‘ঘর লেপে দুয়ারে কাদা’

গোলাম সরোয়ার লিটন
মেঘালয় সীমান্ত সংলগ্ন তাহিরপুর উপজেলাটির চারপাশে হাওরের জল। মাঝখানে উপজেলা পরিষদ আর পরিষদ সংলগ্ন তিন কিলোমিটার এলাকায় লোকজনের বসতি। দূর থেকে মনে হয় পানির ওপর ভেসে আছে একখন্ড ভূমি। অপরূপ সে দৃশ্য। উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন মাটিয়ান হাওরে নৌকায় বসে পানির ওপর ভেসে থাকা গ্রাম আর মেঘালয় পাহাড়ের দৃশ্য অসাধারণ। পর্যটকরা এই দৃশ্যকে স্বর্গীয় বলে মন্তব্য করেন। মন ভোলানো এ দৃশ্য দেখতেই লোকজন ছুটে আসেন তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত হাওরগুলোতে। টাঙ্গুয়ার হাওরসহ চব্বিশটি হাওর রয়েছে উপজেলায়। তবে নৌকা থেকে নেমে হাওরপাড়ের সড়ক দিয়ে হাঁটতে গেলেই ধ্যান ভেঙে যায়, কাদা আর ময়লা পানিতে সব একাকার হয়ে পড়ে। সদরের তিন কিলোমিটার সড়ক দুই যুগ ধরে ভাঙা থাকলেও মেরামতের উদ্যোগ নেই। স্থানীয় বাসীন্দাদের দাবি উপজেলার অভ্যন্তরীণ তিন কিলোমিটার সড়ক দ্রুত পুণ:নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তারা মিয়া বলেন, এই সরকারের সময়ে তাহিরপুরের সাথে জেলা শহরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। শত কোটি টাকা ব্যয়ে যাদুকাটায় সেতুর কাজ শেষ হতে চলেছে। উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন বৌলাই নদীতে সেতু নির্মিত হয়েছে। বাগলীতে সেতু নির্মিত হয়েছে। পাটলাই নদীর ড্রাম্পের বাজারে সেতুর নির্মাণ কাজ চলছে। কিন্তু উপজেলার অভ্যন্তরীণ তিন কিলোমিটার সড়কের কারণে যুগ যুগ ধরে দুর্ভোগে আছি আমরা।
জানা যায়, ২০০৯ সালে তাহিরপুরের সাথে জেলা শহরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এ সড়কপথ দিয়ে সুনামগঞ্জের পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দারা ছাড়াও নেত্রকোণা জেলার হাওরাঞ্চলের একাংশের মানুষ সুনামগঞ্জে যাতায়াত করে থাকেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর বেহাল অবস্থার কারণে দুর্ভোগে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ, বাজার ও ইউনিয়ন পরিষদের যাতায়াতে লোকজন ও ছাত্রছাত্রীদের ময়লা কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। বৃষ্টির দিনে চলাচল আরো কষ্টকর হয়ে ওঠে।
স্থানীয় মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হোসাইন আহমদ তৌফিক বলেন, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় পাশাপাশি অবস্থিত। বিদ্যালয় দুটোতে যাতায়াতে ছাত্রছাত্রীদের কাপড় ময়লা ও কাদায় একাকার হয়ে যায়।
জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি জাবির আহমদ জাবেদ বলেন, তাহিরপুরের সাথে জেলা শহরের যোগাযোগ্য ব্যবস্থা ভালো। উপজেলা সদরের অভ্যন্তরীণ সড়ক সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটার হবে। এই পথগুলো দিয়ে হেঁটে চলাচলও কঠিন। এ যেন ‘ঘর লেপে দুয়ারে কাদা’।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন টিএন্ডটি অফিস থেকে পশ্চিমে গোবিন্দশ্রী পর্যন্ত দুই কিলোমিটার সড়ক। এই দুই কিলোমিটার সড়কের এক কিলোমিটারের মধ্যে তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় অবস্থিত। তাহিরপুর-গোবিন্দশ্রী সড়কটির দক্ষিণ পাশে শনির হাওর আর উত্তর পাশে বৌলাই নদী ও মাটিয়ান হাওর। ২৪ বছর আগে ভাঙন থেকে সড়কটিকে রক্ষায় ঢেউরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এখনো সড়কটি যানচলাচলের উপযোগী করে নির্মাণ করা হয় নি। যদিও এ সড়কের ভাটি তাহিরপুর এলাকায় দুইশ ফুট অংশে ঢেউরক্ষা দেয়াল নির্মাণ অসম্পূর্ণ আছে। হেমন্তে এ সড়কটি ব্যবহার করে উপজেলার পশ্চিমাঞ্চল ছাড়াও জেলার মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলার বাসিন্দারাও যাতায়াত করে থাকেন। আবার এই সড়কটির টিএন্ডটির পর থেকে ভাটি তাহিরপুর কালীমন্দির পর্যন্ত ১৫০ মিটার সড়ক হাওরের দিকে ঢালু হওয়ায় হেঁটে চলাচলে শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও এলাকাবাসী প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন আওয়ামীলীগ কার্যালয় থেকে পূর্বদিকে রায়পাড়া রমেশ বর্মণের বাড়ি পর্যন্ত ৫০০ মিটার সড়ক। এই সড়ক সংস্কারের অভাবে চলাচল অনুপযোগি। বর্ষায় কাদা আর ময়লা পানির জন্য হেঁেট চলাও কঠিন। উপজেলা পরিষদের প্রবেশমুখের সড়ক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনের সড়কও ভাঙাচোরা। দুই যুগ ধরে সংস্কার নেই। উপজেলা সদরের বাজারসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে উপজেলা কৃষি অফিসের সামনের সড়ক পথকেই বেছে নেন স্থানীয়রা। সংস্কারের অভাবে পুরোটা সড়কজুড়েই গর্ত। এ সকল গর্ত পানি আর ময়লায় একাকার হয়ে আছে। গত ৮ বছর ধরে সংস্কারের অভাবে এই পথ চলাচলের উপযোগি নয় এখন। একইভাবে তাহিরপুর সদর বাজারের ওপর দিয়ে চলাচলের সড়কটির অধিকাংশ স্থানই ভাঙা। বৃষ্টি হলে এ সকল সড়ক বৃষ্টির পানি আর ময়লা মিশে একাকার হয়ে পড়ে। দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রী) ও জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান যাতায়াতে তাহিরপুর উপজেলার এ সড়কপথ ব্যবহার করে থাকেন পর্যটকেরা।
তাহিরপুর বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এরশাদ আলী বলেন, তাহিরপুর বাজার ও আশপাশের ভাঙাচোরা সড়কের কারণে ক্রেতা বিক্রেতা সকলেই চরম দুর্ভোগে আছি।
উপজেলা ইমারত নির্মাণ শ্রমিক কল্যাণ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম বলেন, উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কের বেহাল দশার কারণে গর্ভবর্তী নারী, বয়স্ক নাগরিক ও ছাত্রছাত্রীরা যাতায়াত দুর্ভোগে আছেন। এ সড়কগুলো পুণ:নির্মাণ বা সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেই।
জামলাবাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাখী রানী দে বলেন, এ সরকারের সময় হাওরাঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তবে তাহিরপুর উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক দিয়ে যাতায়াতকালে লোকজন সরকারের উন্নয়ন বার্তা পান না।
উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অনুপম রায় বলেন, জনগণের দুর্ভোগ লাগবে দ্রুতই উপজেলা সদরের তিন কিলোমিটার সড়কের পুণ:নির্মাণ চাই।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির বলেন, উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কের উন্নয়নে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, তাহিরপুর পুকুরের চারপাশ, টিএন্ডটি থেকে আব্দুজ জহুর চত্বর পর্যন্ত সড়কের কাজ চলমান। ঠিকাদার কাজে বিলম্ব করছে। আমরা বলেছি দ্রুতগতিতে কাজ না হলে আমরা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। তবে টিএন্ডটি অফিস থেকে গোবিন্দশ্রী ও আওয়ামীলীগ কার্যালয় থেকে রমেশ বর্মণের বাড়ির সড়কের বিষয়ে কোন কিছু জানাতে পারেন নি তিনি।