এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
উপক্রমনিকা
দেখতে দেখতে বেলা যে পড়ে গেলো। দীর্ঘ এক জীবন কাটালাম। ৬০ বৎসর অতিক্রম করছি। মানুষ তার ফেলে আসা দিনের মাঝে বাস করে। সেই ফেলে আসা দিনের মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সবচেয়ে ভয়াবহ, সবচেয়ে উল্লাসের আনন্দের সময় ১৯৭১ সাল। বয়স আমার তখন ১১। এগারো বছর মেয়ের চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার ইচ্ছে হলো, কারণ এই একটি বছরে বাঙালি দিয়েছে ৩০ লক্ষ মানুষের তরতাজা প্রাণ, পেয়েছে স্বাধীনতার লাল সূর্য। আর এই ৩০ লক্ষ শহীদের তরতাজা রক্তের ধারায় মিশে গেছে আমার বাবা, আমার বোনের রক্ত। আমি সেই লাল সূর্যের রক্তের উত্তরাধিকার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকে বই রচনা করেছেন, স্মৃতি ধরে রেখেছেন, আমি মনে করি যাদের যা মনে আছে তাই লিপিবদ্ধ করে রাখা উচিত। কারণ হেলায় হেলায় দিন যে গেলো। প্রথমে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা, পরে যাচ্ছেন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধারা, চলে যাচ্ছেন গ্রামে-গঞ্জে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী ব্যক্তিবর্গ। কিন্তু সঠিক ইতিহাস লিখা হলো না। আমি কোন লেখক নই। ইতিহাস লেখক হওযার তো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু ইদানিং ঐ সময়ে যা দেখেছি তা লিখতে বড় ইচ্ছে হয়। কারণ হাজার বছরে একটি জাতির জীবনে এ ধরনের ক্ষণ আসে খুব কম। যাকে বলে যুগসন্ধিক্ষণ। হাজার বছরের কত স্বপ্ন, রক্ত, ঘাম ভালবাসা জড়িয়ে আছে একটি দেশের স্বাধীনতা, পতাকা প্রাপ্তি, একটি জাতীয় সঙ্গীত লাভের আশায়। আর আমি যত ছোটই হই না কেনো সেই প্রাপ্তি ক্ষণকে প্রত্যক্ষ করেছি অবাক বিষ্ময়ে। ভয়াবহ আতঙ্কে, আর অবোঝ দু’চোখ মেলে। এই সময়ই নিয়ে গেছে আমাদেরকে কঠিনতম জীবনযুদ্ধের পথে। আমাদের অনেক পাওয়া না পাওয়া, কান্না হাসির ঐ সময়টাকে বর্ণনা করার সাধ জাগলো মনে। আমার পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের ছেলেমেয়েরাই পড়ুক এই স্মৃতিচারণ খানা। জানুক বুঝুক কি কঠিন সময় পার করেছি আমরা, ঐ সময়ের ছেলে বুড়ো যুবা বৃদ্ধরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় শহর গ্রাম পাড়া মহল্লা সর্বত্র ছিলো যুদ্ধক্ষেত্র। ত্রাসে, শংকায়, জীবন হাতে নিয়ে কেটেছে প্রতিটি মানুষের জীবন। শুধু পাক হানাদার বাহিনী নয় তাদের দোসরদের ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতো মানুষ, এর মাঝেও স্বপ্ন বুনতো স্বাধীনতার, শান্তির ভালবাসার। জাতির পিতার আহ্বান ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাঙালি জাতি এই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। পকিস্তানি দোসররা থাকা স্বত্বেও প্রত্যেকটা গ্রামে মুক্তিযুদ্ধাদের ছিলো আশ্রয়স্থল। কেউ অস্ত্র ধরে, কেউ গান করে, কেউ শ্রম দিয়ে, কেউ নৌকা ঠেলে, কেউ পথ দেখিয়ে, কেউ ভাত রেঁধে, কেউ শরণার্থী হয়ে, কেউ এদের সেবা করে, যে যেভাবে পেরেছে যুদ্ধে শরিক হয়েছে। তাই এই যুদ্ধ ছিলো এদেশের মানুষের। আবাল বৃদ্ধবণিতার। আর সারা দেশের মানুষ সম্পৃক্ত হওয়ার কারণেই মাত্র নয় মাসে পাক বাহিনীর মতো বিশ্বমানের সেনাবাহিনী ৯৫ হাজার সৈন্য অস্ত্রসহ আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। এ যেনো এক অভাবনীয় কাহিনী। মানুষের স্বপ্নের অতীত। কিন্ত কঠিন বাস্তব।
সেই সূর্য সন্তানদের, সেই কঠিন সময় পার করা প্রতিটি বাঙালির যুদ্ধকে, হাহাকারকে, ভালবাসাকে স্বপ্ন বুনাকে আমি যেভাবে দেখেছি তাই এই লিখায় তুলে ধরতে চেষ্টা করবো। স্মৃতির মাঝে সময়ের ময়েশ্চার পড়ার কারণে হয়তো কিছু ভুল হয়ে যেতে পারে। ঐ সময়টা যারা পার করেছেন তারাই আমার ভুল গুলো ধরতে পারবেন। তাদের কাছে আমি আমার ভুল ধরিয়ে দেয়ার জন্যে সবিনয় অনুরোধ করছি। আমি আবারও বলছি আমি শুধু আমার স্মৃতিগুলোর বয়ান লিখতে বসেছি, ইতিহাস নয়।
স্বাধীনতার প্রস্তুতিকাল
১৯৭১ সালে আমার বয়স ১০ পার হয়ে ১১ চলছে। সুনামগঞ্জ শহর আমার জন্মস্থান, আমার বেড়ে উঠার স্থান, যেখানের বাতাসে আমার জুড়ায় প্রাণ। বাংলাদেশের উত্তরপূর্বের শেষ ছোট্ট মহকুমা শহর, শান্ত নিরিবিলি, হাওর আর পাহাড়ের মাঝে এক বিচ্ছিন্ন এলাকা। কিন্তু এই শান্ত শহরের মানুষ বড়ই উচ্ছ্বল। বড়ই আবেগ প্রবণ। মুক্তিযুদ্ধ বা তৎপূর্ববর্তী এমন কোন আন্দোলন সংগ্রাম নেই যেখানে সুনামগঞ্জের ছাত্রজনতা শামিল হয় নাই। এই শহরের বহু মনীষী পৃথিবী বিখ্যাত। আসাম প্রদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বহু রাজনৈতিক নেতা জন্মেছেন এই সুনামগঞ্জে যাদের শ্রমে ঘামে মেধায় মননে ধীরে ধীরে স্বাধীনতা নামক সোনার হরিণ ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছে এই প্রজন্ম। দেশবরেণ্য সেই সূর্য সন্তানদের কাউকে কাউকে আমি নিজ চোখে দেখেছি। অনেকের নাম পড়েছি ইতিহাসের পাতায়। বাংলাদেশের ইতিহাসের সংস্কৃতির জ্ঞানের এক বিরাট অংশ জুড়ে আছে সুনামগঞ্জের কৃতিসন্তানেরা। এই লিখাটা লিখার সময় নিজেকে ১১ বছরের মেয়েতে নিয়ে যেতে একটু কষ্ট হবে। তবুও আমি ১১ বছরের মেয়ের চোখেই মুক্তিযুদ্ধকে খুঁজতে চেষ্টা করবো।
১৯৭১ এর বীজ বহু পূর্বেই রচিত। আমার স্মৃতিশক্তি প্রখর। আমার বড় বোন শাহানা এসব স্মৃতি কথা বল্লে বলে ‘এ্যা সে সব মনে রাখছে আমার মনে নাই’! হ্যাঁ আমার ১৯৬৫ সালের দাঙ্গার কথা হালকা মনে আছে। ১৯৬৫ সালে আমরা থাকতাম আমাদের বর্তমান বাসার ঠিক অপজিটে দিলি আপাদের বাসায় ভাড়াটিয়া হিসাবে। আসলে এটা দিলি আপাদের নানার বাসা ছিলো। আমরা অতো বুঝতাম না। দিলি আপা আমাদের খেলার সাথী তাই দিলি আপাদের বাসাই বলতাম। দিলি আপা মরহুম আঞ্জব আলী মোক্তার সাহেবের মেয়ে। আমাদের ডানদিকের বাসাটাই ছিলো তাদের। তখনকার ছোটদের কাছে কার বাসা কোনটা তা মুখ্য ছিলো না। শুধু খাওয়ার সময় হয়তো নিজ বাসায় যাওয়া হতো নইলে কোন্ বাচ্চা যে কোন্ বাসার তা নির্ধারণ করার উপায় ছিলো না। অনেক সময় কে যে কার বাসায় খেতে বসে গেছে তাও জানা যেতো না। প্রত্যেকের ৫/৬/৭ জন করে ছেলে মেয়ে। সারা পাড়ার বাচ্চারা প্রত্যেক বাসাকে নিজ বাসা জ্ঞানে বিচরণ করতো। বাবা মা’রা বোধহয় অতো খোঁজ রাখতেন না। ঐ সময় চারিদিকে খালি একটি শব্দ শুনতাম যুদ্ধ লেগেছে। বড়দের মুখে টেনশনের ছাপ। বাবা মাদের অত্যধিক খবরদারি। পাড়া বেড়নোতে রেষ্টিকসন। আমাদের ছোটদের জীবনকে অতীষ্ট করে তুলে। যুদ্ধ যে কোনখানে তা বুঝতে পারছি না। শুধু চানমাড়ীতে (আনসারদের ট্রেনিং এর স্থান) গুলির মহড়া শুনলে মনে হতো এটাই যুদ্ধ। আমাদের বাসা ছিলো মুলিবাঁশের বেড়া দেয়া টিনের ৩/৪ টা রুমের । পিছনে আলাদা রান্নাঘর আর একটা কাজের মানুষ থাকার ঘর। এই ঘরের মাঝে বাংকার খোঁড়া হলো। অনেকটুকু জায়গা নিয়ে গর্ত করে তিন চার জন ঢোকার মতো জায়গা, এর নাম নাকি বাংকার। আমার নানা মরহুম মতছিন আলী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বাংকার তৈরি করান। জোরে শব্দ করে যখন প্লেন আসতো আম্মা নিজে বাইরে থেকে আমাদের চার পাঁচ জনকে ওখানে ঢুকিয়ে দিতেন। আমরা তখন চার বোনÑ আপা আমি সিতারাই একটু বড় আর আমাদের সাথে থাকতেন আমাদের চাচাতো বোন জমিলা আপা। শাম্মী বেশী পিচ্চি, লাকী তখনও পৃথিবীর মুখ দেখে নাই। আম্মা বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁপতেন। আর জোরে জোরে দোয়া দরুদ পড়তেন। বাইরে প্লেনের বিকট শব্দ থেকে বাঁচার জন্যে কানে তুলা গুঁজে দিতেন। প্রায়ই এই বিকট শব্দের প্লেন আসতো আর ত্রাসে ভয়ে বড়দের মাঝে আতংক ছড়িয়ে চলে যেতো । প্লেন চলে যাওয়ার পর পাশের বাসার খালুসাহেবদের সাথে আব্বা জমায়েত হয়ে কোন দিকে থেকে প্লেন আসালো বুঝতে শুরু করতেন। যুদ্ধবিমান কি না ? বোমা কোথায় পড়লো? তার বিশ্লেষণ করতেন। আমাদের বাসার বামদিকে বর্তমান রেজিয়া হোটেলের ওখানে ছিলো মুলীবাঁশের বেড়া দেয়া কয়েকটা ঘর। প্রনতি দি’রা ওখানে থাকতো। এক সন্ধ্যায় তাদের বাসায় কারা যেনো আক্রমণ করে। তারা পিছন দরজা দিয়ে আমাদের বাসায় চলে আসে। তাদের সেই ভয় আর কাঁপুনি আজও মনে পড়ে। সেই সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জের তাবৎ নেতারা আমাদের বাসায় চলে আসেন। (চলবে)