এবার ধান পরিবহনে সুবিধা দেবে প্রকৃতি

বিশেষ প্রতিনিধি
ধান গোলায় ওঠেছে, এবার বিক্রির পালা, তাতেও হয়তো সুবিধা দেবে প্রকৃতি। আবহাওয়া অধিদপ্তর এমন পূর্বাবাসই জানিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১৩ মে পর্যন্ত সুনামগঞ্জের প্রত্যেক উপজেলায় এবং উজানের মেঘালয় ও বরাক উপত্যকায়ও বৃষ্টি হবে। কৃষকরা বলেছেন, এখন হাওরে পানি আসলে উপকারই বেশি হবে, ধান বিক্রিতে সুবিধা বাড়বে।
সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ধানের উৎপাদন হয়েছে। হাইব্রিড জাতের ধান চাষ হয়েছে ৫৭ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে। গত বছর যা ছিলো ৩৬ হাজার ৫১০ হেক্টর। হাওরের ৯৭. ৮৫ ভাগ ও নন হাওরে ৫৬.৮৫ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। এই দুই রকম জমির মোট ৮৭.২৬ ভাগ ধান কাটা শেষ।
সোমবার বিকালে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ধান কাটার অগ্রগতি বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় এসব কথা জানান জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।
জেলার শাল্লার বড় কৃষক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলমিন চৌধুরী বললেন, হাওরে ধান কাটা মাড়াইয়ের কাজ শেষ। শুকানোর কাজও শেষ পর্যায়ে। খড় শুকানোর কাজ চলছে। এখন পানি আসলে উপকার হবে। পানি যদি খালে বা হাওরে ঢুকে যায়, তাহলে ধানের ব্যাপারী’র নৌকা বাড়িতে চলে আসবে বা নৌকায় করে আড়তে ধান নিয়ে যেতে পারবেন কৃষকরা। আমরা এখন চাতল পাখির মতো বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করছি।
জেলার জামালগঞ্জের পাগনার হাওরপাড়ের বড় কৃষক ইউপি চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু তালুকদার বললেন, ধান কাটা প্রায় শেষ, খড় আছে হাওরে। এখন বৃষ্টি আসলেও থেমন কোন সমস্যা হবে না। বৃষ্টি হলে বরঞ্চ মাঠে ঘাষ ওঠবে। গরুর জন্য উপকার হবে। তবে পানি আরও কয়দিন পরে আসলে ভালো। গরু হাওরে ছড়িয়ে ঘাস খাওয়ানো যাবে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ আবু সাঈদ আহমদ চৌধুরী বললেন, বুধবার থেকে ১৩ মে পর্যন্ত সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় ২০০ থেকে ৩৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হবে জেলার ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলায়। এই দুই উপজেলায় ৩৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হবে। এছাড়া সুনামগঞ্জ সদরে ৩০৪, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ২৯৮, বিশ^ম্ভরপুরে ২৫০, তাহিরপুরে ২২০, শাল্লায় ২২২, জামালগঞ্জে ২২৮, জগন্নাথপুরে ২৬৬, ধর্মপাশায় ১৯৬ এবং দিরাইয়ে ২৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হবে। এই আবহাওয়াবিদ জানান, আগামী ৩ দিনে সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের মেঘালয় এবং আসামের বরাক উপত্যকায় ১৫০ থেকে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হবে। এই বৃষ্টিতে বন্যা হবার কোন শঙ্কা নেই। এই সময়ে শিলাবৃষ্টির আশঙ্কার কথা জানান তিনি।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগরের ধান চাল আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলাম জানালেন, মঙ্গলবার ওই আড়তে ২৯ জাতের ধান কেনা হয়েছে ৯২৫ থেকে ৯৩০, ২৮ জাতের ধান ৯৪০ থেকে ৯৪৫ এবং মোটা ধান বিক্রি হয়েছে ৮০০ থেকে ৮৩০ টাকায়। তিনি জানালেন, নদীতে পানি কম থাকায় এবং হাওরে পানি না আসায় অনেক এলাকার কৃষকরা ধান নিয়ে মোকামে আসতে পারছে না, এখন কিছু পানি হলে সুবিধা হবে। উৎপাদিত ধান বিক্রয় করলে ভালো দাম পাবেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সোমবার বিকালে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় কালে বলেছেন, কয়েক দিনের ভেতর হাওরের ১০০ ভাগ ধান কাটা শেষ হবে।
তিনি জানান, ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছিল। এর থেকে হাওরে ৬ লাখ ৭০ হাজার ৩৯৮ মে.টন ও নন হাওরে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ মে.টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই দুই রকমের জমি থেকে ৯ লাখ ১ হাজার ১০ মে.টন চালের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের ধান কাটার জন্য এবছর সরকার ৭০ ভাগ ভর্তুকীতে ১১৫ টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন বিতরণ করা হয়েছিল। পুরানো মেশিন ছিলো ১২৯ টি। মোট ৩০৭ টি হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা হয়েছে। একই পরিমাণে ভর্তুকী দিয়ে ১৯ টি রিপার মেশিন বিতরণ হয়েছিল এবার। মেশিনের পাশাপাশি ২ লাখ ৩০ হাজার শ্রমিক ধান কেটেছে হাওরে। এবার সুনামগঞ্জের কৃষক সোনার ফসল ঘরে তুলতে পেরেছে।