এই জলাগ্রাসনকে প্রাকৃতিক বন্যা বলা ঠিক হবে না

সুনামগঞ্জ জেলা শহর দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো তলিয়ে গেল। শনিবার শহরের অধিকাংশ এলাকার সড়কে পানিতে তলিয়ে গিয়েছিলো, বহু ঘর-বাড়িতে পানি উঠে। মাত্র দুই দিনের বৃষ্টিতে এমন পানিবন্দি হয়ে পড়েন শহরবাসী। দ্বিতীয়বারের মত পানিবন্দি হওয়ার ফলে মানুষের দুর্দশা চরমে উঠে। মানুষ ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো। গণমাধ্যম জেলার বন্যা পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে প্রচার করে। প্রচার প্রচারণার ধরণ দেখে এই পানিবন্দিত্বকে প্রাকৃতিক বন্যা হিসাবে মনে হতে পারে। কিন্তু আসলেই কি দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দুই দুই বার শহরের এই তলিয়ে যাওয়াকে কি প্রাকৃতিক বন্যা বলা চলে? গত কয়েক বছর ধরে প্রতি বর্ষায়ই একটু অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে শহরের নদী তীরবর্তী স্থানসহ অনেক এলাকা তলিয়ে যেতে দেখা যায়। বৃষ্টি কমলে এই পানিও কমতে শুরু করে। এবারও একই ঘটনা দেখা গেছে, মাত্রা কিছুটা বেশি এই যা। এই জলাগ্রাসনকে কিছুতেই বন্যা বলে কতিপয় অবিবেচক কর্মকাণ্ডের দায় এড়ানোর উপায় নেই। বরং বলা উচিৎ কিছু মানুষের দীর্ঘদিনের দখল, দুর্নীতি আর অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের পরিণতি ভোগ করছে শহরবাসী। প্রাকৃতিক বন্যা বলে এই সব অপরাধকে আড়াল করা হয়। বরং উচিৎ কাজ হবে শহরের এই পানিদুর্যোগের সঠিক কারণগুলোকে বেশি বেশি করে সামনে নিয়ে আসা। এতে প্রকৃত সমাধানের একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় বর্ষাকালে বৃষ্টি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিছুটা অতিবৃষ্টি হলেও অস্বাভাবিক নয়। শহরবাসী অতীতে পুরো সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে টানা বৃষ্টিপাত দেখেছেন। বিশ্বের সবচাইতে বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জির নিকটবর্তী হওয়ায় সুনামগঞ্জ অঞ্চলও বাংলাদেশের বৃষ্টিবহুল এলাকা। দুই দশক আগে এমন টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে এলাকার পর এলাকা তলিয়ে যেতে দেখা যায়নি। তখন তলায়নি এখন কেন তলিয়ে যায়? এই প্রশ্নের মধ্যেই জলাগ্রাসনের আসল কারণ লুকানো রয়েছে।
প্রকৃতি নিজে নিজেই এক ধরণের সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে নেয়। সেই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি। নদীর নাব্যতা হারিয়েছে। তাই পানি ধারণ করতে না পেরে লোকালয় ভাসিয়ে দেয়। একটি চমকপ্রদ জিনিস হলো পানির বিপদসীমা নির্ধারণ। যে সময়ে ওই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল তখন নদী ছিল অনেক গহীন। এখন পলি জমে নদীর তলদেশ ভরে উঠেছে। তাই কম পানি নিয়েই নদী বিপদসীমা অতিক্রম করে এখন। নদীতে যখন মাত্রাতিরিক্ত পানি হয়ে যায় তখন সেই পানি বিভিন্ন খাল ও নালা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হাওরে গিয়ে পতিত হত। আবার বৃষ্টির পানিও ওইসব খাল-নালাই টেনে নিয়ে যেত। এই প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাই অতীতে শহরকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখত। এখন সবগুলো খাল দখল হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শহর তলিয়ে যায় আর একেই আমরা বন্যা বলে খাল দখলের বিষয়টিকে গৌণ করে ফেলি। পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে জালের মতো সড়ক তৈরি করে। হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধগুলো সময়মতো না কাটায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এবার যাকে বন্যা বলা হচ্ছে তা মূলত নদীর নাব্যতা হ্রাস, খাল-নালা বন্ধ ও পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করার পরিনাম মাত্র।
যারা পরিবেশ প্রতিবেশ নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করেন, যারা মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করেন; সেইসব সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন জলাগ্রাসনের আসল কারণগুলোকে সামনে আনতে হবে এবং এর সমাধান বের করে আনতে হবে। নতুবা ভবিষ্যতের বিপর্যয় হবে আরও ভয়ংকর। নদী খননের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে কিন্তু কোথায় নদী খনন হচ্ছে কেউ জানে না। এ নিয়ে সোচ্চার হতে হবে। দখল হয়ে যাওয়া খালগুলোকে উদ্ধার করতে হবে। পানির স্বাভাবিক গতিকে রোধ করে দিয়েছে যে প্রতিবন্ধকগুলো সেগুলোর অপসারণ করতে হবে। তবেই আমরা মনুষ্যসৃষ্ট বন্যা বা জলাবদ্ধতার হাত থেকে রেহাই পাব। আর প্রচারমাধ্যমে জলাগ্রাসনকে প্রাকৃতিক বন্যা না বলে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ হিসাবে আখ্যায়িত করে প্রকৃত সত্য মানুষের সামনে আনতে হবে।