চলেন গেলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার

আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন
তাঁর সাথে আমার শেষ দেখা গত চব্বিশ মার্চ ঢাকায়। ঐ দিনই আমি তওফিক ভাইর সাথে তার গাড়িতে ভাবি সহ ঢাকায় যাই। সারাদিনের এ সফর ছিল খুবই রোমাঞ্চকর। পথে অসংখ্য বার শাহরিয়ার ভাই তত্তফিক ভাইয়ের খবর নিয়েছিলেন। দেরির কারণ জানতে চেয়েছিলেন।
অবশেষে রাত আটটার দিকে আমরা তাঁর বাসায় পৌঁছি। তওফিক ভাই বললেন, শাহরিয়ারের সাথে দেখা করে যাও। গিয়ে দেখি তিনি সোফায় শুয়ে আছেন। চাদর গায়ে দিয়ে বললেন, জ্বর এসে গেছে। জানালেন তাঁর প্রশ্রাবে সমস্যার কথা। এটা তার পুরান রোগ। আমার কিছুটা জানা ছিল। তিনি শুয়ে শুয়ে আমার জন্য একটি উবারেরও চেষ্টা করেছিলেন। বললেন সব ক্লোজড দেখাচ্ছে। তিনি খেয়ে আসার জন্যও বলেছিলেন। তারপর বলল্লেন আরেকদিন তার বাসায় বেড়াতে যেতে। বিদায় নিয়ে চলে যাই নিজ ঠিকানায়।
আজ এসব কথা মনে হচ্ছে। কারণ তিনি আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। আজই দুপুরে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তওফিক ভাই কেঁদে কেঁদে খবরটি জানালেন। এর আগে আরেকবার তার চিকিৎসার খবর জানিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার আমাদের এলাকার কৃতী সন্তান। তাই স্বাভাবিক কারণে তাঁকে নিয়ে আমরা গর্ব করতাম। তার পিতা মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন একজন পথিকৃত সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। তার ভাই হোসেন তওফিক চৌধুরীও সাংবাদিকতা করেছেন দীর্ঘদিন। তাদের সাথে এ সুবাদে আমার উঠা-বসা ও আন্তরিকতা।
শাহরিয়ার ভাই আমার দু’বছরের সিনিয়র ছাত্র ছিলেন। তিনি ৬২ তে আর আমি ৬৪ সালে সরকারি জুবিলী হাইস্কুল শেষ করি। শাহরিয়ার ভাই ছাত্রজীবনেই প্রথমে সুরমা ও পরে ইত্তেফাক প্রতিনিধি হিসাবে সাংবাদিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আমি যখন কলেজে ভর্তি হই তখন তিনি চলে গেলেন করাচি। তৎকালীন পাকিস্তানের রাজধানী শহরে। তিনি সেখানে পড়াশুনার পাশাপাশি সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। ইংরেজী দৈনিক ডন, সান্ধ্য দৈনিক ইভনিং স্টার প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি কর্মরত ছিলেন।
আমি যখন ঢাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি সাপ্তাহিক নওবেলাল, জয়বাংলা ও বাংলাদেশ পত্রিকায় কাজ করতাম তখন তিনি নওবেলালের জন্য সংবাদ পাঠাতেন করাচি থেকে। তাই যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।
শাহরিয়ার ভাই করাচি প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ঢাকায় এসে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় যোগদান করেন। তার রিপোর্টিং এর হাত খুবই শক্ত ছিল। তিনি আন্তর্জাতিক মহলে সাংবাদিকতার জগতে সুবিদিত ছিলেন। তিনি নিউজউহক, খালিস্তান টাইম প্রভৃতি পত্রিকার প্রতিনিধি ছিলেন।
শাহরিয়ার ভাই ইত্তেফাকে আমার বিয়ের ছবিসহ ছোট্ট খবর ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। হয়েছিলেন কমনওয়েলথ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি।
তিনি অনেকগুলো বই রেখে গেছেন। তন্মধ্যে হাসান শাহরিয়ার সাংবাদিকতার জীবন্ত কিংবদন্তি, যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা, অতীত অতীত নয়, শেষ ভাল যার সব ভাল তার, নিউজউয়েকের চোখে বাংলাদেশ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
তারা ছিলেন তিন ভাই, তিন বোন। এখন একমাত্র তওকিফ ভাই তাদের মধ্যে সবেধন নীলমনি। এর আগে বাকীরা একে একে সবাই পরপারে চলে গেছেন। তাই এ দুই ভাইয়ের এমন মিল ছিল যা বলার নয়। তওফিক ভাইয়ের কাছে শাহরিয়ার ভাই একদিকে আর বাকী দুনিয়া ছিল অন্যদিকে। তওফিক ভাই করুণ সুরে বলতেন, আমাদের তো আর কেউ নেই।
তার এ চলে যাওয়া আমাদের এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। যা আর কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও গবেষক