করোনা দুর্যোগ- হালকা মেজাজে চলার উপায় নেই

করোনা দুর্যোগ শুরু হওয়ার তিন মাস অতিক্রান্ত হতে চললো। বাংলাদেশ এখন দুর্যোগের চূড়ায় উঠার সময় অতিক্রম করছে। আক্রান্ত লাখ আর মৃত্যু শ’র ঘর ছাড়ানোর পথে উল্কার গতিতে ছুটে চলেছে। এর মাঝে সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে ৩১ মে থেকে। ছুটিকালে কর্ম হারিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষরা ভীষণ বিপাকে পড়েছিলেন। তারা খাদ্যসংকটের সম্মুখীনও ছিলেন। সে সময় সরকারি ত্রাণ সরবরাহের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনকে পীড়িত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে দেখা গিয়েছিলো। সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ায় এখন এইসব সহায়তা কর্মসূচিতে ভাটা পড়েছে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষগুলোর অভাব কি ঘুচে গেছে সবকিছু খুলে দেয়ার পর? করোনা দুর্যোগের কারণে জাতীয় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। ভবিষ্যতে এই ধস আরও বাড়বে। বিশ্বব্যাপী মানুষের ভোগ করার সক্ষমতা কমে গেছে, আরও কমবে। বিলাসিতার জন্য মানুষের অর্থ ব্যয় হ্রাস পাবে। অনেকেই হাতে কিছু সঞ্চয় রাখতে চাইবেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের মধ্যে এই প্রবণতা বাড়বে। দেশীয় অভ্যন্তীরণ বাজারের মূল ভোক্তা নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত। এর উপরের শ্রেণিটি বাজারের অংশীজন নন। বাজারে ভোক্তা কমে যাওয়ার অর্থ হলো- অনেক কর্মক্ষেত্রের বিলুপ্তি, কর্ম হারানো তথা বেকারত্ব। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাইরের ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের আয় কমবে। অনেক পেশা যেমন- নির্মাণ খাত, বস্ত্র সেলাই, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ছাপাখানা, কমিউনিটি সেন্টার, ফুল ও ডেকোরেশন; এমন অনেক খাত এখন ঝুঁকিতে, এই ঝুঁকি আরও বাড়বে। দিনমজুর শ্রেণিও সংকটাপন্ন। এমত অবস্থায় সবকিছু স্বাভাবিক করে দেয়ার পর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে চিন্তা করাটা হবে অনেক বড় ভ্রান্তি। এখন বহু লোকের আয় বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কত দিন এমন সংকটকাল কাটাতে হবে বলা মুশকিল। তাই সরকার কিংবা সহায়তাদানকারী মানবিক শক্তির স্বস্তি পাওয়ার উপায় নেই।
একটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বড় আকারের সামর্থবান রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের তেমন করে কোনো মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে তৎপর হতে দেখা যায়নি। অথচ বাংলাদেশে এমন সামর্থবান লোকের অভাব নেই। সারা বিশ্বে দ্রুত ধনি হওয়ার তালিকায় সেদিনই বাংলাদেশ প্রথম স্থান অর্জন করেছে। আজ দেশের সংকটকালে কোথায় সেই দ্রুত ধনি হওয়া কুবের সন্তানরা ? এরা সবাই গর্তে ঢুকে গেছে। অতীতে দুর্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দকে সক্রিয় থাকতে দেখলেও এবার এই চিত্র নেই বললেই চলে। রাজনীতি যারা করেন তারা মানুষের কথাই বলেন। এবার কেন তারা মানুষের পাশে নেই? তাহলে কি রাজনীতি নিজস্ব চরিত্র হারিয়েছে? হবে হয়তো। রাজনীতির বাঁক বদল হয়ে গেছে এটি বেশ ভাল করেই বুঝা যায়। রাজনীতির এই অবস্থা একটি দেশের হতশ্রী ও হতাশাজনক পরিস্থিতির পরিচয় বহন করে। কারণ রাজনীতি যদি তার গণমুখী চরিত্র হারিয়ে ফেলে তাহলে তা কখনও ভাল ফলদায়ক হতে পারে না। তাই সব মানুষই রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের নিজের ভাই বন্ধু ও সমব্যথী হিসাবে দেখতে চায়।
সরকার ও মানবিক বোধ সম্পন্ন শক্তিকে তাই সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার হওয়ায় হালকা মেজাজে চলার সুযোগ নেই। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে একটা দীর্ঘসময় সহায়তা জুগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। সেইভাবেই সাজাতে হবে পরিকল্পনা, সরকারি ও বেসরকারি সকল স্তরেই। জাতীয় বাজেটেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে। আগামী কয়েক বছর আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে, রাষ্ট্র ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সকলের।