একাংশে হতাশা, অপরাংশ খুশি

বিশেষ প্রতিনিধি
ঢাকঢোল পিটিয়ে সুনামগঞ্জের ১০ উপজেলায় আওয়ামী লীগের সম্মেলনের কার্যক্রম শুরু হলেও তিন উপজেলায় সম্মেলন শেষেই স্থগিত হয়ে গেছে অন্য উপজেলাগুলোর সম্মেলন। এরমধ্যে ছাতক, ধর্মপাশা ও দোয়ারাবাজারের সম্মেলন আদৌ হবে কি-না এই নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ছাতক-দোয়ারায় আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রসঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বললেন, ৩২ বছর আগে সম্মেলন হয়েছিল, এরপর আর হয় নি। আমার জীবদ্দশায় আর হবে কি না জানি না। ধর্মপাশায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুইপক্ষ পরস্পরকে দোষলেন। কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন অবশ্য বলেছেন, দুয়েক দিনের মধ্যেই বলা যাবে, সুনামগঞ্জের কোন উপজেলায় কবে সম্মেলন হবে।
দলীয় একটি সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জের দিরাই আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দুইপক্ষের সংঘর্ষ এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনার কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলরা সুনামগঞ্জের উপজেলাগুলোর সম্মেলন নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। পরে সিদ্ধান্ত হয় অতিমাত্রায় কোন্দলে জড়িত উপজেলাগুলোর সম্মেলন আপাতত স্থগিত রাখা হবে। দুই পক্ষের দূরত্ব কমিয়ে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা হবে।
অতিমাত্রায় কোন্দলে জড়িত উপজেলাগুলোর মধ্যে ধর্মপাশা, ছাতক ও দোয়ারাবাজারকে বিবেচনা করা হয়েছে।
ছাতকে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ দুই বলয়ে বিভক্ত। একাংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক। তিনি ছাতক দোয়ারার বারের চার সংসদ সদস্য। অন্য গ্রুপের নেতা ছাতক পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী ও তার ভাই শামীম চৌধুরী। কালাম ছাতক পৌরসভার তিন বারের মেয়র। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত এই দুই উপজেলা ও ছাতক পৌরসভা আওয়ামী লীগ। এখানকার স্থানীয় নির্বাচন থেকে জাতীয় নির্বাচন দলের দুই বলয় পরস্পর বিরোধী অবস্থান নেবার রেওয়াজ বহুদিন ধরেই।
সম্প্রতি জেলা আওয়ামী লীগ জেলার ১০ উপজেলার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করে। এরমধ্যে প্রথম সম্মেলন হয় দিরাই উপজেলায়। ওখানে কেন্দ্রীয় নেতারা সম্মেলন মঞ্চে ওঠার পর পরই একাংশের নেতা মোশারফ মিয়ার নেতৃত্বে মিছিল সম্মেলন স্থলে প্রবেশ করে। আগে থেকে সম্মেলন স্থলে থাকা প্রদীপ রায় পক্ষের সঙ্গে এসময় তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের সময় একপক্ষ মঞ্চ লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়া শুরু করলে চেয়ার মাথায় তুলে কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল ইসলাম নাহিদ ও আহমেদ হোসেন প্রাণ রক্ষা করেন। এই ঘটনার দুই দিন পর কোন্দলে জর্জরিত উপজেলাগুলোর সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সম্মেলন স্থগিত হওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একপক্ষ ক্ষুব্ধ, অপরপক্ষ খুশি।
ছাতক দোয়ারাবাজারের সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুহিবুর রহমান মানিক বললেন, ৩২ বছর হয় ছাতক দোয়ারায় আওয়ামী লীগের সম্মেলন হচ্ছে না। এবার সম্মেলন স্থগিতের সিদ্ধান্তে হতাশ নেতা কর্মীরা। এটা কোন ভালো ম্যাসেজ নয়। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা দিয়েছেন। আমি দেশের বাইরে ছিলাম। এসে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে উপজেলায় উপজেলায় সম্মেলনে গেছি। ছাতক দোয়ারায় ১৯ ও ২০ নভেম্বর সম্মেলন ছিল। একদিন পিছিয়ে ২০ ও ২১ নভেম্বর নেওয়া হয়। সম্মেলনের সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছেন নেতা কর্মীরা। আগের দিন জানানো হলো সম্মেলন স্থগিত। সমস্ত আয়োজন শেষের পর এভাবে সম্মেলন স্থগিত করায় বিস্মিত ও হতাশ নেতা কর্মীগণ। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি ছিল।
অপর গ্রুপের নেতা শামীম চৌধুরী বললেন, ছাতক উপজেলা, পৌরসভা ও দোয়ারাবাজারে সংগঠনের বৈধ কমিটি আছে। কমিটিকে পাস কাটিয়ে সম্মেলন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। আমরা এই বিষয়ে সভানেত্রীসহ দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছি। পরে সম্মেলন স্থগিত হয়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলায় সংগঠনে গ্রুপিং সম্প্রতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওখানে উপজেলা সম্মেলনের তারিখ ছিল ২১ নভেম্বর। দলের বিবদমান দুই গ্রুপ উপজেলা সম্মেলনকে সামনে রেখে ইউনিয়ন সম্মেলন আলাদা আলাদা করতে শুরু করে। এসব সম্মেলন নিয়ে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা থাকায় বাদশাগঞ্জে ১৪৪ ধারাও জারি হয়। এই অবস্থায় ওখানকার সম্মেলনও স্থগিত করেন দলের দায়িত্বশীলরা।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপের একাংশে নেতৃত্ব দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। তিনি ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিসও তার অনুসারী।
অপর গ্রুপের নেতা সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আব্দুল হাই ও বর্তমান যুগ্ম সম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ প্রমুখ।
সম্মেলন স্থগিত হওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন শামীম আহমদ বিলকিস। বললেন, অসাংগঠনিক কার্যক্রমে লিপ্ত ধর্মপাশায় সংগঠনের কিছু নেতা। কলকাঠি নাড়েন জেলা নেতাদের কেউ কেউ। এরা উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ছাড়াই ইউনিয়ন সম্মেলন করে। ধর্মপাশায় যারা দলের গ্রুপিং করছে তারা একসময় এমপি রতনের কাধে ভর করে বালু-পাথর কোয়ারি লুট থেকে শুরু করে সকল প্রকার নিয়োগ বাণিজ্য করেছে।
শামীম আহমদ মুরাদ সম্মেলন স্থগিত হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করলেন। বললেন, ৬৭ সদস্য বিশিষ্ট উপজেলা কমিটির ১১ জন মারা গেছেন। ছয় জন বিএনপি জামায়াত থেকে অনুপ্রবেশকারী। বাকীদের মধ্যে ৩০ জন এমপি বা হাইব্রিডদের সঙ্গে কাজ করি না আমরা। ত্যাগিদের বাদ দিয়ে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড সম্মেলন করে কমিটি দেওয়া শুরু করায় কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের বিষয়টি জানাই আমরা। পরে তাদের পরামর্শেই আলাদা ইউনিয়ন সম্মেলন করে কমিটি করেছি। বিলকিসের মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ধর্মপাশার লোকজন জানেন, কার কি ছিলো, এখন কি আছে। লুটেরা কে, সেটিও সকলে জানে।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বললেন, কোন উপজেলায়ই সম্মেলন স্থগিত হবে না। আমি দলীয় সভানেত্রীর সঙ্গে এক দুই দিনের মধ্যে দেখা করে কথা বলবো। এরপর সম্মেলনের আবার তারিখ হবে। শাল্লায় পহেলা ডিসেম্বর এবং সুনামগঞ্জ সদরে দুই ডিসেম্বর, অর্থাৎ আগের নির্ধারিত তারিখেই সম্মেলন হবে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত) আহমেদ হোসেন বললেন, ছাতক, দোয়ারা ও ধর্মপাশায় বিবদমান দুই গ্রুপের দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করা হবে। আবার নেতা কর্মীদের মধ্যে ঝড় তোলা হবে। উৎসব আকারে সম্মেলন হবে। আর কোথাও মারামারি হবে না। জামালগঞ্জ-তাহিরপুরে সম্মেলনের তারিখ স্থানীয় অসুস্থ্য সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলে এবং অন্যগুলোও দুই একদিনের মধ্যে বলতে পারবো। সুনামগঞ্জ জেলা সম্মেলনের পূর্ব নির্ধারিত তারিখ ছয় ডিসেম্বর এখনো বহাল আছে। দুইদিন পর সবকিছুই চূড়ান্ত ভাবে বলা যাবে।