করোনা ভাইরাস এবং প্রবাসী বাংলাদেশী

এস এম সুজাদুল হক
করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সারা বিশ্বে সাম্প্রতিক সময়ের এক আতংকের নাম। গত বছরের ডিসেম্বরে ভাইরাসটি চীনের উহান প্রদেশে প্রথমে নিজেকে প্রকাশ করে। ক্রমে সংক্রমিত হয়ে বিশ্বের প্রায় সবকটি দেশেই এর প্রাদুর্ভাব জানান দিচ্ছে। উচু-নীচু, ধনী-গরীব, উন্নত-অনুন্নত, জাতি-ধর্ম-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সবাইকে এর বিষাক্ত ছোবলে আঘাত করছে এবং হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পরছে। দিনে দিনে এর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে। কোন কোন দেশে এর প্রাদুর্ভাব এতো ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে যে, সারা দেশ লক-ডাউন করেও এর থেকে পরিত্রাণ মিলছে না। বিশ্ব এখন মুলত স্থবির। বিশ্বনেতাদের ঘুম হারাম। বিশ্বের বিজ্ঞানীমহল এর প্রতিষে আবিষ্কারে নাওয়া খাওয়া ভুলে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে মহামারী ঘোষণা করেছে।
এতোদিন ভিনদেশেই ভাইরাসটির বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। চলতি মাসে ভাইরাসটি আমাদের দেশেও এর উপস্থিতি জানান দিয়েছে। এরপর থেকে এর ছোবলে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। আমাদের দেশের মানুষের বদ্ধমূল ধারণা যে, বিদেশ থেকে আগত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাধ্যমেই এই ভাইরাস এদেশে আমদানী হয়েছে। এরূপ ধারণায় যুক্তিও যথার্থ। যেহেতু এ জিনিস আগে এদেশে ছিলো না, কাজেই অন্য দেশ থেকে মানুষের উপর সওয়ার হয়েই এ ভাইরাস আমাদের দেশে এসেছে। কিন্তু এজন্য কি শুধু প্রবাসীদের দিকে আঙ্গুল তোলাই সঠিক বিবেচনা হচ্ছে? এই সময়ে বিদেশ থেকে প্রমোদ ভ্রমণ করে আসা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণে যোগ দিয়ে আসা, ব্যবসায়িক সফরে বিদেশ ভ্রমণ করে আসা নেটিভদের কি কোন দায় নেই? মুলত এই সময়ে দেশের প্রতিটি বন্দর দিয়ে চেক-ইন করা প্রতিটি মানুষই এই জীবানু বহন করার জন্য সন্দেহের উর্ধে নয়। হোক সে দেশী, বিদেশী কিংবা প্রবাসী।
এমন একটা সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি যথযথ ছিলো কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক হতেই পারে। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা আর দুরদর্শীতার অভাবও সন্দেহের উর্ধে নয়। আমরা যদি হার্ডলাইনে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম তাহলে দেশের সকল চেক-ইন পয়েন্ট সীল করে দেয়া যেতো। বিদেশ থেকে কোন লোকই যাতে দেশে প্রবেশ করতে না পারে এ বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতো। এ নিষেধাজ্ঞার কথা জানার পর যত প্রয়োজনই থাক, কেউ আর তার নিজ অবস্থান ছেড়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করতো না। আর মানবিক দিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিলে, বিদেশ ফেরত প্রবাসী-নেটিভ নির্বিশেষে সবাইকে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন করিয়ে ভাইরাসবাহী নয় নিশ্চিত হয়ে জনসমাজে উন্মুক্ত করা যেতো। মনে রাখতে হবে, বিদেশ ফেরত সবাই কিন্তু ভাইরাস বাহক নন। এদের মধ্যে নিতান্তই কম মানুষ নিজের অজ্ঞাতে ভাইরাসের বাহক হয়ে থাকতে পারেন। তাই সবাইকে সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচনা করে বাধ্যতামূলক “প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন” সম্পন্ন করে ভাইরাস বাহকদের আলাদা করা যেতো। কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ক্ষমতা-দাপট কে কেয়ার না করে সোজা কোয়ারেন্টাইন এ পাঠানো যেতো। ক্ষমতাশীল কারো তদবির কোটি মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে রিফিউজ করা যেতো। যাকে বলা যায় “জিরো টলারেন্স।“ অথচ আমরা শিথিল “হোম কোয়ারেন্টাইন” এর উপদেশ দিয়ে নিজ নিজ আবাসে চলে যাবার সুযোগ করে দিয়েছি। বিদেশ ফেরত এসব মানুষ নিজেদের সুস্থ সবল মনে করছে। ভাইরাস তার দেহে বাসা বেঁধে থাকতে পারে একথা ঘুনাক্ষরেও মাথায় আনছে না। ফলাফল, হোম কোয়ারেন্টাইনও তারা যথাযথভাবে মানছে না। তারা দিব্যি মুল জনস্রোতে নিজেদের মিশিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে নজরদারিও যথাযথ নয়। বিশেষ করে নিজ গৃহে পরিবারের সদস্যদের সাথে তার কন্ডাক্ট নজরদারিতে আনার মতো কোন সুযোগই নাই। ফলাফল, খুব নগণ্য সংখ্যক বাহকের মাধ্যমেই কোভিড-১৯ দেশের কোটি কোটি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হবার আশংকা আর সুযোগ করে দিয়েছে।
(2)
একথা মানতে হবে যে, বিদেশ ফেরত এসব প্রবাসীরা কেউ জেনেশুনে ভাইরাস বহন করে নিজ দেশে ফিরছে না। দুর্যোগের কালে প্রিয়জনদের মুখই সবার আগে চোখে ভাসে। নিজেকে সুস্থ সবল মনে করে এই দুর্যোগে নিজ দেশে প্রিয়জনদের পাশে থাকার জন্যই উড়ে আসছে এসব প্রবাসী। নিজেকে আক্রান্ত মনে করলে, দেশের জন্য না হলেও, নিজের স্বজনদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অন্তত দেশমুখো হতো না। স্বস্থানেই নিজেকে অত্মাহুতি দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিতো। যে স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য বিদেশ বিভূঁইয়ে দিনরাত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে উপার্জন করছে, সেই প্রিয় স্বজনদের ক্ষতির কারণ জেনেশুনে কেউ হতে চাইবে না। সরল চিন্তায়, দেশে থাকা প্রিয়জনদের সান্নিধ্য লাভ করতেই তাদের দেশে ফেরা। আমরা কোয়ারেন্টাইনের মাধ্যমে তাদের মধ্যে অজ্ঞাতে লুকিয়ে থাকা ভাইরাস বাহকদের সর্টিং করার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি, এ দায় আমাদের।
সাম্প্রতিক সময়ে আমদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরী হয়েছে যে, বিদেশ ফেরত প্রবাসী মানেই ভাইরাসবাহী। সুস্থ সবল দেখতে হলেও যেনো ভাইরাসে কিলবিল করছে এদের শরীর। এদের দেখলেই সবাই হই হই করে উঠি। নিজ দেশে এরা এখন যেনো অস্পৃশ্য জন। এদের ছায়া মাড়ানো যেনো বিপজ্জনক। বিভিন্ন দোকানপাটের প্রবেশ পথে “বিদেশ ফেরত প্রবেশ নিষেধ” লেখা ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে। কোন কোন ডাক্তারের চেম্বারের দরজায় “বিদেশ ফেরত রোগী দেখা হয় না” এ জাতীয় নির্দেশিকা টানিয়ে দেয়া হচ্ছে। খেলার মাঠে, বন্ধুদের আড্ডায়, সামাজিক অনুষ্ঠানে বিদেশ ফেরত দেখলেই নিজেকে গুটিয়ে নিই। এ অবস্থা দেশে বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য কতটুকু অপমান আর মানসিক পীড়নের কারণ হতে পারে আমরা কি ভেবে দেখছি?
আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশে বিদেশে অবস্থানরত এসব প্রবাসীরা আমাদের কারো নির্ভরতার আশ্রয় বাবা, কারো প্রিয় ভাই, কারো আদরের সন্তান, কারো প্রিয়তম স্বামী। পরিবার পরিজনদের জন্য একটু সূখ-স্বাচ্ছন্দের অন্বেষনের জন্যই তাদের বিদেশ গমন। একাকী বিদেশ বিভূঁইয়ে থেকে, শত কষ্ট স্বীকার করে, হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের বিনিময়ে দেশে থাকা স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে এরা দিনের পর দিন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্বজনদের স্বচ্ছলতার মুখ দেখাচ্ছে। সাথে সাথে এই রেমিট্যান্স দেশের অর্থনইতিক বুনিয়াদকে দাঁড় করাচ্ছে শক্ত ভিতের উপর। বিলাস দ্রব্যের কথা বাদই দিলাম, আমাদের জন্য বিদেশ থেকে পিয়াজ-রসুন, তেল-ডাল ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমদানী করতে যে ফরেন কারেন্সী প্রয়োজন হয়, তার বড় একটা অংশের যোগান দেয় এই রেমিট্যান্স। আমরা যে উন্নয়নশীল দেশের স্বপ্ন দেখছি, তাতে একটা বিরাট অবদান এই প্রবাসীদের রেমিট্যান্স। এসব প্রবাসীদের অধিক রেমিট্যন্স আহরণে উতসাহিত করতে আমাদের সরকার প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর ২% প্রণোদনা দিচ্ছে। যে জনসংখ্যা একসময় আমাদের অভিশাপ ছিলো তাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করছে এসব প্রবাসীরা। এ দুর্যোগকাল এক সময় কেটে যাবে। এরপর দেশে যে অর্থনইতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরী হচ্ছে, সে সময় এ প্রবাসীদেরই হাল ধরতে হবে দেশের অর্থনীতিকে মেরামত করতে।
আসুন, সাময়িক দুর্যোগে আমরা যেনো স্বার্থপর আর অকৃতজ্ঞ না হয়ে যাই। লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশের মাটিতে যেন অহেতুক অবাঞ্ছিত মনে না করি। বিদেশ ফেরত প্রবাসী যাদের দেশে ফেরার ১৪ দিন ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে অথচ কোন উপসর্গ দেখা দেয়নি, তারা ভাইরাস বহন করে আনেনি তা নিশ্চিত হয়ে গেছে। তারা কোয়ারেন্টাইন করুক আর নাই করুক। তাদেরকে আমাদের মতোই স্বাভাবিক মনে করি। আর যেসব বিদেশ ফেরত প্রবাসী ১৪ দিন পার করেননি, তারা দেশের স্বার্থে, পরিবারের স্বার্থে নিজেকে আইসোলেশন করে ১৪ দিন পার করুন। নিজের কাছেই নিজেকে আগে সুস্থ প্রমাণ করুন। “ঘরে থাকা”র কাল শেষ হলে, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেলে আসুন আবার সবাই মিলে একসাথে হাতে হাত মিলাই, কাঁধে কাঁধ মিলাই, বুকে বুক মিলাই। ততদিন আমরা স্বাস্থবিধি মেনে চলি। সবাই সুস্থ থাকি, অন্যকেও সুস্থ রাখি।