করোনার নমুনা সংগ্রহে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে দুই তরুণ

বিশেষ প্রতিনিধি
জালাল উদ্দিন ও জুয়েল আহমদ। সদর হাসপাতালে করোনার নমুনা দিতে গেলেই পাওয়া যায় এই দুই স্বেচ্ছাসেবীকে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে করোনা উপসর্গ নিয়ে আসা শতাধিক রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করছে তারা। এরা হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নয়। ইনস্টিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) থেকে কোর্স সম্পন্ন করে ক্রান্তিকালে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে সিভিল সার্জনের অনুরোধে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে কাজ করছে এই দুই তরুণ।
জালাল উদ্দিন তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরি ইউনিয়নের বড়খলা গ্রামের মুর্শেদ মিয়া ও হামিদা বেগমের ছেলে। সিলেট আইএইচটি থেকে পড়াশুনা শেষ করে বাড়ি ফেরার পর টুকটাক কাজ করতো স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। করোনাকাল শুরু হলে লোকবল সংকটে বিপদে পড়ে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে ৫ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ থাকলেও আছেন মাত্র একজন। এই অবস্থায় করোনার শুরুতেই সুনামগঞ্জ সদরের ২৫০ শয্যা হাসপাতালের নিয়মিত কার্যক্রম এবং উপসর্গধারীদের নমুনা পরীক্ষা নিয়ে বেকায়দায় পড়ে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
পরে হাসপাতালের প্রধান সহকারীর মাধ্যমে জালাল উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে সদর হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার অনুরোধ জানানো হয়। জালাল উদ্দিন পরদিনই সদর হাসপাতালের এসে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগদান করে।
জালাল উদ্দিন বললো, আমি এই সময়টাকে দেশের মানুষের বাঁচার যুদ্ধ হিসাবে দেখছি। পরিবারের পক্ষ থেকে আমি এভাবে এসে কাজ করবো কি-না ভেবে দেখার জন্য বলা হয়েছিল। আমি বলেছি, সবাই ভয় পেলে মানুষের পাশে দাঁড়াবে কে, আল্লাহ্ ভরসা- আমি কাজ করতে চাই। পরে সকলের দোয়া নিয়ে এসে কাজে লেগেছি। নিয়ম অনুযায়ী এক সপ্তাহ্ কাজ করে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নিয়ম থাকলেও লোকবল কম থাকায় ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা যাচ্ছে না। করোনার প্রথম দিকে রোগী কম আসতো, এখন দিনে এক থেকে দেড়শ’ রোগী হয়। এক সপ্তাহ পর পর এসে কাজ করছি। মানুষের বিপদের সময় কাজ করতে পেরে আমি খুশী।
একইভাবে রাজশাহী আইএইচটি থেকে কোর্স সমাপন করে সুনামগঞ্জে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি নিয়েছিলেন জুয়েল আহমদ। নাটোর জেলায় বাড়ি তার।
মো. দুলাল উদ্দিন ও মোছাম্মৎ জোৎ¯œা বেগমের বড় ছেলে জুয়েল আহমদ করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করার কাজ করতে আসায় ভয়ে ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরাও। এখন তারাও উৎসাহিত করছেন।
জুয়েল আহমদ বললেন, সিভিল সার্জন ডা. শামস উদ্দিন তাকে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করার জন্য ডেকে এনেছিলেন। প্রথম প্রথম রোগী কম হতো, কিছু ভয়ও কাজ করতো। এখন প্রতিদিন একটানা ৬-৭ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। ১৫০ জনেরও উপরে রোগীর প্রতিদিন নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। মানুষের বিপদকালে কাজ করতে পেরে জুয়েল আহমদও খুশী।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শামস উদ্দিন বললেন, মেডিকেল টেকনোলিজস্ট না থাকায় জালাল ও জুয়েলকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে এনে দুর্যোগকালে কাজে লাগিয়েছি। স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছে তারা। আমি চিন্তা করেছিলাম আউট সোর্সিংয়ে লোক নেবার সময় তাদের ওখানে কাজে লাগিয়ে দেব। তারা তাতে রাজি হয় নি। আমি কোন পারিশ্রমিকও তাদের দিতে পারি নি। এখন হাসপাতালের তত্বাবধায়ক তাদেরকে সামান্য পারিশ্রমিক স্থানীয়ভাবে দেবার ব্যবস্থা করেছেন।
হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. আনিছুর রহমান বললেন, জালাল ও জুয়েল সরকারি চাকুরি না করেও এই ক্রান্তিকালে সার্ভিস দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করছেন। প্রথম প্রথম আমরা কোন টাকা তাদের দিতে পারি নি। এখন যা দিচ্ছি, সেটাকে দেওয়া বলা যাবে না, খুবই সামান্য টাকা সম্মানী হিসাবে দেওয়া হচ্ছে। আসলে তারা স্বেচ্ছাশ্রমই দিচ্ছেন।