এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক

(পূর্ব প্রকাশের পর)
নিজ আলয়ে ফেরা
শেষের দিকে গাগলী বাস আমাদের জন্য দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিলো। একই বাড়ীতে বিভিন্ন মতামতের মানুষ জড়ো হয়েছিলো। কারও ধারনা যুদ্ধ সহজে শেষ হবে না। আমরা বোধ হয় ফরাযেজ নেয়ার পার্টি হয়ে যাবো। কেউ কেউ ছত্তার মিয়ার সাথে আঁতাত করে মনে করছিলো আম্মার এভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনায় জনমত তৈরী হচ্ছে। কিছু বলাও যাচ্ছে না। বাট্টি মিয়া বিবাহ করায় সেই গ্রুপ নিজেদের শাসক মনে করছিলো। সবচেয়ে বেশী ময়না চাচার বোন কলাইয়া বিয়ে হয়েছে, তিনি এসে আরও অসহনীয় করে তুলেন। রাজাকাররা আসার পর থেকে এই বাড়ীর মেয়েদের খুব দ্রুত যেনো তেনো ভাবে বিয়ে দেয়া শুরু হয়। কখন কি হয় এ জন্য। এই বিয়ে উপলক্ষে এই মহিলা আসেন এবং প্রকাশ্যে আমাদের জায়গা দেয়া নিয়ে দরবার শুরু করেন। আম্মা কে যা বলার নয় তাও বলেন। সর্বশেষ তিনি তার পুত্রের জন্য আপাকে বিয়ে দেয়ার জন্য একরকম জোর জবরদস্তি চালান। এমন সময় এই সুনামগঞ্জ মুক্ত হওয়ার খবরে আম্মা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেন। আর কত দ্রুত নিজ আলয়ে যেতে পারেন তার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন। নৌকা ঠিক করা হয়। আমরা বাধা ছাদা করছি এমন সময় আরেক মুক্তিযোদ্ধার দল এই গ্রামে উঠে। মন্তাজ ডাকাত যে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে অসীম সাহসে যুদ্ধ করেছে সে বেশ কয়েক জন সঙ্গী নিয়ে ছত্তার মিয়ার ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ী পুড়তে যায়। এদের মারধর করে। আম্মা গিয়ে তাকে নিবৃত করেন। সে আম্মাকে মা ডাকে। গাগলীর এরা যখন দেখে যে মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ আসছে তারা আম্মাকে আলাদা সম্মান দিচ্ছে, তখন আম্মাকে আরও কটা দিন থাকার জন্য অনুরোধ করে। আম্মা রাজী হন না। আমরাও পাগল হয়ে গেছি মুক্ত সুনামগঞ্জ দেখার জন্য। ৭ তারিখেই আমরা নৌকা যোগে সুনামগঞ্জের বাজারের ঘাটে নামি। সঙ্গে নবাব ভাই। নৌকায় বসেই আম্মা, কে কে সুনামগঞ্জে এসেছে খবর নেন। দাদা, নানা ভাই, মতিউর মামা কেউ শহরে আসেন নি। আম্মার বড় ফুফা নাজির সাহেব আসছেন। কিভাবে যে আম্মা উনাকে খবর পাঠান আল্লাহ জানে। উনি এসে আমাদের নৌকা থেকে নামিয়ে নিয়ে যান। আম্মা সোজা বাসায় যেতে চান। দীর্ঘ নয় মাস পর নিজ আলোয় ফেরা। আনন্দ না যত, তত দু:খ আমাদের ঘিরে রাখে। এই সেই বাসা যা বহু কষ্টে আমার বাবা গড়ে তুলেছিলেন। নানা ভাইর সাহায্য ছাড়া উনার এটা করার সামর্থ্য ছিলো না। একজন মফস্বলের দেওয়ানী উকিল যিনি আবার বেশীর ভাগ কেইস প্রায় বিনা পয়সায় করতেন। তিল তিল করে জায়গা জমি বেচে তৈরী করা বাসায় গাছ লাগিয়ে ছিলেন যত্ন করে। মেয়েদের জামাইদের থাকার জন্য আলাদা ঘর তুলেছিলেন যা শেষ করে যেতে পারেন নাই। যে ঘর শেষে আমাদের চলার পথ করে দেয়। ছোট বোনটা যার দুষ্টুমীতে সারা ঘর তটস্ত থাকতো তাকে কোথায় কোন অচিন দেশে রেখে এসেছি! সে যেনো ডাকছে আমাদের, আমাকে নিয়ে যাও। আমরা কটি মানুষ মরা মানুষের মতো ঘরে ঢুকি। এতো কষ্টের মাঝেও স্বস্তি দেশ শত্রু মুক্ত। লাখ লাখ মানুষের রক্ত শুষে নিয়ে দেশ আজ স্বাধীন হচ্ছে। এ ফেরা আপন জনের রক্তের ভেতর দিয়ে ফেরা। দু’চোখের পানি সামলানো দুরুহ তবুও এক বুক হাহাকার নিয়ে নিজ আলোয় স্বস্তির আগমন।
আমাদের বাসা ছত্তার মিয়া দখলের পূর্বে এক বার লুট হয়েছে পাক বাহিনী মাধ্যমে। ছত্তার মিয়া যাওয়ার পর আবারও তার জিনিস নেয়ার জন্য পাবলিক লুট করেছে। ঘর না যেনো এক ভাগাড়। অসংখ্য জিনিস ফেলা নোংরা এক ঘর। যেনো ঝড় বয়ে গেছে এ বাসার উপর দিয়ে। ঝাটা যোগাড় করে তাদের ফেলা খাবার, ময়লা কাপড়, ভাঙা তৈজসপত্র সরাতে সরাতে বিকেল। আম্মা পাথর হয়ে বসে আছেন। আমার বাবার চেয়ার যেখানে প্রতি রাত্রে বসে আমাদের পড়া শুনতেন আর বারান্দা থেকে ভুল ধরতেন, তা পেয়ে যাই পুকুর পাড়ে। কেউ বোধহয় নিতে গিয়ে মনে ধরেনি ফেলে গেছে। যেনো সাত রাজার ধন পেয়েছি। চিৎকার করে জানান দিই। বাংলা ঘরে রাখা আমাদের ছেঁড়া তোষক বালিশ নিয়ে আসি। আর আমি যে ট্রাঙ্ক গুছিয়ে রেখেছিলাম তাও পেয়ে যাই। ছত্তার মিয়া পালানোর সময় তার এতো জিনিস কেমন করে সরালো ভেবে পাই না। ট্রাক ভাড়া করে গেছে নাকি! আমাদের একটা খাট তারা ব্যবহার করতো। সেটা রয়ে গেছে। মাটি চাটিতে রাত কাটাই। খাবারের চিন্তা করতে হয় না। আমরা আসার পর পরই বাবলুর আব্বা জালালাবাদ হোটেলের মালিক, তিনি আসেন আর এ দায়িত্ব তিনিই নিয়ে নেন। বাসায় খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। শুরু হয় নুতন যুদ্ধ।
সুনামগঞ্জ মুক্ত হলেও ভয় রয়ে গেছে, দেশ নাকি এখনও স্বাধীন হয় নাই। তবে সব জায়গা থেকে পাকিস্তানীদের পরাজয়ের সংবাদ আসছে। স্বাধীন বাংলা বেতারে তখন খালি জয়ের খবর। তবুও চূড়ান্ত বিজয় না আসা অব্দি স্বস্তি নাই। কখন আসবে সেই খবর সেই মহেন্দ্রক্ষণ তার অপেক্ষায় ক্ষণগোনা।
বাসায় আসার পর একটু থিতু হয়েই আমি বেরিয়ে পড়ি খবর সংগ্রহ করতে। কে কে ফিরলো? কোন রাজা কার ধরা পড়লো? কার কার ঘর পুড়েছে? কার কি ক্ষতি হয়েছে? সব জানা যেনো খুব দরকার। সালেহদের বাসাটা পুড়ে ফেলেছে। সাথে আব্দুল হক এমপি মামার বাসাও। নেক ভাইসাবদের অংশের ঘরও পোড়া গেছে। হাছননগরে বারী মিয়া নানার বাসা। নানু মোক্তারের বাসা। আরও কারকার বাসা পুড়েছে। আমি এসে খবর দিই। আম্মা বলেন, আহা আমার বাসাটা যদি পুড়ে ফেলতো মানুষগুলো থাকতো। সারা শহর খুঁজে আমাদের মতো দুইজন মানুষ হারানো কাউকে পেলাম না। সবাইকে যেনো কেমন কেমন লাগে চিনতে পারি না। পরিচিত সবার কাধে অস্ত্র। চেহারাগুলো বদলে গেছে।
নেক ভাইকে দেখলাম দাড়ি গুফে ছয়লাব। কেমন যেনো গম্ভীর, ভয় লাগছে। শুনেছি খুব ভালো যুদ্ধ করেছেন। মতিউর মামা এসেছেন আম্মা তাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। মামা ফুলে ফুলে কাঁদছেন আম্মার কোলে মাথা দিয়ে। চেহারার দিকে তাকানো যায় না। এ যেনো আমাদের সেই হাসি খুশী মামা নন। দাদা তখনও আসেন নি। নানা ভাইও না। আমরা পথ চেয়ে বসে আছি কবে আসবে আমাদের আপনজন। রাস্তায় মালদার মামা । ডেকে আদও করলেন। আমি ভয়ে একসা। কারণ সবার চেহারা থেকে যুদ্ধেও আগের সেই কোমলতা হারিয়ে গেছে। যুদ্ধ তাদের পেলবতা কেড়ে শক্তিমান করেছে। নয় মাসে একেক জন মানুষ এতো বদলে যায় তা না দেখলে বিশ্বাস হয় না। প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন রাজাকারকে ধরে বাসস্ট্যান্ডের সামনে দিয়ে গণধোলাই দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্বচক্ষে সেই গণধোলাই অবলোকন করেছি। প্রায় মিছিলের মতো করে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে। সেই মিছিলের সঙ্গে হাঁটছি। যাদেরকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে তাদের অনেককে চিনি। কেউ কেউ উজানীগাঁয়েরও। গণধোলাই এর চোটে একেক জন রক্তাক্ত। কাউকে জেলে পুরা হচ্ছে। কাউকে মেরে ছেড়ে দিচ্ছে। আর কাউকে নদীর ওপারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা অনেকেই নদীর ওপারে রয়ে গেছে। মেজর মোতালিব তাদের হেড। ওখানে নাকি তিনি বসে আদেশ জারী করছেন। অনেক রাজাকারকে ধরে ওখানে কারাগার বানিয়ে রাখা হচ্ছে। তাদের নাকি ঘাস খেতে দেয়া হচ্ছে। কত রকমের খবর। রাত্রে নদীর ওপার থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসে টুকটাক গুলি। ভয় পাই না জানি এ গুলি মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি। কোন পাক আর্মি নেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র উত্তেজিত। রোজই একেক এলাকা মুক্ত হওয়ার খবর জানাচ্ছে। ১৫ তারিখেই জানিয়ে দেয়া হয় পাক বাহিনী নাকি আত্মসমর্পন করবে রেসকোর্স ময়দানে। বিশ্বাসই হচ্ছে না। এতো বড় পাক আর্মি সত্যি আত্মসমর্পন করবে! কানের কাছে রেডিও নিয়ে বসে থাকা এখন মূল কাজ। আবু আলী মামা আসেন আম্মার সাথে দেখা করতে। উনার কাছে খবরের জাহাজ। তিনিই প্রথম খবর দেন দাদা নদীরও পারে আছেন। ১৫ তারিখ বিকালে নানাভাই সবাইকে নিয়ে চলে এসেছেন। রাস্তা থেকে দৌঁড়ে গিয়ে নিয়ে আসি। আনন্দ বেদনার কান্না চলতে থাকে। বহুদিনের অনেক না বলা কথা, অপরিসীম কষ্ট, কান্নার মাধ্যমে বলা হয়ে যায়। নিজের ৩২ বছরের মেয়ের সাদা শাড়ী নানা ভাইর সহ্য হবার কথা নয়। বারবার বলেন, তুমি এটা কি পড়েছো। এটা হিন্দু সংস্কৃতি। খোলো শান্তি খোলো। আম্মা চুপ। আবেদীনকে জড়িয়ে ধরে পাথরের মতো বসে থাকেন। আমরা নানা ভাইর কোলের কাছে সবাই একত্রে বসে থাকি। বাবার পর সবচেয়ে বড় আশ্রয় যেনো এই কোলে। নানা ভাইর দোকান লুট হয়ে গেছে কিচ্ছু নেই। তবুও স্বাধীনতা আসতেছে এই আনন্দে কান্না হাসিতে মাতোয়ারা।
১৬ই ডিসেম্বর স্বপ্নের বিজয়
১৫ তারিখ থেকে সবাই জানছে আগামীকাল পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পন করবে। রেসকোর্স ময়দানে। খবর শুনার পর ঐ রাতে নদীর ওপার থেকে মুর্হুমুহু গুলির শব্দ আসতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা হয়তো ফাকা গুলি চালিয়ে আনন্দ করছে। বিকেলে রেডিও নিয়ে নানা ভাই আমাদের বাসায় বসা। কি বলছে যেনো গিলছেন। এরই মধ্যে বিকালে হাজার মানুষের চিৎকার শুনা য়ায়। চিৎকার দিয়ে উঠেন আমার প্রায় বৃদ্ধ নানা জয় বাংলা বলে। রাস্তায় নেমে আসে সারা শহরের জনতা। এই কয় মাসের অবরুদ্ধ বাধ যেনো ভেঙ্গে গেছে। আরপিননগর লক্ষণশ্রী, বাসস্ট্যান্ড, জামতলা, কোত্থেকে যে এতো মানুষ নিমেষে রাস্তায় নেমে আসে খোদাই মালুম! গবার মুখে চিৎকার করে জয় বাংলা ধ্বনি। আনন্দে আত্মহারা মানুষ। এরা এই শহরেই ছিলো মরার মতো। প্রাণ ফিরে পেরেছে যেনো। চারিদিক থেকে জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে মানুষের স্রোত আসছে। এ এক অসাধারন দিন আমিও রাস্তায়। বাসার সবাই রাস্তায় কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। মুক্তিযোদ্ধারা গুলি ছোড়ে আনন্দ উল্লাস করছে। আম্মাবের করে দেন পতাকা। যা মার্চের প্রথম দিকে মানিক ভাইর বাসায় ছাত্ররা বানাচ্ছিলো আমি চেয়ে নিয়ে এসেছিলাম। কেউদিতেচায়নিসাইফুরভাইশেষেডেকেদিয়েছিলেন ।
আমি এনে আব্বাকে দেখিয়েছিলাম, এটাই নাকি আমাদের পতাকা হবে আব্বা আমার হাত থেকে নিয়ে নিয়েছিলেন। বাসা থেকে যাওয়ার সময় নিজের কাপড়ের সাথে এই মহামূল্যবান পতাকা সাথে নিয়েছিলেন। এই নয় মাস আম্মা যক্ষের ধনের মতো এটা আগলে রেখেছিলেন। আজ আমার হাতে একটা কাঠিতে বেধে দেন। পতাকা হাতে আমি যেনো স্বাধীনতা হাতে পেয়ে যাই। দেই এক দৌঁড়। এক্কেবারে পয়েন্টে। সেখানে সবাইকে আনন্দে হাসতে কাঁদতে আর বুকে বুক মেলানোর এক অভিনব দৃশ্য দেখি। এতো বড় বড় যোদ্ধা শিশুর মতো কাঁদছে আবার পরক্ষণে অপার্থিব হাসিতে ঝলমলিয়ে উঠছে। পৌড় বৃদ্ধ শিশু বালক সবাই যেনো নুতন করে শ্বাস নিচ্ছে। হাজার হাজার মৃত মানুষ যেনো হঠাৎ করে জেগে উঠেছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত এক দেশ। অনেকের কাল কি খাবে তার যোগান নেই, কিন্তু স্বাধীনতার ছোঁয়ায় সবার সব দু:খ যেনো কোথায় উধাও। ছেলে হারানোর বেদনা পিতা হারানোর কষ্ট সব যেনো স্বাধীনতা প্রাপ্তির আনন্দে বিলীন হয়ে গেছে। আগামী দিনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে মানুষ বিজয় দেখছে, বিজয়। সবুজের উপর লাল পতাকা তার মাঝে হলুদ কাপড়ে বাংলাদেশ যেনো হাসছে তার দামাল ছেলেদের অসাধ্য সাধন দেখে।
সমাপ্ত