গৌরারং জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে অগ্রগতি নেই

বিশেষ প্রতিনিধি
দুই বছর আগে সুনামগঞ্জের গৌরারং জমিদার বাড়িকে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জমিদার বাড়ি’র জরিপ কাজ উদ্বোধন করে ২০১৯’এর ১৫ মে জেলার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার জরিপের সূচনা করেছিলেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার। ইতিমধ্যে জেলার দুটি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা তাহিরপুরের লাউর রাজ্যের রাজধানীর হলহলিয়া রাজবাড়ি ও পাইলগাঁওয়ের জমিদার বাড়ি সংরক্ষণ করেছে সরকার। কিন্তু সুনামগঞ্জ শহরতলির এই বিশাল নিদর্শন সংরক্ষণে কোন অগ্রগতি নেই। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা এই বিষয়ে নতুন কিছু জানাতেও পারেন নি।
সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর আব্দুজ জহুর সেতু পার হয়ে হাতের বাম দিকে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের ৩ কিলোমিটার যেতেই ২শ বছরের পুরনো এই জমিদার বাড়ি । ১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা বন্ধ হওয়ার পর এখন তা কেবলই অতীত।
১৮০০ সালের শুরুর দিকে জমিদার রাজেন্দ্র কুমার চৌধুরী ও রাকেশ রঞ্জন চৌধুরী গৌরারং জমিদারির শাসন করতেন। এরপর সময়ের পরিবর্তনের সাথে তাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে নগেন্দ্র কুমার চৌধুরীর হাত ধরে জামিদারী বিস্তৃতি লাভ করে । তাঁর পুত্র নিরঞ্জন চৌধুরী। কয়েক বছর আগে তিনিও মারা গেছেন। নিরঞ্জন চৌধুরীর পরিবারের মধ্যে ছেলে অঞ্জন চৌধুরী বর্তমানে সুনামগঞ্জ পৌরসভায় কর্মরত।
২শ বছরের পুরনো হলেও গৌরারং জমিদার বাড়ির অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে রয়েছে ৬ টি আলাদা ভবন , রংমহলের দেওয়ালে নর-নারী লতাপাতার ছবি, অন্দর মহল, সিংহাসন, জলসা ঘর, আজও পরিদর্শন করতে আসা মানুষকে আকৃষ্ট করে ।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক’এর) জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আইনুল ইসলাম বাবলু বলেন, গৌরারং জমিদার বাড়ির পাশে তিনটি দিঘি, দুটি মন্দির, একটি প্রধান ফটক, হাতিশালা-শ্মশানঘাট, রানীর গোসলখানা আগের মতোই রয়েছে, অন্যান্য অঞ্চলে এ ধরণের পুরাকীর্তি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে অক্ষত অবস্থায় রয়েছে দৃষ্টিননন্দন নির্মাণশৈলী। কমপ্লেক্সের ভেতরে কোন জনবসতিও নেই। এটি সুনামগঞ্জের প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর হতে পারে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রত্নবস্তু এই স্থানে সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা গেলে ইতহাস ঐতিহ্য রক্ষা পাবে। এসডিজি বাস্তবায়নের সঙ্গেও সম্পৃক্ত হবে। একই ধরণের মন্তব্য করলেন জেলার জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যম কর্মী খলিল রহমান ও শামস শামীম।
গৌরারং জমিদার বাড়ি ১৯৮১-৮২ সালে বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন স্থানীয় নৃপেন্দ্র চক্রবর্তী।
তাঁর ছেলে বিজিত চক্রবর্তী বললেন, আমরা ১৯৮১-৮২ সাল থেকে এই বাড়ির খাজনা প্রদান করে আসছি। ২০১৯ সালে আমাদের জানানো হলো এই বাড়ি সরকারিভাবে পূরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে এখানকার জরিপ কার্যক্রমও শুরু করলো। পরে আর কিছুই জানানো হয় নি।
স্থানীয়রা জানান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান, কুমিল্লার শালবন বিহারের ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান ড. আহমেদ আবদুল্লাহ্, ময়নামতি জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান মো. হাফিজুর রহমান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক অফিসের সিনিয়র ড্রাফটসম্যান মো. সিরাজুল ইসলামসহ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা কয়েকবার সুনামগঞ্জের গৌরারং জমিদার বাড়ি পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু ২ বছরের বেশি সময় পার হলেও এই বিষয়ে কোন অগ্রগতি নেই।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান এই প্রসঙ্গে বললেন, গৌরারং জমিদার বাড়ি সংরক্ষণের প্রস্তাবনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আমরা নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি। তিনি এই বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বলে জানান।