এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আজ বাপ নাই অবস্থায় আমিও ঘুরছি, তফাৎ তখন যুদ্ধাবস্থা ছিলো না। তার জীবন অনিশ্চয়তাভরা ছিলে না। আমি ঘুরতাম আর বাবার ছোটবেলাকে মনে করতাম। তালেব আলী চাচা আমায় তাড়াতাড়ি নিয়ে আসতেন।
গাগলী গ্রাম আমার মনে দাগ কেটে আছে, এজন্য যে জুন থেকে ডিসেম্বর প্রায় ছয় মাস একনাগারে আমরা এই গ্রামে থাকি। গ্রামের লোকের সরলতা, ভালবাসা, গ্রাম্য পলিটিক্স, নিজেদের মাঝে বৈরীতা সব আমি ঐখানে দেখি। একই বাড়ীতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানসিকতা আর বিপক্ষের মানসিকতার লোক দেখি। পূর্বেই বলেছি আমাদের এই অবস্থানকে সবাই সমান চোখে দেখে নাই। কারণ, আমার দাদী বাবার বাড়ী থেকে ফরাযেজ আনেন নাই। আমাদেও বাপ চাচারা এটা চিন্তাও করেন নাই। কিন্তু কারও কারও মনে যুদ্ধ শেষ হবে না আর যেহেতু আমরা জায়গা নিয়ে নিয়েছি, বাপও নাই, আমরা এটা দাবি করবো আর সবার অংশ থেকেই জমি বের করে দিতে হবে। কি অদ্ভুত চিন্তা! তারা এ কারনে হারুন মামুজীকে দোষারুপ করে।
হারুন মামুজী আমার দেখা এক অদ্ভুত মানুষ। সব সময় টিপটপ থাকেন। কারন তিনি তালুকদারের ছেলে। দামী লুঙ্গী পড়েন। সব সময় সার্ট বা পান্জাবী পড়েন। গোলাপী হলুদ রং। শুধু থুতনীতে একটুখানি দাড়ি। হাতে সব সময় ঘড়ি। দেখলেই বুঝা যায় একজন সম্ভ্রান্ত মানুষ। তাকে আমরা প্রায়ই আমাদেও বাসায় দেখেছি। আব্বা পরিচয় করিয়ে দিতেন আমাদের চাচা হিসাবে। কিন্তু দাদা মামা ডাকায় আমরা তাকে মামুজীই ডাকতাম। উনার কোন ছেলেমেয়ে নাই। সব সময় আশায় থাকেন এই বুঝি উনার উয়াইফের বাচ্চা হবে আর এ জন্যে ওয়াইফের খুব যতœ নেন। এতো সরল মানুষ বিরল। হাসলে মনে হয় একজন শিশু হাসতেছে। আর খ্যাপালে উনি এতো খ্যাপে যান যে সামলানো দুষ্কর। উনি উনার বাবার একমাত্র পুত্র সন্তান। একজন বোন ছিলেন উনি দাদা মানে গোলাম রব্বানীর মা। যিনি দুটি পুত্র সন্তান রেখে ১৯৪৭ সালেই ইন্তেকাল করেছেন। হারুন মামুর মা নাকি অপরূপ সুন্দরী ছিলেন উনার বাবা তাদেও দু’ভাই বোনকে রেখে মারা গেলে ইনার মা কে তার চাচার কাছে বিয়ে দিয়ে বাড়ীতেই রাখা হয়। সেই চাচার ঔরষে মায়ের গর্ভে আরও কয়েকজন ভাই বোন তার আছে। তিনি তার পিতার সম্পত্তির একমাত্র ওয়রিশান। আর বোন মারা যাওয়ায় দুই ভাগ্নে ওয়ারিশান। কাজেই উনি এই বাড়ীতে সবচেয়ে বেশী সম্পত্তির মালিক। কিন্তু তার চাচাতো ভাইয়েরা তার সন্তানাদি না থাকার দরুন বড়ই জ্বালাতন করে। তার জমির ধানটা কেটে নিয়ে, বাতার জমি জোর করে চাষ করে ফেলে, এ ধরনের নানান সমস্যায় উনাকে জর্জরিত রাখে। তিনি চিল্লাচিল্লি করেন, আবার দেখা যায় তাদের সমস্যার সময় ডেকে নিজেই দিয়ে দেন। গাগলী গ্রামে তিনিই আমাদেও আশ্রয়দাতা। এরজন্যে অন্য শরিকেরা তাকে নানা ধরনের দোষারুপ করে। তিনি আমাদের বুঝতে দিতে চান না। আমরা ফরায়েজের অধিকারী না হলে হয়তো অন্যরাও একটু মনখোলা হতে পারতেন। হারুন মামুজীর জীবনের সবচেয়ে বড় অহংকার তার ভাগ্নে গোলাম রব্বানী। এটা তিনি কতভাবে বলতে যে সুখ পান সে বলার মতো নয়। কেউ একটিুখানি মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে বল্লে তিনি উঠানে দাঁড়িয়ে তাকে এমন করে বকেন যে আশেপাশের লোক জমে যায়। যেহেতু তার জানের টুকরা ভাগ্না মুক্তিযুদ্ধে গেছে সেহেতু কোন মুক্তিযোদ্ধা খারাপ বা যুদ্ধে যাওয়া ঠিক হয় নাই এ ধরনের মন্তব্য তার সামনে করা যাবে না। পাক আর্মি জিতে যাবে এ ধরনের আলোচনা করলেও তিনি চিৎকার করে উঠানে দাঁড়িয়ে ঐ লোকের বাপ দাদা চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে লেগে যান। বড়রা এই কাজটি না করে শিশুদের লেলিয়ে দিতো তাকে খ্যাপানোর জন্যে। কেুউ হয়তো তার পিছনে বল্লো, গনিগঞ্জের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের যে মাইর দিছে পাকিস্তানীরা। তিনি তাকে দাঁড়িয়ে বাড়ী পর্যন্ত নিয়ে যেতেন বকতে বকতে। তারপর তার বাপ মাকে ডেকে বকা শুরু করতেন। মুক্তিযোদ্ধারা জানতেও পারলো না তাদের জন্য উনি কত মারামারিতে জড়িয়ে গেছেন। আম্মা বড়দের এই উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে উনাকে ডেকে এভাবে ঝগড়া না করে বাচ্চাদের বড়রা শিখিয়ে উনাকে খ্যাপায় তা জানান। আর এসব কথায় কান না দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি হাউমাউ করে কান্না শুর করে বলেন, এই মুক্তিযোদ্ধারা সবাই যে আমার রব্বানীর সাথে আছে। এদের মারার কথা বল্লে আমি ঠিক থাকতে পারি না। অন্যরা উনার রাগের পর উনার পক্ষে আর মুক্তিযোদ্ধাদের দু’চারটা কথা বলে উনার কাছ থেকে কিছু খসিয়ে নিয়ে চলে যায়। কেউ কেউ ইচ্ছে করে এসে বলে ”রাঙা ভাই জামলাবাজের ওখানে মুক্তিযোদ্ধারা আর্মি আর রাজাকারদের সাথে এমন যুদ্ধ করেছে যে মেরে শেষ করে দিছে, উনি এমন স্বর্গীয় হাসি দিতেন মনে হতো এখনই দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে।
এরপরই কিছু টাকা চেয়ে বসলো, এই সময় তা দিতে তিনি কর্পন্য করতেন না। আমরা ওনার অভিভাবকত্বে নিশ্চিন্ত ছিলাম। অনেকের অনেক কথা আমাদের কানে ঢুকাতাম না। এ রকম মুক্তিযোদ্ধা পাগল মানুষ বাংলার প্রতিটা গ্রামে ছিলো বলে নয় মাসে এই কঠিন যুদ্ধ দামাল ছেলেরা জিততে পেরেছে।
বাড়ী থেকেই আমাদের চাল ডাল আসে। গুড়া চাচা মাঝে মাঝে আসেন। একবার কিছু কাপড় নিয়ে আসেন। কারন আমরা বাসা থেকে যে কাপড় নিয়ে বেরিয়েছিলাম তা নগন্য। এতো দিন চলার মতো নয়। আপা এখন শাড়ীই ধরেছে। এক্কেবারে গ্রামের মেয়েদের শাড়ী। তা পড়ে সে কলসী কাখে পানি আনে। আমি রান্নায় সাহায্য করি, আর সুরমা নদীতে হচু দিয়ে মাছ মারি। নদীর যে অংশে পানি কম ঠাঁই হয় সেখানে। অনেক ইচা, পুঁটি, চান্দা মাছ ধরা পড়ে। একটু তেল দিয়ে ভেজে খেতে দারুন। মাছের সমস্যা থাকে না। এ ছাড়াও সোনা চাচার ছেলে নবাব ভাইয়ের মাছের রাশি। উনি শুধু উনার মাকে বলেন- “মাই মসলা বাট আমি মাছ মারতে গেলাম” এক দুই ঘন্টার মাঝে অনেক ধরনের তাজা মাছ নিয়ে হাজির হন। মাঝে মাঝে আমাদেরও দেন। উনার মন খুব উদার। উনি প্রথমে আমাদের ঘরে উঠে মাছ দিয়ে চলে যেতেন। গাগলী গ্রামেই প্রথম মাছ কাটা শিখি। প্রথম প্রথম মশকুল বুই সাহায্য করতো এখন নিজেরাই পারি। কিন্তু তেল নুন পাওয়া বড় কঠিন। অনেক দিন তেল ছাড়াই মাখিয়ে সেই মাছ খেয়ে নিয়েছি। যে দিন নবাব ভাই ”আলোয়ারা” মারতে যেতেন ওরে বাবা রে! কত মাছ যে আনতেন! তিন চারশ বড় বড় কৈ মাছ! আমাদেরও দিতেন, হারুন মামুকেও দিতেন। বাড়ীতে প্রায় সব ঘরে বিলি করতেন। এই আলোয়ারা থেকে তিনি মাঝে মাঝে নুতন নুতন মানুষ নিয়ে আসতেন। আমাদের ঘরে এদের খাওয়ার আয়োজন করতেন পরে নৌকা করে পৌঁছে দিতেন। আমরা বুঝতাম এরা মুক্তিযোদ্ধা। কেউ কোন কথা বলতাম না হারুন মামুজী আম্মা আর নবাব ভাই। আর অমরা যারা রান্নায় আছি। উনার বাবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। কিন্তু পাশের ঘরের চাচা জানলে খবর আছে। নবাব ভাই মাঝ রাতে মাথায় গামছা বেঁধে এদের নিয়ে যখন আসতেন, তখনই বুঝতে পারতাম। একটু তুতলিয়ে কথা বলতেন। আম্মাকে বলতেন-“চাচী এতো রাতের মেহমান মাইয়েরা রাগ করবা এখানে খাওনের ব্যবস্থা করি।” আম্মা সায় দিতেন। এতো রাতে উঠে উনারই মারা মাছ রান্না করতাম আপা আর আমি। তিনি নিজেদেও ঘর থেকে চুরি করে পিষা মসলা নিয়ে আসতেন। আমরা যাই পারি রান্না করতাম যারা আসতো তারাও চাদরে মুখ ঢাকা। খেয়ে নবাব ভাইর সাথে চলে যেতো। গভীর রাতে নবাব ভাই ফিরে এসে আমাদের ঘরে টোকা দিতো। আম্মা উঠে শুধু জিজ্ঞেস করতেন জায়গা মতো পৌছে দিতে পারছো তো সে বলতো হু। আর কোন কথা হতো না। আমি আর আপা যা বুঝার বুঝে যেতাম। কিন্তু টুঁ শব্দও করতাম না। কারন খবর পাচ্ছি এই বাড়ীর অনেকে গিয়ে ছত্তার মিয়া সাবের বশ্যতা স্বীকার করে এসেছে। নবাব ভাই নীরবে নিভৃতে এই কাজ করতো বাড়ীর কেউ বুঝতেই পারেনি।
ছত্তার মিয়া ত্রাস
গাগলী গ্রাম উজানীগাঁওয়ের সন্নিকটে। প্রায় প্রতিদিন উজানীগাঁওয়ের খবর গাগলীতে আসে। গয়া দাস আর তার ভাইকে হত্যার মাধ্যমে এলাকায় ছত্তার মিয়া এক ত্রাসের নাম হিসাবে উঠে আসে। আজ এর বাড়ী লুট করছে তো কাল অন্যেও বাড়ী। একপাল রাজাকার তার অধীনে। গ্রামের মানুষ সবাই তাকে এখন সাব ডাকে। তার বাড়ীকে সাব বাড়ী। তার ভাই বেরাদ্দর সবাইকে দেখলে মানুষ ভয়ে তটস্থ থাকে। প্রত্যেকটা গ্রাম থেকে নাকি সে গনিমতের মাল উদ্ধাওে লোক পাঠায়। বিশেষ কওে হিন্দু বাড়ীগুলি তার বাহিনীর টার্গেট। আর যে সব বাড়ীর জোয়ান ছেলের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তাদেও বাপদের তলব করা হয়। এরমাঝে খবর পেলাম গনিমতের মাল হিসাবে সে আমাদের বাসা দখল করে নিয়েছে। তার দুই বৌ। বড় বৌ গ্রামেরই মেয়ে। ছোট বৌ। পাটনী বাড়ীর বৌছিলো। সংগ্রামের বহু আগেই তাকে সে নিয়া এসেছিলো। তাই তাকে বড় রাস বাই পাটনী বেটি ডাকেন। ছোটরা পাটনী ভাবী। তার ঘরে ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেছে। কিন্তু আসার পর থেকে সে মুসলমানের ঘরে ভাত খেতে নাকি তার কেরাইত করে তাই বিশ/পঁচিশ বৎসর যাবৎ সে শুধু দুধ মুড়ি ফল ফলাদি খেয়ে বেঁচে আছে।(চলবে)