এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বৃত্তিপ্রাপ্তি ও টাকা উত্তোলনের জন্য সুনামগঞ্জ আগমন
ছত্তার মিয়ার সাথে সাক্ষাতের পূর্বেই গাগলী গ্রামে আমাদের দেখার জন্য বড় ভাই মানে আম্মার বড় ফুফা আজির উদ্দীন নাজির সাহেব আমাদের দেখতে এসেছিলেন। উনি অনেক খবর নিয়ে এসেছিলেন। যেমন নানা ভাইরা ইন্ডিয়ায় ভালো আছেন। সুনামগঞ্জের মতিন মিয়ার ভাই শুকুর মিয়ার বাড়ীতে ঘর তুলে আছেন শরণার্থী শিবিরে যেতে হয় নাই। সেখানে আমাদের সব আত্মীয় স্বজনরা আছেন। আব্দুল হাই নানা, তারা নানা ভাই, সালেহদের ফ্যামেলী, রইছ চাচা, মতিন মিয়া, ডাক্তার নানার ফ্যামেলী সবাই এক সাথে মিলেমিশে মুক্তিযুদ্ধের কাজ চালাচ্ছেন। ডাক্তার নানা একটা হাসপাতাল খুলেছেন। দাদা, মতিউর মামা, মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছেন ওখানে তাদের সাথে দেখা হয়। তিনি মুক্তিখলার ডাক্তার নানার বাড়ী গিয়ে এসব খবর যোগাড় করে এসেছেন। মতিউর মামা উনার জান ছিলেন। উনাকে তিনি আমার বাপ ডাকতেন। তার বাপের কথা বলে এই বৃদ্ধ হাউমাউ করে কান্না শুরু করেন। তার কান্নার রেশ আমাদের মাঝেও ছড়ায়। এই সব খবরের পাশে আমার জন্য তিনি একটা সুখবর দেন। আমি ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছি খবরটা আমার জন্য সুখবরের চাইতে কষ্টের বেশী ছিলো। কারণ আমার বাবা আমার এই বৃত্তি নিয়ে খুব স্বপ্ন দেখতেন। তিনি আসাম সরকারের বৃত্তি পেয়েছিলেন। বড় শখ ছিলো তার মেয়েরা বৃত্তি পাবে। আপার মাথা ভালো। কিন্তু পড়ার টেবিলে বসার ধৈর্য্য তার ছিলো না। এ জন্য তিনি আপাকে খ্যাপানোর জন্য আম্মাকে বলতেন তোমার মেয়ে। আপা খ্যাপতো আর রাগ করে নানা ভাইর কাছে চলে যেতো। সে নানা ভাইর কাছে বেশী আরাম পেতো। কোন পড়ার চাপ নেই। পাশের বাসার প্রতিমা মাসীদের সঙ্গে দিদি মা দাদা বাবুর সঙ্গে তার খুব ভাব। এদিকে নানা ভাইর স্তুতি বাক্য শুনে আরাম সে আহ্লাদে দিন চালাতো। মাঝে মাঝে আব্বা গিয়ে নিয়ে আসতে চাইলে সে বড় অখুশী হয়ে বাসায় আসতো। কারণ বাসায় আব্বা পড়ার জন্য বলতেন। মাথা ভালোর জন্য সে বৃত্তি দেয়ার চান্স পেয়েছিলো কিন্তু পড়াশুনার যে ধরন ছিলো তা দেখে আব্বা আম্মাকে লক্ষ্য করে বলতেন , “তোমার মেয়ের বৃত্তির টাকা আনার জন্য তুমি বস্তা নিয়ে যেও। আমার মেয়ের বৃত্তির টাকা আনার জন্য আমি বস্তা নিয়ে যাবো। কার বস্তা ভরে দেখা যাবে।” কিন্তু আপার কোন হেল দুল হতো না। আমি পড়ায় মনোযোগী ছিলাম। রাতে আব্বার পা টিপে দিতাম এ জন্য তিনি প্রায় আমাকে আমার মেয়ে বলতেন। কিছুটা আপাকে রাগিয়ে দেয়ার জন্য। আপা ও এর উত্তর দিতো। বিকালে নানা ভাই আসলেই আম্মা আব্বার উপর একরাশ অভিযোগ তুলে কাপড় চোপড় নিয়ে চলে যেতো। নানাভাই তখন আমি কত কালো আপা কত ফর্সা আমার পড়া লাগবে উনার রাঙা নাতিনের পড়ার দরকার নাই এসব মনভূলানো কথা বলে আনন্দের সঙ্গে প্রিয় নাতনী নিয়ে চলে যেতেন। আপার এই রাগ ভাঙ্গিয়ে বাসায় আনতে আব্বার বেশ বেগ পেতে হতো। সেই সব মধুর ভালবাসার দিনগুলো মনে করে আমি চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। সবাই আরেক দফা কান্নার সুযোগ পায়। আমার বৃত্তির টাকা আনার জন্য বস্তা হাতে আমার বাবাকে যেতে হয় নাই কঠিন মুক্তিযুদ্ধ তাকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় দিয়েছে। তিনি এই খবরটাই জানতে পারলেন না।
বড় ভাই আরেকটি বড় কাজ নিয়ে এসেছেন, তা হলো এতো দিন যাবৎ আম্মা বিধবার শাড়ী পড়েন নাই। সাদা শাড়ী ছিলো না বলে। এজন্য নাকি আম্মার বড় ফুফুর চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আম্মার এবং উনার নাকি অনেক গুনাহ হয়ে যাচ্ছে। তিনি কুসংস্কার বিশ্বাস করতেন। এটা যে হিন্দু বিধবাদের রীতি তা তিনি বুঝতে চাইতেন না। ঐ সময়ের অনেকেই এই রীতি আকড়ে ধরেছিলেন। তিনি আম্মার জন্য ছয়টা ধবধবে সাদা শাড়ী ছোট্ট নীল পাড় শাড়ী পাঠিয়েছেন। এই গ্রামের মহিলারাও আম্মার রঙিন শাড়ী পড়া নিয়ে কটু বাক্য করেছে। আম্মার আর কোন শাড়ী ছিলো না বলে তিনি যে দু’চার খানা শাড়ী এনেছিলেন তাই পড়তেন। উজানীগাঁওয়ে এ বিষয়ে কোন কথা কেউ বলেনি। এই শাড়ী আসার পড় কয়েক জন চাচী মিলে আম্মাকে বিধবার শাড়ী পড়াতে এগিয়েআসেন। সে যে কি কষ্টের দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সাদা ধবধবে শাড়ীতে আমার ৩২ বৎসরের মাকে মূর্তির মতো লাগছিলো কোন গয়না নেই। এমনিতেও আম্মা আসার সময় গয়না আনতে পারেননি। সংগ্রাম লাগার পূর্ব ক্ষনে হর বিলাস স্যাকরার কাছে সব কিছু সারাই আর রং করতে দিয়েছিলেন। এজন্য হাতে কাঁচের চুড়ি ছিলো। কানে এক জোড়া দুল। তাও খুলে ফেলা হয়। আম্মার এই মূর্তি দেখে আবেদীন সহ্য করতে পারে না। খুলে ফেলো খুলে, ফেলো বলেছি বলে কান্না জুড়ে দেয়। কিন্তু তার চিৎকার কারও কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না। একটা সওয়াবের কাজ করতে পেরে আগত চাচীরা খুশী। আমাদের অবস্থা বর্ণনাতীত। আর আমার এই সুন্দর মাকে সাজতে দেখবো না। আম্মার সুন্দর করে সেজে আব্বার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি চোখে ভাসে। একটুখানি কাজল দিলে আমার মায়ের বড় বড় চোখ কি মায়াবী হতো তা মনে পড়ে। আর কি কখনও আম্মা ওভাবে সাজবেন! এই গুরু দায়িত্ব পালন করে বড় ভাইও হাউমাউ করে কাঁদেন। তিনি যে আম্মাকে বড় ভালবাসেন। বলতে গেলে কোলে পিঠে করে বড় করেছেন। ’আমার মা’- ছাড়া কিছু ডাকতেন না এজন্য আমরা তাকে বড় ভাই ডাকি। মুক্তিযুদ্ধের বাকী দিনগুলো আম্মা এই শাড়ী পড়েই কাটিয়ে দেন। ১৯৭২ সালে বড় মামার সনে দেখা হলে তিনি আম্মার এই রূপ দেখে ভীষণ কষ্ট পান। তার বড় ফুফুকে চ্যালেঞ্জ করেন মুসলমানের মাঝে এই ধর্মীয় বিধান কোথায় লিখা আছে জানতে চান? আর রাগারাগি করেন। তার বিয়ের সময় হালকা প্রিন্টের কয়টা শাড়ী এনে আম্মাকে পড়তে বলেন না হলে তিনি বিয়ে করতে যাবেন না বলে থ্রেট দেন। উনার জোরাজুরিতে আম্মা আবার হালকা প্রিন্টের শাড়ী পড়েন। আমরা খুব খুশী হই। সবচেয়ে খুশী হয় আবেদীন। সে বার বার বলতে থাকে “এখন আমি তো মায় চিনতে পারছি আম্মা! এতো দিন তোমায় আমি চিনতাম না। ”আবেগ ঘন পরিবেশে এই বিষয়ের সমাপ্তি হয়। কিন্তু না এজন্য সুনামগঞ্জের কিছু রমনী কূলের অনেক কটু কথা আম্মাকে হজম করতে হয়েছে।
অন্য কথায় চলে গেছিলাম। মূল বিষয়ে ফিরে আসি। বৃত্তি পাওয়ার খবরে কষ্টের অনুভুতির সাথে খুশীও হয়েছিলাম। স্বস্তিও পেয়েছিলাম। সবচেয়ে স্বস্তি পেয়েছিলেন আম্মা। কারণ বড় ভাই বলে গেছেন স্কুল খুলে গেছে। আমি গেলে ছয় মাসের টাকা এক সাথে পাবো। আম্মার কাছে তখন টাকা নাই। নানা ভাই যে টাকা দিয়ে গেছেন তার থেকে পাঁচশত টাকা তিনি খরচ করেছেন মশারী, বিছানার চাদও টুকটাক জিনিস কিনতে। আর তেল, নুন মরিচ কিনতে। তিনি বাকী টাকা যক্ষের ধনের মতো আগলে আছেন। দেশ স্বাধীন হলে বাসায় গিয়ে চলার ব্যবস্থা করতে। ঐ টাকা ছুঁতেও দিবেন না। তিনি খুব আত্মসম্মান সম্পন্ন মহিলা। এতো বিপদের মাঝেও জীবনেও কারো কাছে টাকা চান নাই। চাচারা চাল ডাল যা দিয়ে গেছেন নিয়েছেন। কিন্তু নিজে যেচে কিছু চান নাই। একবারে বাজার সদাই করার টাকা নাই। তবুও টাকায় তিনি হাত দেবেন না। তিনি স্বপ্ন দেখেন আবার আমরা নিজেদের বাসায় যাবো। তখন চলার ব্যবস্থা এই দিয়েই করতে হবে। করেছিলেনও তাই। যাই হউক তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আমাকে সুনামগঞ্জে বৃত্তির টাকা তুলতে পাঠাবেন। সুনামগঞ্জের অবস্থা জানার চেষ্টা করেন কারা কারা এসেছে। আমি গেলে কোথায় থাকবো ইত্যাদি। গাগলীর হেকিম ভাই কলেজে পড়ে, সে আবার কলেজে যাওয়া শুরু করেছে। এই অবস্থার মাঝে কলেজে যাওয়াতে তাকে আম্মা সন্দেহের চোখে দেখেন। তথাপি তার কাছ থেকেই খবর সংগ্রহ করেন। তিনিও আগে আম্মাকে যে ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন কলেজে যাওয়ার পর তেমন করেন না। আড়ালে আবডালে আম্মার মহাসমারোহে সবাইকে নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনা নিয়ে টিকা টিপ্পনী কাটেন। এমনকিএকদিনসরাসরিবলেছেন, ”আপনাকে না হয় ছত্তার মিয়া পারমিশন দিয়েছে শুনার, আপনি একা শুনেন। সবাইকে নিয়ে এভাবে শুনা ঠিক না।”
আম্মার উত্তর ”পরের বাড়ী থাকি বাবা বাড়ীর মানুষ আসলে বের করেতো দিতে পারি না। তাদের আসতে নিষেধ করে দাও।” তিনি নাখোশ হলেও কিছু বলেন না। কারণ স্কুলে থাকতে তিনি প্রায়ই আমার বাবা মায়ের স্নেহসিক্ত ছিলেন। উনার কাছ থেকেই খবর পান, জালালাবাদ হোটেলের মালিকেরা ফ্যামেলীসহ সুনামগঞ্জে আছেন। আম্মার সাহস হয় আমাকে পাঠানোর কারণ খালাম্মা অর্থাৎ বাবলুর আম্মার কাছে পৌঁছাতে পারলে আমার কোন সমস্যা হবে না। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।
কিন্তু যাবো কেমন করে? এ সময় বাপের বাড়ী শিমুলবাঁক থেকে আমার ছোট চাচী বাড়ী আসেন তার সব ছোট মেয়ে হামিদাকে নিয়ে। তার মাথায় বড় ফোড়া হয়ে বনাজি ঔষধে পচে গলে মাথা থেকে এক ধরনের পোকা বের হচ্ছে তার চিকিৎসার জন্য। কোন গ্রামেই এর কোন চিকিৎসা নেই। তাকে সুনামগঞ্জ পাঠাতে হবে। আম্মা গাগলী থেকে বাড়ী এসে একে সুনামগঞ্জ নেয়ার ব্যবস্থা করেন। তার মামা একজন আর আমাদের ক্লাস টেনে পড়ুয়া ফজলু ভাই। সঙ্গে আমাকে চলে যেতে বলেন। স্কুলে গিয়ে টাকা তুলে চলে আসতে। একটা চটের ব্যাগে দুটো জামা দুটো প্যান্ট নিয়ে আমি রওয়ানা হই। সে এক ভয়ংকর জার্নি! গারা জীবন এই জার্নি আমাকে তাড়া করে। এখনও আমার গা গুলোয়।
জয়কলস থেকে ছোট চাচীর ভাই আর ফজলু ভাই লঞ্চে উঠে আমাকে আর মাথায় পচন ধরা হামিদাকে নিয়ে। তার বয়স মনে হয় এক। লঞ্চ ঘাটে ছোট চাচা আমাদের তুলেদেন। প্রথমে হামিদা তার মামুর কোলে ছিলো। লঞ্চ ছেড়ে দেয়ার পর এই হামদিাকে একটু ধরো বলে, আমার কোলে দিয়ে বাইরে চলে যায়। আর দেখা নেই। সে যে কি ভয়াবহ অবস্থা বর্ননাতীত। ওর মাথা থেকে কালো সাদা বিভিন্ন ধরনের পোকা বেরুচ্ছে। রোগীর কান্না করার শক্তিও নেই। পুঁজে, রক্তে পোকায় ছয়লাব ওর মাথা থেকে ঘাড় পর্যন্ত। আর আমার প্রচন্ড বমি আসতেছে ভয়ে চেপে রাখছি আর ‘ও মামা! ও ভাইসাব’ ডাকতেছি। কিন্তু কে শুনে আমার চিৎকার তারা তখন হাওয়া খাচ্ছে বাইরে। এর মাঝে কিছু দূর গেলেই আর্মিরা লঞ্চ ভিড়াচ্ছে। অনেকে ভয়ে তটস্থ। আমার এই ডাকাডাকি অনেকেই মানতে পারছে না চুপ থাকতে বলছে। এই রোগী নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আমার নেই। পাশে যারা বসাছিলো নাক সিটকে তারা চলে গেছে হাঁটাহাঁটি করছে। আমার সুযোগ নেই। কত দীর্ঘ পথ আমি জানি না। শেষের দিকে আমারও সেন্স ছিলো কিনা আমি বলতে পারবো না। এক সময় দুপুরের দিকে সুনামগঞ্জ লঞ্চ ঘাটে থামে। যেনো অনন্তকাল পর এক বিভীষিকা থেকে আমার মুক্তি মিলে। মামু আর ভাই এসে নামার জন্য রোগীকে কোলে নেন। রুমাল দিয়ে নাক ঢেকে। অথচ এই রোগীকে আমার কোলে এই কয় ঘন্টা নিশ্চিন্তে দিয়ে বাইরে বাতাস খেয়েছেন। আমি কিছুই বলি না। কারণ নেমে কি অবস্থায় পড়বো তার জন্য তটস্থ আছি। শুধু ফজলু ভাই কে বলেছিলাম তোমরা মানুষ না। আমাদের গন্তব্য হয় বিহারী ডাক্তারের চেম্বার। লঞ্চ ঘাট থেকে নেমে একটু আগালেই নদীর পাড়েই উনার চেম্বার ছিলো। বিহারী ডাক্তার সুনামগঞ্জের সবার পরিচিত প্রিয়মুখ। সারাজীবন সুনামগঞ্জের মানুষকে হাসি মুখে সেবা দিয়ে গেছেন। তিনি আমাকে চিনেন। আমাদের বাসায় আব্বার চিকিৎসার জন্য বা অন্য কারণে প্রায়ই যাতায়াত ছিলো। দুপুর দেড়টার দিকে তিনি উঠে চলে যাচ্ছিলেন। এ সময় গিয়ে আমরা উপস্থিত হই। এখন রোগী দেখবেন না বলে তার কম্পাউন্ডার আমাদের বিদায় করেই দিচ্ছিলো, আমি গিয়ে সামনে দাঁড়াই। তিনি আমাকে নাতিন ডাকতেন। আমাকে দেখে তিনি চমকে যান। আম্মার নাম ধরে বলেন, শান্তির মেয়ে না ? এই বুড়োর স্মরণ শক্তি দেখে আমি অবাক হই। তিনি আম্মাসহ আমাদের খোঁজ খবর নেন। আমাকে পাশে বসিয়ে নাস্তা আনান। আমার খাওয়ার মতো অবস্থা নাই। হামিদার মাথার কিলিবিলি পোকা যেনো আমার শরীরে হাঁটছে। আমার তাই মনে হচ্ছে। আমি বসে থাকি তিনি রোগী দেখেন। আর অবাকহ ন। এ অবস্থা কারও হতে পারে বোধহয় তার জানা নাই। বারবার শুধ বলতে থাকেন মাথা থেকে পোকা বেরুচ্ছে! তবুও তিনি তার যন্ত্রপাতি দিয়ে মাথার পুরো বরনটা কেটে ফেলেন। হামিদা চিৎকার করতে থাকে কিন্তু সেই শক্তিও তার নাই। মাথার ভিতরে গর্ত মতো স্থানে গজ ঢুকিয়ে কি করেন আল্লাহ মাবুদ জানেন। এরপর ঔষধ লিখে দিয়ে আর কিছু করার নেই জানান। তিনটার ফিরতি লঞ্চে এরা চলে যাবে। এখন এই রোগী কোলে নিয়ে যাওয়া কঠিন কাজ না। কারণ সারা মাথায় ব্যান্ডিজ বাধা। বের হয়েই আমাকে নিয়ে ফজলু ভাইর জালালাবাদ হোটেলের দিকে রিক্সা নিয়ে রওয়ানা হন । মামু হামিদাকে নিয়ে লঞ্চ ঘাটে।
জালালাবাদ হোটেলের সামনেই বসাছিলেন খালু সাব অর্থাৎ বাবলুর আব্বা। আমাকে দেখে তিনি অবাক আর আবেগাপ্লুত। আমি উনাকে বলি আমি দু/তিনদিন তাদের বাসায় থাকবো আম্মা পাঠিয়েছেন, আর বলেদিছেন খালাম্মার কাছে থাকতে। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে হোটেলের পিছনে বাসায় নিয়ে যান। ফজলু ভাই ওখান থেকেই বিদায় নেয়। তার লঞ্চ ধরতে হবে। খালাম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখেন কতক্ষণ। গোসল করিয়ে খেতে দেন। কিন্তু দুই তিনদিন খেতে গেলেই আমার সেই পোকা চোখে ভাসতো! বলতে পারতাম না কাউকে কি কঠিন জার্নি করে আমি এসেছি। বাবলু টিপু ভাইরে বা সবাইকে দেখে আমার শান্তি লাগে। এরা আমার খেলার সাথী। খালাম্মার কাছে কখনও আমার জড়তাছিলো না।
পরদিনই সতীশ চন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ে যাই। নুতন ভর্তি হয়েছিলাম স্কুলে, বেশী ক্লাস করতে পারনি। যুদ্ধ লেগে গেছে। হেডমিস্ট্রেস মাহতুবুন্নেছা আপা। স্কুলে করিমুন্নেছা আপা লুৎফা আপাও আছেন। তারা সবাই আমাক দেখে আদর করেন। অনেক প্রশ্ন করেন। আব্বার মৃত্যু সংক্রান্ত আম্মা সংক্রান্ত আমি উত্তর দিই। আর বৃত্তির টাকাটা আমার জরুরী দরকার তা জানাই। তারা খুব দ্রুত ব্যবস্থা করেন । ক্লাসে লুৎফা আপা আমাকে নিজে নিয়ে যান। আমার প্রিয় বান্ধবীরা কেউ স্কুলে নাই। ডালিয়া, জাহিদা, বুলি এই কয়েক জনকে পাই। তারাও আমাকে দেখে চমৎকৃত হয়। অনেক খবর দেয়। মনে হয় সব ঠিক আছে। কিন্তু আমি বুঝি সুর কেটে গেছে। কিছুই ঠিক নাই। অর্ধেকের কম ছাত্রী স্কুলে। টিচাররা তিনদিনের মধ্যেই দুইশত পঁচাত্তর টাকা আমার হাতে তুলে দেন। এবার আমার যাবার পালা।
সুনামগঞ্জ শহরটা বদলে গেছে। মনে হয় কেউ নাই। আমি আম্মাদের বড় পাড়ার বাড়ী যাই। সেখানে মতিউর মামার বাবা মা শুধু আছেন। আনোয়ার রাজা থাকায় নানা ভাইর মূল বাড়ী কেউ রেইড করে নাই। সারা বাজার খালি বেশীর ভাগ দোকানই বন্ধ। সবাই যেনো পুতুলের মতো চলছে। বাবলুদের বাসার সামনেই গৌরারংয়ের বাচ্চুদাদের বাসা দখল করেছে শ্যামারচরের খালিক মিয়া। আমার সেখানে যেতে ইচ্ছে করে না। মনে সুপ্ত অভিমান আমার বাবা যাকে মুক্তিযুদ্ধে নেয়ার জন্য গেছিলেন তিনি নাকি এখন শান্তি কমিটি হয়েছেন। হেলেন নানার কাছে শুনেছি এ পথ নেয়া ছাড়া নাকি তার গতি ছিলো না। তার এই এক্সকিউজ আমার পছন্দ হয় নাই। তাই সরওয়ার নানাদের বাসায় একবার গিয়ে আমি আর যাই নাই। আর কারও সঙ্গে দেখা করার মনই আমার ছিলো না। শুধু নিজ বাসা দেখার অদম্য ইচ্ছা আমি দমন করতে পারি নাই। আর তার খেসারতও আমাকে দিতে হয়েছে। ছত্তার মিয়ার সেই বেড়াতে যাওয়ার দাওয়াত আমার মনে পড়ে, আর তার উপর বিশ্বাস রেখেই স্কুল ধেকে এসে খালাম্মাকে বলে নিজ বাসায় গুটিগুটি পায়ে গিয়ে হাজির হই।
রাস্তা পার হয়ে বাসার সামনে যেতেই আমাকে অভ্যর্থনা করে আমাদের প্রিয় বেড়ালটা। এতদিন এটাকে মন করে বেঁচে থাকলো আল্লাহমালুম। বাংলা ঘরের কোনে বসাছিলো সে । আমাকে দেখে লাফ মেরে পায়ের কাছে এসে পড়ে। যেনো জোর করে কোলে উঠবে। এই বিড়াল আমাদের পায়ের কাছে ঘুমাতো। আমি পরম মমতায় তাকে কোলে তুলে নিই। আর আমার অবোধ কান্না আর বাঁধ মানে না। বেড়াল কোলে করেই ছত্তার মিয়ার সাজনো বাসায় পা রাখি। ছত্তার মিয়ার বড় মেয়ে বকুল আমাকে প্রথম দেখে। কেমন করে এসেছি জানতে চায়। তার পাটনী বৌও আসে। নানা প্রশ্নে ব্যাতিব্যস্ত করে তুলে। আমি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকি। নিজের বাসা আমার বাবা মায়ের কত স্বপ্নের বাড়ী।
(চলবে)