কবিগুরুর বর্ষার গান

এস ডি সুব্রত
বিরহের ঋতু, আবেগের ঋতু বর্ষা। রবীন্দ্র সাহিত্যে বর্ষা এসেছ নতুন রূপে। একমাত্র কালিদাসের মেঘদূত ছাড়া বর্ষায় কাব্য সাহিত্যে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেন নি রবীন্দ্রনাথ কে। বর্ষায় আনন্দের চেয়ে বেদনার অভিজ্ঞতাই বেশি। রবীন্দ্রনাথ পরিচিত সংসার থেকে বাইরের পানে যেতে চেয়েছেন…….“মন মোর মেঘের সঙ্গী। উড়ে চলে দিক দিগন্ত পানে। নিঃসীম শূণ্যে শ্রাবণ বর্ষণ সঙ্গীতে। রিমঝিম রিমঝিম। “কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রচিত বর্ষার গানে প্রাচীন যুগের কবিদের বর্ষার আনন্দ বেদনা ও মিলন বিরহের ধারনাটি নবরূপে চিত্রিত করেছেন। বর্ষার গানে মিলন বিরহের রূপটি সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে কালিদাসের কাব্যে রুপায়িত বেরানদী তীরের মালবিকার পথচেয়ে থাকার প্রতীক্ষার মূহুর্ত ফুটে উঠেছে এভাবে ……..
“বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এল মনে
কোন সে কবির ছন্দ বাজে ঝরো ঝরো বরিষনে।”
অঝোর ধারায় বর্ষণমুখর আষাঢ় মাসের নান্দনিক চিত্র এঁকেছেন কবিগুরু তার রচনায়। নীল নবঘণে আষাঢ় গগণে-গানে কবি বেনুবনের কথা বলেছেন। ঘনঘোর মেঘের ডমরু ধ্বনির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথের ‘হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু’ গানটিতে। রবীন্দ্রনাথের গানে মেঘদূতের সেই অলকাপুরীর নায়িকার কথা উঠে এসেছে——
“সুদূর মেঘে অলংকার পানে
ভেসে চলে যায় শ্রাবণের গানে,
কাহার ঠিকানা খুঁজিয়া বেড়ায়
হৃদয়ে কার স্মৃতি বাজে।”
গীত বিতানের বর্ষার প্রথম গানে কবি বর্ষাকে আবাহন করেছেন শ্যামল সুন্দর বলে, যেখানে বিরহী হৃদয় চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে আকাশপানে। কবির ভাষায় …. ‘ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে জল সিঞ্চিত ক্ষিতি/……… নিখিল চিত্ত হরষা ঘন গৌরবে আসিছে মত্ত বরষা।’ বর্ষার প্রেমে মাতোয়ারা কবিগুরু মেঘকে বর্ননা করেছেন প্রেয়সীর কাজল কালো চোখ হিসেবে ….” হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল গগনে সেই সজল কালো আঁখি পড়িল মনে। আবার বিরহে কখনো গেয়ে উঠেছেন ….. ‘তুমি যদি না দেখা দাও, কর অবহেলা/ কেমন করে কাটবে আমার এমন বাদলবেলা।’
মেঘদূতের মতো বৃষ্টি কে প্রাণ দিয়েছেন কবিগুরু। বাদলকে বলেছেন একতারা বাজানিয়া বাউল।……
‘বাদল বাউল বাজায়রে একতারা
সারা বেলা ধরে ঝরো ঝরো ঝরো ধারা।’
কবিগুরুর শ্যামল ছায়ায় নাইবা গেলে গানটি বর্ষা বিদায়ের গান। ‘শ্যামল ছায়ায় নাইবা গেলে/…..মলিন তোমার মিলাবে লাজ/ শরৎ এসে পরাবে সাজ।’ শ্রাবণের বর্ষা রাতে কবি স্মৃতির রাজ্যে হারিয়ে স্মৃতির মালা গেঁথেছেন কান্নায় ভেসে। কবিগুরু শান্তি নিকেতনে ১৩৪২ সালে এ গানটি লিখেছিলেন।’ আজি বরিষণ মুখরিত শ্রাবণ রাতি,/স্মৃতি বেদনার মালা একেলা গাঁথি।’
কবিগুরুর গানে কৃষ্ণকলি, মেঘলা আকাশ আর কালো হরিণ চোখ যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
“কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,
কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক
মেঘলা দিনে দেখেছিলাম মাঠে
কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।”
আবার কখনো কবির কণ্ঠে বাদল দিনের পাগলা হাওয়ার গান বেজে ওঠে। কবি গেয়ে ওঠেন ……
‘পাগল হাওয়ার বাদল দিনে
পাগল আমার মন নেচে উঠে।’
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ