কেন নেই সংস্কৃতি ও ক্রীড়া চর্চার বেসরকারি উদ্যোগ?

খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার বিষয়গুলো এখন একেবারেই প্রশাসন বা সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে গেছে। আগে যেমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ক্রীড়া ও সংস্কৃতিচর্চায় মুখরিত থাকত এখন সেরকম দৃশ্য একেবারেই অদৃশ্য। এখন শুধু সেইসব সাংস্কৃতিক আয়োজনই হয়ে থাকে, যেগুলো হয় সরকারের কর্মসূচী দ্বারা নির্ধারিত নয় যেখানে স্থানীয় প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। এখন কোনো খেলাধুলার আয়োজন হয় না সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত। কিছুদিন আগে এই শহরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একদিনের একটি কুস্তি প্রতিযোগিতা হয়ে গেল। দেখা গেল, ওই প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে স্বতস্ফূর্তভাবে গ্রামগঞ্জের মানুষ ছুটে এসেছেন শহরে। পুরো স্টেডিয়াম ছিল লোকে লোকারণ্য। কুস্তি প্রতিযোগিতা দেখতে আসা এই লোকসমাগম দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, খেলাধুলার প্রতি এখনও মানুষের প্রচ- আগ্রহ রয়েছে। শুধু হয় না বলেই মানুষ এখন খেলার নির্মল বিনোদন থেকে বঞ্চিত। কয়েক বছর আগে সরকারি উদ্যোগে বেশ কয়েকটি সফল সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়েছিল। জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এমন একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের নামকরা লোকসংস্কৃতি শিল্পী ও গবেষক কালিকাপ্রসাদ। ওই অনুষ্ঠান উপভোগ করতে সে রাত পুরো মাঠ ছিল লোকে লোকারণ্য। ওই অনুষ্ঠানের পর জেলা শিল্পকলা একাডেমী বা জেলা প্রশাসন বড় আকারের সাংস্কৃতিক আয়োজন করা থেকে বিরত রয়েছেন। এখন কিছু অনুষ্ঠান হয় শিল্পকলার মিলনায়তনে। মিলনায়তনের দর্শক নির্দিষ্ট ও সীমিত। এসব আয়োজন সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতে অক্ষম অথবা এসব আয়োজন মূলত সাধারণের জন্য অদৃশ্যভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। অথচ কোনো উপলক্ষে খোলা স্থানে যখন ছোট আকারে হলেও সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়, আমরা দেখেছি সেসব অনুষ্ঠান দর্শক শূন্য থাকে না। এই শহরের কয়েকটি নাট্যসংগঠন মাঝে মধ্যে কিছু পথনাটকের আয়োজন করে থাকে তাদের সাধ্যমত। মানুষ এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করে। এই যে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি থেকে ব্যক্তিগত আগ্রহ হারিয়ে গেল এর পিছনে কারণ কী? কেন সবকিছুর জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী থাকছেন আমাদের সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সংগঠকরা? এর উত্তর খোঁজা দরকার। দরকার আমাদের মননশীলতার জায়গাটিকে সমৃদ্ধ করার জন্য। আমরা কি অযোগ্য হয়ে উঠেছি এমন আয়োজন করতে? বাস্তবতা তেমনটাই প্রমাণ করে যা মূলত আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়ই বটে।
মানুষ বেঁচে থাকতে চায় আনন্দের সাথে। মানুষ সৃজনশীল প্রাণী। তাই নিত্যনতুন সৃজনশীলতার মধ্যেই মানুষ সুখ খুঁজে পায়। মানব সভ্যতায় নৃত্যকলা, খেলাধুলা বা সাহিত্য চর্চার আগমন মানুষের আনন্দমুখর বেঁচে থাকার অনুঘটক হয়েই। নতুবা শুধু খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমেই মানুষ বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে পারত। যদি তাই হত তাহলে মানুষ আর অবোধ পশুর মধ্যে কোনো তফাত করা দুরুহ হয়ে উঠত। সংস্কৃতি ও ক্রীড়াচর্চা মানুষের মগজ ও শরীরকে উদ্দীপ্ত রাখে। তাকে আরও নতুন কিছুর অনুসন্ধানে নিয়োজিত হওয়ার অনুপ্রেরণা জুগায়। মানুষের মনকে শান্ত, দৃঢ়, পবিত্র, নির্মল ও প্রাগ্রসর রাখার জন্যই দরকার এসব চর্চা। তাই সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই আমরা মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোর চর্চা দেখে আসছি। এ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার অর্থ হলো, আমরা আর এগোতে চাই না। অথচ মানুষের ইতিহাস হলো ক্রমাগত অগ্রগতির ইতিহাস। থেমে থাকার নাম হলো মৃত্যুর নামান্তর। নিজেকে মরার আগে মৃতবৎ করে রাখার এমন প্রয়াসের বিরুদ্ধে জাগরণ ভীষণ ভীষণ জরুরি।
তাই যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রের দিকপাল সেইসব সংস্কৃতি-সাহিত্য-ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের প্রতি আমাদের আহ্বান নিজেদের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটান। সরকার যা করছে করুক। আপনারাও কিছু করে দেখান। সত্যিকার জাগরণ তৈরি করুন এই জনপদে। তবেই না দূর হবে সমাজের কলুষতা। দরোজা-জানালা সবকিছু বন্ধ রেখে অন্ধ হতে বারণ করবেন এমন অবাস্তব কল্পনা থেকে বেরিয়ে আসুন।