো ৭ বছর ধরে ঈদ কি সেটাই ভুলে গিয়েছি। ঈদের দিন নামাজ পড়ার পর হয়তোবা বাসায় থাকি না হলে কাজে চলে যাই। পরিবার-পরিজন বন্ধুদের ছেড়ে প্রবাসে ঈদ আমার কাছে মূল্যহীন। কারণ ঈদের নামাজের পর প্রথম বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে সালাম করতাম। কিন্তু প্রবাসে তা সম্ভব হয়ে উঠে না। প্রবাসে ঈদ মানে নামাজ পড়ে কাজে চলে যাওয়া। আসলে বলতে গেলে প্রবাসে আমরা সবাই রোবট হয়ে যাই। আবেগ অনুভূতি কিছুই কাজ করে না। তবে মনের মধ্যে একটি চাপা কষ্ট থেকে যায়। কেউ তা প্রকাশ করে না। সবার কষ্ট বিসর্জন দিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সবার সঙ্গে হাসিমুখে ঈদ উদযাপন করে। কিন্তু পরিবার ছাড়া ঈদ করার যে চাপা কষ্ট সেটি আমরা প্রবাসীরা কখনো তা প্রকাশ করতে পারি না। আমরা প্রবাসীরা শুধু দিতে জানি, নিতে জানি না। বছরের পর বছর এই কাজটি আমরা হাসিমুখে করে যাচ্ছি। দেশ থেকে স্বজনেরা একটু হাসিমুখে কথা বললেই আমরা ভুলে যাই প্রবাসের সব কষ্ট। বলেন, ‘ইরাকে খুব বেশি বাংলাদেশি একে উপরের সাথে দেখা করতে পারেনা। ঈদের দিন কারো দেখা পাওয়া যায় না বললেই চলে। আশেপাশে থেকে কিছু প্রবাসী বন্ধু-বান্ধব আসে। তাদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার চেষ্টা করি। তখন বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। প্রথিবীতে প্রবাসের কষ্টটা একটু অন্য ধরনের। সব আছে, তবু যেন কিছুই নেই। প্রবাসী না হওয়া পর্যন্ত কেউ তাদের কষ্ট অনুভব করতে পারবে না। প্রবাসীদের কষ্টে বাড়তি মাত্রা যোগ করে ঈদ এবং বিশেষ উৎসবের দিনগুলো।
২০১২ সালে সূর্যোদয়ের ইরাক দেশে আমার প্রথম আগমন। বাবা-মা, ভাইবোনকে ছেড়ে এত দূরে, এটাই আমার প্রথম যাত্রা। সেবারের রমজান মাসের স্মৃতি আমার আজীবন মনে থাকবে। দেশে পরিবারের সবাইকে ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিনদেশে ও অচেনা পরিবেশে একাকী রমজান কেবল হৃদয় ভাঙা জলই উপহার দিয়েছিল। করোনাভাইরাসের সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই ইফতারের সময় ঘরে কাটাতে হতো। সে সময়টা যে কত কষ্টের! প্রবাসে আসার পড় থেকে রমজান মাসে বন্ধুদের সাথে করে মসজিদে সবার সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার করেছি। কী যে আনন্দের ছিল সেই সময়টা! আর এই লকডাউনের সময় একা বসে রুমে ইফতার করেছি। তখন কেন জানি কোনো খাবারই গলা দিয়ে নামতে চাইত না। এমন নিঃসঙ্গ মুহূর্ত যে এর আগে কখনোই পাইনি! ঈদকে সামনে রেখে সবাই মিলে কেনাকাটার যে ধুম, জাপানে আসার পর তাও হারিয়ে গেল!
ওই বছরের ঈদুল ফিতর, জীবনের প্রথম ব্যতিক্রম ঈদ। একমাস সিয়াম সাধনার পড় ঈদের নামাজটা পড়া হয়নি,প্রথম আনন্দহীন কষ্ট ঈদের দিন মায়ের হাতের সেমাই খাওয়া হয়নি, হয়নি বাবা আর ভাইয়ের ঈদের নামাজে পড়তে যাওয়া দেখা। বাবা-মার পাঠানো ঈদের পোশাক একলা ঘরে পরে অঝোরে কেঁদেছি। আয়োজন ছিল সবই কিন্তু পাশে ছিল না প্রিয় মুখগুলো। এমনকি পাশে ছিল না নতুন বিবাহিত জীবনে নতুন সঙ্গীটিও। তারও সেদিন ছুটি ছিল না। এভাবেই কেটেছে আমার প্রবাস জীবনের প্রথম ঈদ।
এরপর কেটে গেছে অনেকটা সময়। তারপরও জীবন থেমে থাকে না। ঈদ আসে ঈদ যায়। কাজের টানে, অর্থের টানে যারা দেশ ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি জমান কেবল তারাই জানেন দেশ কী! দেশের প্রতি ভালোবাসা কেমন। শুধু পরিবারের সুখের জন্য বছরের পর বছর তারা কাটিয়ে দেন অজানা দেশে। বাবা-মা, ভাই-বোনের সুন্দর একটা ঈদ উপহার দেওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান। ঈদের ছুটি কী তা বেশির ভাগ খেটে খাওয়া প্রবাসীরাই জানেনই না। তারপরও ঈদের দিন মুখে হাসি, হৃদয়ে কষ্ট লুকিয়ে পরিবারের সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তারা বুঝি প্রিয়জন পাশে থাকা কী, প্রিয় মাতৃভূমি কী! তাই কামনা করি যারা দেশে আছেন তারা যেন কাছের মানুষগুলোকে ভালোবেসে আঁকড়ে রাখেন। তাহলেই আমাদের দূর প্রবাসের ঈদ সার্থক হবে। সবাইকে সূর্যোদয়ের দেশের সকল প্রবাসীদের পক্ষ থেকে ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা!
ঈদ মোবারক।
লেখক : সভাপতি, ইরাক প্রবাসী কল্যাণ পরিষদ।