চলাচলের পথেই বন্যার্তরা সারছেন পয়নিস্কাশন

বিশেষ প্রতিনিধি
রাধা কান্ত বিশ্বাস, শহরের পূর্ব নতুনপাড়ায় ২ ছেলে, ১ মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে আছেন। ঘরে তার কোমর সমান পানি। গত তিন দিন হয় পাশের বাড়ি’র সিড়িতে বলে কয়ে ছেলে মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে কাটাচ্ছেন। দোতলার ছাদে গ্যাসের চুলো নিয়ে একবেলা রান্না করছেন। বললেন, ‘দুর্ভোগের শেষ নেই। করোনাকালে বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে কোথায় যাই। করোনার ভয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যাচ্ছি না। দোতলা বাড়ি যাদের রয়েছে, তারা ঘরে কাউকে আশ্রয় দিচ্ছে না, আমাদেরকে দয়া করে সিড়িতে থাকার জায়গা দিয়েছে। কিন্তু ভাতরুম করা খুবই কষ্ট। আমি দেড় কিলোমিটা দূরে যেখানে চাকরি করি ওখানে গিয়ে ভাতরুম করেছি। অনেকে বাড়ি’র সামনে সড়কে রাতে ও ভোরে পায়খানা- প্রশ্রাব সেরে ফেলছে। তিনি জানালেন, কেউ কোন সাহায্য নিয়ে এখনো আসে নি।
রাধাকান্ত জানালেন, তার আশপাশে ৫-৬ বাসায় অন্তত ৩০ জন আছেন, চৌকির উপরে চৌকি তুলে থাকছেন। ইট দিয়ে টেবিল উঁচু করে সিলিন্ডার গ্যাস দিয়ে কোন রকমে এক বেলা রান্না করে আধা পেটে খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
শহরের নবীনগরে ভাড়া বাড়িতে থাকেন ইলা রানী বর্মণ। ২ ছেলে ও ১ মেয়ে তার। তার ঘরে আশপাশের অন্যদের চেয়ে পানি কম। হাটু সমান পানি। গ্যাসের চুলোটি মঙ্গলবার ভেসেছে। কিন্তু জ¦লছে না, মালিককে জানিয়েছেন, মালিক সকাল থেকেই গ্যাসের লাইনের মিস্ত্রি খুঁজছেন, অফিসেও যোগাযোগ করেছেন, কাউকে দিয়ে কিছুই করতে পারছেন না।
ইলা রানী বললেন, একেতো করোনার ভয়, এছাড়া বড় মেয়েকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে কীভাবে যাই। কেরোসিনের একটি স্টোভ পাশের বাড়ি’র একজনের ছিলো, ওটা দিয়ে আমরা তিন পরিবার দিনে একবার রান্না করে দুইবার কোনভাবে খেয়েছি। আমার বড় ছেলে সঞ্জয় ৩ দিন হয় বাসায় আসে নি। যেখানে কাজ করে, ওখানেই অফিসে থাকছে। করোনার জন্য হোটেল রেস্তোরায় এখন খাবার পাওয়া যায় না। দু’দিন ধরে দোকান থেকে ব্রেড কলা কিনেই খেয়ে আছে সে।
কেবল রাধা কান্ত বিশ^াস ও ইলা রানী বর্মণ নয় সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার ৮০ ভাগ মানুষেরই এমন চিত্র দাবি সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত’এর।
নাদের বখ্ত জানান, সুনামগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৮ টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে সোমবার শুকনো খাবার, মোমবাতি ও দিয়াশলাই বিতরণ হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যারা ওঠেননি, তাদেরকে ১০ কেজি করে চাল ও ২ কেজি আলু পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এখনো পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্র গুলোয় ২৫০০ পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার মতোই শহরতলির গ্রামগুলোর মানুষেরাও দুর্ভোগে রয়েছেন।
এদিকে, সুনামগঞ্জের জনপদে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢল কম নামায় নদীর পানির উচ্চতা কিছুটা কমেছে। সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে মঙ্গলবার দুপুর ১২ টায় পানি বিপদ সীমার ১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৪৪ মিলিমিটার। উজান থেকে অর্থাৎ মেঘালয়- চেরাপুঞ্জি থেকে পানি গত ২৪ ঘণ্টায় কম নেমেছে। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ী নদী যাদুকাটার পানির উচ্চতা মঙ্গলবার সকাল ৯ টায় বিপদ সীমার ৮২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে যাওয়ায় সীমান্ত এলাকায় কিছুটা স্বস্থি এসেছে।