গ্রামে এখন কার্তিকের আকাল

বিশেষ প্রতিনিধি
‘আট দিনে একবার বাইচ্চাগুনরে মাছ খাওয়াইতাম পারি না, ভাতের সাথে কচু, লতা, সবজি, আলু ভর্তা খাওয়ানি ছাড়া উপায় নাই। অখনতো এলাকাত কাম নাই। ভোর ছয়টায় উইট্টা আইট্টা টাউনো যাইন। কাম পাইলে চাউল-পাত লইয়া আইন, নাইলে আবার আইট্টা বাড়িত আইন। মাসে ১৫ দিন কাম পাওয়া যায়। ই-টেকায় সংসার চালানির কোন উপায় নাই। কার্তিক মাস না গেলে অভাব দূর অইতোনায়। আগন (অগ্রহায়ণ) মাস আইলে অভাব কিছু দূর অইবো।’
সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সরদাবাজ গ্রামের রেখা রানী দাস কার্তিকের অভাবের করাল থাবা এভাবেই বুঝাচ্ছিলেন।
এই গ্রামের ৪০ বছর বয়সী যুবক বিন্দু রঞ্জন দাস বললেন, ‘পাঁচ টেকা সুদে ছয় হাজার টেকা আনছিলাম। বাছুরের বাদলা রোগ অওয়ায় ঔষুধে গেছেগি ১৯০০ টেকা। বাইচ্চা ও বাইচ্ছার মার অসুখ অইছিল ডাক্তার দেখাইলাম, আরও কিছু খরচাপাতি কইরা, অখন হাত খালি, আরেকবার ঋণ করতাম অইবো, সরকারের দেওয়া ১৫ টেকা কেজির চাউল না পাইলে আনা খাইয়া (না খেয়ে) মরা লাগলোনে। কেমনে যে কার্তিক মাস যাইতো, আগন (অগ্রহায়ণ) মাস আইতো। আগন মাস আইলে উজানেদি ধান কাটাত যাইমু, ঔ আশায় আছি।’
জেলার গ্রামাঞ্চলে এবার কার্তিকের আকাল আছে। করোনা ও ভয়াবহ বন্যার পর আসা কার্তিক মাসে অভাবের করাল থাবা আছে গ্রামাঞ্চলে। এরমধ্যে নিত্যপণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ‘মরার উপর খারার ঘা’ এর অবস্থা হতদরিদ্র পরিবারগুলোর।
সম্প্রতি সকাল থেকে দিনভর সরদাবাজ গ্রাম ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বয়োজ্যেষ্ঠ রবীন্দ্র দাস জানালেন, গ্রামের ৬০ পরিবারের মধ্যে ১০ পরিবারে অভাবের কষ্ট। ৩০ পরিবারের কোনভাবে দু’বেলা খেয়ে টানাপোড়নে চলছে। ১০ পরিবারের চলার মতো অবস্থা আছে।
হতদরিদ্র পরিবারগুলোর একটি বিকাশ দাশ ও রেখা রানী দাসের পরিবার। চার মেয়ে ও এক ছেলে এই দম্পত্তির। মেয়ে দুটি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ও সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে বিএ পড়ছে। আরেক মেয়েকে অভাবের তাড়নায় জেলার দোয়ারাবাজারে মামার বাড়িতে পাঠিয়েছেন তারা। ওই মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছেলেটি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনার খরচ ছাড়াও মেয়েগুলোর কলেজে যাতায়াতে প্রতিদিন লাগে ১০০ টাকা। দিনমজুর বিকাশ দাস একাই সংসারের ঘানি টানেন। প্রতিদিন ভোরে সাত মাইল হেঁটে কাজের সন্ধানে শহরে ছুটেন তিনি।
বিকাশ দাসের স্ত্রী রেখা রানী দাস জানালেন, কার্তিক মাসে এলাকায় কাজ নেই। শহরে গিয়ে অনেকদিন কাজ পান, অনেক দিন পান না। গত এক মাসে ১৫ দিনের বেশি কাজ পান নি তার স্বামী। নিত্যপণ্যের উর্ধ্বগতির এই বাজারে চাল আনলে, তেল আনতে পারেন না। মেয়েগুলো পড়াশুনায় ভালো, কিন্তু ভাড়ার টাকা না পাওয়ায় কালে-ভদ্রে কলেজে যায় তারা। তিনি জানালেন, গত ৮ দিনের মধ্যে তার চুলোয় মাছ রান্না হয় নি।
গ্রামের দিনমজুর দম্পত্তি বিন্দু রঞ্জন দাস ও দীপন দাসেরও একই অবস্থা। ভাদ্র-আশ^ীন মাসে এলাকায় ক্ষেতের কাজ করে সংসার চালিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করেছিলেন বিন্দু। কার্তিক মাসে এই টাকা খরচ করে আরও ছয় হাজার টাকা প্রতিমাসে শতকরা পাঁচ টাকা সুদে ঋণ করেছেন। সেই টাকাও শেষ প্রায়। অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত কিভাবে চলবেন সেই দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। গ্রামের সুহেল দাস ও বাসনা রানী দাসের অবস্থাও একইরকম প্রায়।
গ্রামের সোনাফর আলী ও সফিকা বেগমের ছেলে রুবেল মিয়া জানালেন, তিনি একটি রেস্তোরায় আট হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন। সাত জনের সংসার এক বস্তা চাল কিনতে লাগছে ২৫০০ টাকা, তেল-মরিচসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য কিনতে ৩৫০০ টাকা, কর্মস্থলে যাতায়াত খরচসহ তার নিজের খরচ আরও ১৫০০ টাকা। এরপরে আর কোন টাকাই থাকে না। বৃহস্পতিবার রাতে ছেলেটি অসুস্থ্য হয়েছিল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার টাকাও তার কাছে ছিল না। পরে গ্রামের ফার্মেসী থেকে বাকীতে ৩০০ টাকার ওষুধ এনেছেন তিনি।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সফিকুল ইসলাম জানালেন, কার্তিক মাসে অভাব হয় প্রতি বছরই। অভাবগ্রস্ত অনেক পরিবারই ১৫ টাকার কেজির চাল পাচ্ছে। সরকারি বেসরকারি নানা সহায়তাও বন্যার পরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কিছু কিছু পরিবার এবার আরও বেশি বিপদে পড়েছে। ওয়ার্ডের ৬ টি ছোট ছোট গ্রামের অন্তত ৬০ টি পরিবার বেশি বিপদে আছে।