কবি আশরাফ আহমদ: দূরাগত লাভার প্লাবন

কুমার সৌরভ
[নির্বাচিত কবিতা-আশরাফ আহমদ, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ : একুশের বইমেলা ২০২০]
কবিরা স্বপ্ন ও মায়ার জগতের অধিবাসী হন, আমরা জানি। তাদের দেখা যায় আবার যায় না। কুয়াশার ভিতর দিয়ে পরিপার্শ্বের যে প্রচ্ছন্নতা, কবিরা সেরকম প্রচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। কবিরা শব্দখেলোয়াড়। বলা যেতে পারে তারা শব্দ দিয়ে পাঠককে ধাঁধায় ফেলতে ভালোবাসেন। সরল ভাব প্রকাশ করে যে বাক্য তার নিরেট গদ্য, কবির জাদুহাতের স্পর্শ পেয়ে যা রচিত হয় তা কাব্য, এক কথায় বহু কথা বলে যাওয়া স্তবক বিশেষ। তাহলে কি কবিরা এই জগতের অধিবাসী নন, অথবা এ জগতে থেকেও তারা অন্য এক জগতের চিন্তায় মগ্ন থাকেন ? চোখে দেখার বাইরে যে রূপের খনি তা কেবল একজন স্বাপ্নিক কবিই দেখেন। দেখেন বলেই কবিতার পঙক্তিতে নিয়ে আসতে পারেন থোকা থোকা জোনাকী আর মিটিমিটি তারার বুননে চাঁদনী আলোর মতো স্নিগ্ধতায় ভরা নকশিকাঁথার মতো সুন্দর শরীর। কবিরা দৃষ্টিগ্রাহ্য জগতকে সাধারণের দৃষ্টিতে দেখেন না। পর্যবেক্ষণের অতলতার গভীর থেকে যে রূপময়তা উঠে আসে তা আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। আমরা ভাবি, কথায় এতো ঐশ্বর্য, শব্দে এতো তেজরাশি, স্তবকে এতো অর্থদ্যোতকতা, কবিতার শরীরে এতো অপার রহস্যময়তা; তৈরি হয় কী করে। পাঠককে এমন অবাক বিস্ময়ের মহাসমুদ্রে নিক্ষেপ করাই কবির কাজ। কবি লিখার সময় তার মনোজগতে একধরনের ভাবনা কাজ করে। পাঠক সেই ভাবনা জানেন না। পাঠক যখন কবিতা পাঠ করেন তখন নিজের মত করে এর অর্থ তৈরি করেন। এই অর্থ কবির ভাবনার সাথে নাও মিলতে পারে। কবিও হয়তো তখনকার ভাবনার সাথে পরে স্থিত না থাকতে পারেন। কিন্তু কবিতা নিজে নিজে এক বা একাধিক ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের কাছে। এই বহুগম্যতাই কবিতার সার্থকতা।
কবি আশরাফ আহমদ আমাদের অগ্রজ। কৈশোর-যৌবনে সুনামগঞ্জের আলপথ ধরে ঘুরেছেন, ছবির মতো কবিতার চাষ করেছেন। এই মফস্বল শহরের গ্রামীণ অকৃত্রিমতা আর প্রকৃতির অপার রপের ডালি তাকে ভাবুক হতে সহায়তা করেছে নাকি এক ভাবুক মন নিয়েই জন্মেছিলেন তিনি; সে রহস্য অনুঘাটিতই থাক। বরং তিনি যে সুনামগঞ্জ ছেড়ে গিয়ে ঢাকার বড় কর্পোরেট হাউসের আরও বড় পদাধিকারী হয়েও সেই আদিম অকৃত্রিমতা ভুলে গিয়ে পুরোদস্তুর কর্পোরেট সাহেবসুবো হয়ে উঠেননি, এজন্য আমরা বরং আনন্দ প্রকাশ করতে পারি। ৬৫ অতিক্রান্ত হলেও বার্ধক্যের জরা হার মেনেছে এসে তাঁর কাছে। নিপাট কবিসুলভ মগ্নতায় তিনি বলতে পারেন- ‘‘আত্মসম্মোহনে কাঁপি,/কোমলপ্রিয়তাবেশে অনুবাদ করি/নিজ গোপনতা।/ভেতর-বেশ্যাকে টানি রোদে।/রোদ ঝরে উত্তাপের আগে,/দেহ ছাড়ে নুন,/ নিজে হই নিজশত্রু অনাস্থাভাজন।’’ (পুরুষত্বহীনতার বোধ)। কবির এই উপলব্ধি রহস্যময়তার আরেক পরাকাষ্ঠা। এখানে তিনি নিজের মধ্যে বহুকে ধারণ করেছেন যেমন শিবশম্ভু ধারণ করেছিলেন জগৎসংসারের সমূদয় বিষ, হয়েছিলেন নীলকণ্ঠ। কবিও তেমন নির্বিকার নির্লিপ্ততায় চারপাশের যাবতীয় ভ্রষ্টতা আর ভীরুতার সব নষ্টচিত্র নিজে ধারণ করে হয়ে উঠেন আরেক নীলকণ্ঠ।
আশরাফ আহমদ প্রচ্ছন্নতার কবি। তিনি জীবন ও জগৎকে দেখেন কখনও আসক্তির ঘোরে, কখনও নিরাসক্তির পরম্পরা ধারণ করে আবার কখনও দেহ-ব্যবচ্ছেদে পটু শৈল্যবিদের মতো করে। তিনি নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন আরেক রহস্যময় কবি বাংলা কবিতার উত্তরাধুনিক পর্বের সফল নিরীক্ষাকার জীবনানন্দ দাশকে। জীবনানন্দের প্রতি গভীর অনুরক্তি কবির। উভয় কবিই জীবনকে খোঁজেছেন সিংহল সমুদ্র থেকে বিম্বিসারের ধূসর জগত পর্যন্ত ইতিহাসের পরতে পরতে। কবি আশরাফ যখন উচ্চারণ করেন- ‘‘উজাড়িত নৈবেদ্য নিয়ে/হাজার বছর ধরে হাঁটুভেঙে/এই যে কাক্সক্ষা, কাঙালিপনা/অবারিত এই যে তৃষ্ণা/হাত পেতে থাকা/এর শেষ নেই! তোমাতে ডুবেই এই সর্বনাশ-’’ (শেষ চাওয়া)। এই পঙক্তিগুলো আমাদের জীবনানন্দীয় ভাবনার কাছে নিয়ে যায়।
ভাবনার অতলসিন্ধুতে ডুবে থাকলেও কবি ভুলে যাননি প্রাত্যহিকতার নিরস পরিপার্শ্বকে। ব্যঙ্গাত্মকভাবে ধরা পড়ে তা কবিতায়। ‘‘বস হাসলে/আমার দাঁতেও রোদ/অত্যন্ত গম্ভীর হলে/আমার মুখেও মেঘ/এর নাম স্বাধীনতা/অনেক যুদ্ধের পর/এ আমার অমল অর্জন’’ (চাকর)। এই উপলব্ধির নাম হলো সমর্পিত জীবনের অপর বাস্তব দিকটি ওয়াকিবহালে রাখা, যেখানে কবি বেশ সাবলীল। এরকম ভাবনার প্রকাশ আমরা আরও দেখি কয়েকটি কবিতায়। ‘‘ষাটটি যুদ্ধের পর/শান্তি, শ্রান্তি বা মুক্তি নামক/স্বাধীন কাক্সক্ষা আর থাকে না/ ছুটি হয়/ অথবা বিপথে যাই/দলছুট নিঃসঙ্গ হলে/হাজার কলের ফোন বাজে না একবারও/মহাব্যস্ত জনটাকে চেনে না কেউ আর’’ (বিধবা বৈষ্ণবী)। ষাট অতিক্রান্ত হওয়ার পর কবি ছুটির যে আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন আজ ছেষট্টি অতিক্রান্ত সময়েও তিনি সে ছুটি পাননি। ছুটি চাইলেই কি পাওয়া যায়? এই যে কবির ভাবনার ছুটি, তা কি মানুষের স্বনিয়ন্ত্রিত? বোধ করি না। প্রশ্বাস যতদিন বহমান ততদিন ছুটির সুযোগ নেই। আর শেষ নিঃশ্বাস কখন পড়বে তা কে জানে ? তাই কবি আক্ষেপ করে বলেছেন- ‘‘হাঁটছি পিছু পিছু অনন্ত যাত্রায়/ঘোর-চোখে ধাবমানতার স্রোতে/অনুগত দাসানুদাসের পুত্র প্রেমের পদাঙ্কে শেষ/ এই পথ ফুরাবার নয়/আমি কি আপনার পথে/বাঁচার ছদ্মনামে মরতে নেমেছি?’’ (আপনার পথ)। অথবা, ‘‘মাটি ভেবে খুঁড়ছি মগজ,/ অবিরাম তেষট্টি বছর/ কড় পড়ছে হাতে, খুন্তিতে ধরেছে ক্ষয়, তবু পথ ফুরাচ্ছে না।’’ (খুঁড়ছি)।
কবিরা সমকালকেও ধারণ করেন। নতুবা দায়বদ্ধতার জায়গায় তাঁরা হয়ে পড়বেন ভাবীকালের প্রশ্নতলে। কবি আশরাফ আহমদ সেই কঠিন বাস্তবসত্যের মাঝেও দেখেন নিজের প্রতিরূপ। নদী বিলীন হয়ে চর জেগে উঠার সাথে প্রতি দিন একটু একটু করে ক্ষয়ে আসা জীবনের তুলনা করে কবি তখন বলে উঠেন- ‘‘ না, ওটা কোনো শুশুকের কুঁজো পিঠ না/নদী ফঁুড়ে জেগে ওঠা চর/ ভাবছেন-সম্ভাবনা? আগামী আগামী! আমি দেখছি-ফেলে যাওয়া/পরিযায়ী পাখির পালক/… এমনকি সমুদ্র শিথানে লাল কাঁকড়ারা/‘আতরাফ আতরাফ’ লিখে/বালিতে লুকানো মাত্র/ঢেউ এসে মুছে দিয়ে যায়/নেই নেই জিগিরের ধ্বনি/ঘোরগ্রস্ত করে ফেলে শূন্য দশদিক/আমি হই সর্বনাম, না-থাকার নামে’’ (চিহ্ন)। সমকালীন বিশ্বের অন্যতম এক মানবিক সমস্যা ‘শরণার্থী’। শুধুমাত্র রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত প্রতিহিংসার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আজ কোটি কোটি শরণার্থী নিজ দেশ ছেড়ে পরদেশে উদ্বাস্তু অমানবিক জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছেন। কবিহৃদয় এই অমানবিকতায় উদ্বেলিত হয়। কবি লিখেন-‘‘লক্ষ স্বপ্নের প্রিয় প্রতিনিধি হয়ে/ভাসমান ছিলাম, আছিও। অনেকটা জ্যান্ত মমি।/কলার ভেলাও যদি থাকত, বাঁচতাম/ছিল না তবুও মরি নি/ বাঁচার বিস্ময়ে প্রাণে দিগম্বরী নৃত্যের মাতম/ তবু বাঁচতে পারে না মানবতা, নো-ম্যানস ল্যান্ডে।’’ (নেই-মানুষের ছায়া)।
নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থে কবির ১২৪টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রতিটি কবিতাই কিছুটা অন্তর্লীন বেদনার ধারক হয়ে যেন পাঠককে জীবনের অর্থ জানার দিকে নিয়ে যায়। একইসাথে কবি অভিমানীও। ছত্রে ছত্রে অভিমানের ফোটা ফোটা খেদবিন্দু ঢেলে কবি নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন এক গোপন কুটিরে। ওই কুটিরে আর কারও প্রবেশাধিকার নেই। কবি সেখানে নিজের সাথে নিজে বুঝাপড়া করেন আর শেষে এই বুঝাপড়া প্রার্থনার অঞ্জলি হয়ে প্রকাশ হয়ে উঠে কবিতার শুভ্রাকাশে- ‘‘অনন্ত বিস্ময়ে যদি/শেষের সূচনা হয়/ যদি, ক্ষমাযোগ্য হতে পারি/উদ্ধার ও উত্তরণে দশদিক মুছে ফেলো/পরম ক্ষমায়/ধুয়ে ফেলো কালিমা কালের/আর জীবনের হাহাকারগুলো।’’ (শেষ চাওয়া)। কবি প্রচলিত অসংগতি, অসাম্য ও কপটতার বিরুদ্ধে কবিতাকে তলোয়ার বানিয়ে তুলেননি। কিন্তু এসব প্রপঞ্চ তাঁর ভাবনার বাইরে যে নয় তা গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলো পাঠ করলে বেশ বুঝা যায়। তিনি বরং রক্তাক্ত হন, ক্ষতবিক্ষত হন, নিজের ভিতর বেদনায় নীল হন। ‘‘আমি নই অন্য কেউ/ নিয়ত বিক্ষুব্ধ হাতে ঝড় তুলে গাছে/ নড়ি ও কাঁপতে থাকি/ ভেঙে যাই/ নির্বোধ অহং-গুচ্ছ খুলে খুলে যায়’’ (অন্যকেউ)। এই ভেঙে যাওয়া হলো সংবেদনশীলতার চূড়ান্ত রূপ। নিজেকে ভেঙে খানখান করে অগ্নিগর্ভা হতে চান- ‘‘অগ্নিগর্ভা যদি/তবে কেন মাখছি কুয়াশা/বরং উত্তাপ চাই/তবে হোক লাভার প্লাবন/স্নাত হই সূর্যসেন অমল আগুনে’’ (অগ্নি)।
কবি দীর্ঘজীবী হোন, জয় হোক কবিতার।