কর্মগুণে বেঁচে থাকবেন মানুষের অন্তরে

আকরাম উদ্দিন
সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর এলাকার বাসিন্দা এবং শহরের পরিচিত মুখ ডা. সতীশ চন্দ্র দাশ। তিনি সতীশ বাবু নামে পরিচিত ছিলেন। শুক্রবার সকালে উনার পরলোকগমনের সংবাদ পেয়ে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। কারণ চলতি বছরের প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব না পাওয়ার বিষয়ে একাধিক বার বাসায় গিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। এ সময় উপলদ্ধি করেছি, তিনি অত্যন্ত ন¤্র, ভদ্র, সরল প্রাণ একজন সাদা মনের মানুষ। বয়সের ভারে ন্যূব্জ। শরীরে বাসা বেঁধেছে অনেক রোগে। শরীর কাঁপছে। তবুও মানুষের প্রতি মনের যে ভালবাসার আবেগ তা কখনও কমেনি।
আমি বাসায় এসেছি জেনে তিনি বিছানা থেকে উঠে ভাল জামা-কাপড় পরে বসে ছিলেন। আমার নাম পরিচয় জানালে, ভাল শ্রবণ শক্তি থাকায় তিনি আমাকে চিনতেও পেরেছিলেন। কারণ আমার বাবা-চাচাদের সাথেও ভাল সম্পর্ক ছিল।
ডা: সতীশ চন্দ্র দাশ ছিলেন নির্লোভ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। চিকিৎসা সেবা প্রদানেও থাকতেন সদা হাস্যোজ্জল। তাঁর কাছে আসা অনেক রোগী ভিজিটও দিতেন না। বলতেন কাকা আসি। তিনি বরং বলে দিতেন ভাল করে ওষুধ সেবন করবে, কি হয় পরে জানাবে। এই রোগী বা অভিভাবক পরবর্তীতে এসে রোগ মুক্তির কথা জানাতেন, কিন্তু ভিজিটের কথা একাবারও বলতেন না। এরপরও তৃপ্তি পেতেন। যা হউক রোগ থেকে মুক্তি পেয়ে বলে তো গেলো। এই জন্য ডা: সতীশ চন্দ্র দাশের মতো একই সময়ে আরও যারা চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন তাদের সাথে মানুষের মনের সম্পর্ক ছিল গভীর থেকে। এসব চিকিৎসক হারিয়ে গেলেও মানুষের হৃদয়ে ঠিকই বেঁচে থাকবেন তাঁদের কর্মগুণে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় এক প্রশ্নের জবাবে ডা: সতীশ চন্দ্র দাশ বলেছিলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে ভারতের বালাট ক্যাম্পের অস্থায়ী চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। একই সাথে শত শত শরণার্থীদেরও চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। একই সাথে ১ কিলোমিটার দূরে মইলাম অস্থায়ী হাসপাতালেও চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন তিনি। ওই সময় ৫ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী বা সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর মোতালিবের কাছ থেকে কোনো সনদ গ্রহণ করেন নি তিনি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত ২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির ৭ জনের স্বাক্ষরিত তালিকায় ৩৩ নম্বরে আমার নাম অন্তর্ভূক্ত হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকায় আমার নাম অন্তর্ভূক্ত হয়নি।
তিনি আরও বলেছিলেন, আমি সততা ও নিষ্ঠার সাথে সারা জীবন চিকিৎসা সেবা দিয়েছি মানুষকে। আমার পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এই পেশার কোনো অসম্মান হয়নি। আমি টাকার লোভে ডাক্তারী পেশায় আসি নি। মানুষের কল্যাণে কাজ করেছি। আমি যেভাবে হউক মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতেও চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। এখন রাষ্ট্র যদি আমাকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ না দেয়, তো কিছুই করার নেই। তবে জীবদ্দশায় আমার আকাঙ্খা থেকেই যাবে।
এখনও মনে পড়ে, সেই ছোট বেলায় অসুস্থ হলে বাবা আমাকে নিয়ে আসতেন ডা: সতীশ চন্দ্র দাশের কাছে। এখনও কালীবাড়ি পয়েন্টে আসলে এই চেম্বারের কথা মনে পড়ে। আমি ডা: সতীশ চন্দ্র দাশের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
লেখক-সাংবাদিক ও গল্পকার।