কোন্দল সৃষ্টি করলে দলীয় মনোনয়ন নয়: প্রধানমন্ত্রী

সু.খবর ডেস্ক
দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলাদলিতে জড়ালে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বদলে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে দুর্নীতি-অনিয়মে জড়ালে, দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করলে পরবর্তী সময়ে তাদের আর দলের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হলেও পরের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না তারা।

গতকাল শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজ অব্যাহত রাখার জন্যও দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ সময় দলাদলি ও কোন্দল সৃষ্টি করলে নেতাদের দলীয় পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে বলে সাফ জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, যে কোনো মূল্যে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে। কোনোরকম দ্বন্দ্ব ও কোন্দলে জড়ানো যাবে না। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। দ্বন্দ্ব-কোন্দলে লিপ্ত হলে দলীয় পদ-পদবিতে থাকতে পারবেন না। এ প্রসঙ্গে দলের নরসিংদী ও সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতি দিয়ে অন্যদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেন শেখ হাসিনা।

দেশের ২৫টি পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করতে ডাকা এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শেখ হাসিনা। পরে দলের পক্ষ থেকে ঘোষিত ২৫টি পৌরসভার দলীয় মেয়র প্রার্থী তালিকা বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থী মনোনয়নে প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারিরই প্রতিফলন ঘটেছে। ২৫টি পৌরসভার মধ্যে ৯টিতে বর্তমান মেয়ররা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন। তাদের স্থলে নতুন প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি পৌরসভায় আগের প্রার্থীও বদলে নতুন প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।

বৈঠক সূত্র আরও জানায়, ২৫টি পৌরসভার দলীয় মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে দলের সাংগঠনিক বিষয়, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন ও করোনাভাইরাস মোকাবিলার বিষয়ে নেতাদের বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। পৌরসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকার ও অন্য নির্বাচনগুলোতে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের ত্যাগী ও দক্ষ নেতারাই দলীয় মনোনয়ন পাবেন। আগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতি-অনিয়মে জড়ালে পরবর্তী সময়ে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না।

তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে অনেক নেতাই জিতে আসেন। পরের নির্বাচনে তারা দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীও হলেও বাদ পড়বেন। এসব কারণে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নির্বাচনে আগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বদলে নতুন প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। এই ধারা আগামীতেও অব্যাহত রাখা হবে।

দল মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য নেতাদের নির্দেশ দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, দল থেকে যাকেই প্রার্থী করা হোক না কেন, তাকেই বিজয়ী করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রেও কোনো রকম দলাদলি করা যাবে না।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ বিষয়ে সতর্ক করে এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বলেন, অতীতের মতোই আগামীতেও কভিড-১৯ মোকাবিলা ও মানুষের জান-মাল রক্ষায় নিজেরা সচেতন থেকে জনগণকেও সচেতন করে তুলতে হবে। সবাই মিলে সচেষ্ট থাকলে নিশ্চয়ই এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে।

বৈঠকে উপস্থিত একজন নেতা জানান, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে দলে বিদ্রোহী প্রার্থী দেখতে চায় না আওয়ামী লীগ। শুধু বিদ্রোহীই নয়, নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থীর বাইরে দলীয় অন্য প্রার্থীর ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বৈঠকে মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফর উল্লাহ, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ।

বর্তমান যেসব মেয়র বাদ পড়লেন: রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান মেয়র পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি উত্তম কুমার সাহা দলীয় মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েছেন। তার বদলে এবার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হক চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রাম পৌরসভার বর্তমান মেয়র আওয়ামী লীগের সাবেক পৌর শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের বদলে এবার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজিউল ইসলাম।

পাবনার চাটমোহর পৌরসভায় গত নির্বাচনের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র মির্জা রেজাউল করিম দুলালকে এবারও দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন সাখো। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে বর্তমান মেয়র হালিমুল হক মিরুর বদলে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা মনির আক্তার খান তরু লোদীকে। কুষ্টিয়ার খোকসায় দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক আল মাছুম মুর্শেদকে। বাদ পড়েছেন বর্তমান মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারিক। চুয়াডাঙ্গা পৌরসভায় বাদ পড়েছেন বর্তমান মেয়র জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক ওবায়দুল রহমান চৌধুরী। সেখানে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাই রিয়াজুল ইসলাম জোয়ারর্দার।

মানিকগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন বর্তমান মেয়র জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গাজী কামরুল হুদা সেলিম। এবারও তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রমজান আলীকে। গত নির্বাচনেও দল থেকে তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে বাদ পড়েছেন বর্তমান মেয়র উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ মিয়া। এই পৌরসভায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বিশ্বজিৎ রায়কে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে বর্তমান মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছালেক মিয়া বাদ পড়েছেন। তার জায়গায় এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও প্যানেল মেয়র মাসুদউজ্জামান মাসুককে।
সূত্র : সমকাল