গৃহপালিত প্রাণিদের মর্মান্তিক দুঃসময়

বিশেষ প্রতিনিধি
চার মেয়ে ও স্বামী-স্ত্রী মিলে সকালে ত্রাণের প্যাকেটে পাওয়া চিড়া, গুড় খেয়েছিলেন সুনামগঞ্জ শহরতলির হাছনবসত গ্রামের ইউসুফ আলী ও সুফিয়া বেগম। কিন্তু ছয় গরু ও দুই বাছুরকে কিছুই খেতে দিতে না পারায় দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন সুফিয়া। স্বামী ইউসুফ গরু’র খাবারের সন্ধানে বের হয়ে বেলা দুইটা পর্যন্ত না ফিরায় তার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে পথেই বেঁধে রাখা গরুর পাশে দাঁড়িয়ে হা-হুতাশ করছিলেন সুফিয়া। স্বামী ইউসুফ আলীকে দেখেই বলছিলেন, ‘তুমি একডা মানুষ, ছয়টা গরু না খাইয়া আছে, তুমি গিয়া হইরা (সরে) বইয়া (বসে) আছো’। স্বামীর ইউসুফ আলীর উত্তর, ‘কি করবো, অনেকের কাছে হাত পাতছি গরুর খাবারের টাহার লাগি, পাইলাম না।’
ইউসুফ আলী ও সুফিয়া বেগম’এর মতো শহরতলির কালীপুর ও হাছনবসত গ্রামের কমপক্ষে ৫০০ পরিবারের পুরুষ ও নারী সদস্যরা এখন কেবল নিজেদের খাবার নয়, গরুর খাবারের জন্যও হন্যে হয়ে এর কাছে, ওর কাছে যাচ্ছেন।
দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণকারী গ্রামের মো. জালাল উদ্দিন ও মর্জিনা বেগম এর অবস্থা আরও খারাপ। দুই গাভীসহ পাঁচ গরু’র খাবার জোগাতে কোন পথই পাচ্ছেন না তাঁরা। মর্জিনা বেগম জানালেন, হাঁস ও গরু পালন করেই জীবিকা তাদের। সাড়ে তিন’শ হাঁস ভেসে গেছে। গরু’র খাবারের পচা খড় ঘরের টিনের ছালে শুকিয়ে গরুকে খাওয়ানোয়, অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে গরুগুলো। এখন কোথায় ওষুধ পাবেন, কি করবেন, বুঝতেই পারছেন না তারা। গরুগুলো বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।
পাশে দাঁড়ানো জালাল উদ্দিনের বড় ভাই আলা উদ্দিন বললেন, ত্রাণের কিছু চাল-ডাল পাওয়ায় কোন রকমে আমাদের জীবন রক্ষা হচ্ছে। গরুগুলোর মুখের দিকে থাকালে বড় বেশি কষ্ট হয়, ওরা আমাদের দিকে চেয়ে থাকে। কিচ্ছু করতে পারছি না।
গ্রামের নুরুজ্জামানের স্ত্রী সুহেনা পারভিন বললেন, দুইদিন খুঁটে খুঁটে গিয়ে কোনভাবে পশ্চিমের বন্দ থেকে কিছু কচুরিপানা এনে তিনটি গরুকে দিয়েছি, তাতে গরু’র পেটের এক কোণাও ভরবে না, কোনভাবে প্রাণরক্ষা হবে গরুগুলোর, এভাবে গরু বাঁচানো যাবে না।
গ্রামের আব্দুল হাসিম বললেন, গ্রামের অন্যদের মতো আমার গরুগুলোও মসজিদের দু’তলায় ওঠিয়েছিলাম, আমাদের মতো গরুকেও কেবল গরম পানি করে খাইয়েছি, এখন ত্রাণ পাওয়ায় আমরা কিছুটা খাচ্ছি, ওদেরকে (গরুদের) পচা খড় দেওয়ায় পেট খারাপ হচ্ছে, কিছুই করতে পারছি না। পশু হাসপাতাল থেকে একজন এসেছিলেন, নাম লিখে নিয়েছেন, আর কোন যোগাযোগ করেন নি। গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বন্যার সময় স্থানান্তরিত করা (উঁচু এলাকায় নিয়ে যাওয়া) ও অসুখ-বিসুখে ১০ টির মতো গরু এবং বেশ কয়েকটি ছাগল মারা গেছে।

মারা গেছে তিন লাখ ৮৭ হাজার গৃহপালিত প্রাণি। পচা খড় খেয়ে পেট খারাপ হাজারো গরু’র, কমপক্ষে আট লাখ গরু বিপন্ন।


কেবল হাছনবসত ও কালীপুরের বন্যার্তদের গবাধিপশুর এমন করুণ অবস্থা নয়। জেলাজুড়ে কথা বলতে না পারা প্রাণিদের মর্মান্তিক দুঃসময় কাটছে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার বাসিন্দা কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বললেন, জেলার দুই হাজার ৮৮৭ গ্রামের কমপক্ষে দুই হাজার গ্রাম বন্যায় ডুবেছে। একটি গ্রামে চার’শ গরু থাকলেও জেলাজুড়ে আট লাখ গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বাজারে গো-খাদ্য হিসেবে পরিচিত ভূষির দাম ৫০ কেজির বস্তা ১২ শ’ টাকা থেকে ১৯৫০ টাকা হয়েছে। খড় ও কুড়া পাওয়াই যাচ্ছে না। এই অবস্থায় গরু নিয়ে বিপন্ন কয়েক লাখ বন্যা দুর্গত পরিবার। একই ধরণের মন্তব্য করে কৃষি ও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বললেন, কৃষকের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন নিয়ে চিন্তাই করা হচ্ছে না, এটি বড় বিপর্যয় তৈরি করবে।
জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান দাবি করলেন, বন্যার সময় প্রত্যেক উপজেলায় প্রাণি সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের দিয়ে একটি করে মেডিকেল টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তারা মাঠে কাজ করছে। এখনো পর্যন্ত তারা কোন পশু খাদ্য বিতরণ করতে পারেন নি জানিয়ে বললেন, তাদের কাছে আজ কালের মধ্যেই ৬৮ হাজার ৫০০ কেজি পশুখাদ্য পৌঁছাবে। উপজেলায় উপজেলায় তারা দ্রুত সেগুলো পৌঁছাবেন। তিনি জানান, শতাব্দির ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জে ৪২২ টি গরু, ৩৭ মহিষসহ তিন লাখ ৮৭ হাজার ৫২৮ গ্রহপালিত প্রাণির মৃত্যু ঘটেছে।