চার বছর পর আবার বিশ্বকাপ

এনাম আহমদ
কাতার পারস্য উপসাগরের তীরে ছোট্ট একটি দেশ। এর দক্ষিণে সৌদি আরব ও পশ্চিমে বাহরাইন। বাকী দুইদিকে পারস্য উপসাগর। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ মতো কাতারও উত্তপ্ত ও শুষ্ক মরু দেশ। এখানে ভূপৃষ্ঠে কোন জলাশয় নেই এবং উদ্ভিদের সংখ্যাও খুবই কম। ২৬ লক্ষ জনসংখ্যার বেশির ভাগ লোকই রাজধানী দোহায় বসবাস করে। এদের মধ্যে বেশির ভাগ লোকই বিদেশি। দেশটিতে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় মজুদ রয়েছে। এ কারণে এর অর্থনীতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯৭১ সালে এটি ব্রিটিশদের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। বর্তমানে মাথাপিছু আয়ের হিসেবে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ। সম্ভবত এ কারণেই বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আসরটি আয়োজন করতে যাচ্ছে কাতার। এতে তাদের ব্যবসাও ভালো হবে। ফিফার হিসেব অনুযায়ী এবারের বিশ্বকাপ থেকে কাতার আয় করবে ৬০০ কোটি ডলার।
বিশ্বকাপ ফুটবল সাধারণত গ্রীষ্মকালে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রচন্ত দাবদাহ বিবেচনা করে এবার শীত মৌসুমে সরিয়ে আনা হয়েছে। এতে দর্শকরা এবার কোয়ালিটি সম্পন্ন খেলা দেখতে পারবেন। কারণ অন্যান্য বছর খেলোয়াররা খেলতেন ক্লাব ফুটবল খেলে একেবারে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে। এবার খেলবেন ক্লার ফুটবলের মাঝামাঝি পর্যায়ে একেবারে পূর্ণ উদ্যমে!
ইতোমধ্যে বিশ্বকাপের জন্য কাতার কর্তৃপক্ষ সাত সাতটি নতুন স্টেডিয়াম তৈরী করেছেন। একটি পুরাতন স্টেডিয়াম সহ মোট আটটি স্টেডিয়ামে খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হবে। নতুন তৈরি হওয়া সাতটি স্টেডিয়াম অত্যন্ত নানন্দিক। আরবের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে মিল রেখে এগুলো তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন লুসাইল স্টেডিয়ামে হবে ফাইনাল। আলাদা নজর কেড়েছে আল-বাইত ও আল- জানুব স্টেডিয়াম। এ দুটি ভেন্যুই গড়ে তোলা হয়েছে আবর সাগরের ঐতিহ্যবাহী মুক্তার আদলে! বিশ্বকাপের পরে কাতারের আর এতোগুলো স্টেডিয়ামের প্রয়োজন হবে না। এজন্য কর্তৃপক্ষ বিশ্বকাপের পরে কয়েকটি স্টেডিয়াম দরিদ্র দেশে দান করে দেবেন বলে মনস্থির করেছেন! বিশ্বের প্রায় ১৫ লক্ষ দর্শক এবার কাতার যাবেন খেলা দেখতে, যা তাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেও বেশি! কাজে আবাসন, যাতায়াতের ঝক্কি ঝামেলা পোহানোর সম্ভাবনা আছে। এই সমস্যা নিরসনের জন্য চালু করা হয়েছে পাঁচ লেনের মহাসড়ক ও ৩৬ বিলিয়ন ডলার খরচ তৈরি করা হয়েছে মেট্রোরেল। যা যাতায়াতকে সহজ করে তুলবে। তা ছাড়া ৮ টি স্টেডিয়ামের সবগুলোই ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। এতো সুবিধা হলো না অসুবিধে হবে, তা খেলা শুরু না হলে বুঝা যাবে না।
সাধারণত নভেম্বর -ডিসেম্বর মাসে কাতারের তাপমাত্রা থাকে ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত। কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম ভাবে তাপমাত্রা আরো কমানোর ব্যবস্থা করেছেন! এক বিশেষ ভেন্টের মাধ্যমে বাতাস ঠান্ডা করে গ্যালারীর তাপমাত্রা নামিয়ে আনা হবে ২১-২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাঠের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করবে ঘাসের নিচে থাকা ৩৫০টি স্বয়ংক্রিয় সেন্সর। ধুলোবালি সরানোর জন্য নিয়মিত বিরতিতে বাতাস ফিল্টারের ব্যবস্থাও আছে সেখানে!
কাতারে ফুটবল খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু এর আগে বিশ্বকাপে খেলার কোন অভিজ্ঞতা কাতারের নেই! ২০১০ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার দিন থেকেই বিতর্ক শুরু হয় ফুটবল বিশ্বে। কাতারের বিরুদ্ধে অনৈতিক ভাবে পয়সা খরচ করে ফিফার তৎকালীন কমিটিকে প্রভাবিত করে বিশ্বকাপের ভেন্যু ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল আয়োজন হওয়ার জন্য। কিন্তু শেষপর্যন্ত একেবারে ছোট এবং অনভিজ্ঞ কাতারকে আয়োজন করার দায়িত্ব দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয় ফিফা। দায়িত্ব পেয়ে দ্রুত স্টেডিয়াম, রাস্তাঘাট, মেট্রোরেল তৈরি করতে গিয়ে প্রচুর বিদেশি শ্রমিককে নিয়ে যাওয়া হয় কাতার। বিপত্তি ঘটে সেখানেও! শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বারবার। দিন যতো গড়িয়েছে, মানবাধিকার, শ্রমিক সংগঠনগুলো জোড়ালো প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বিশ্বকাপ অবকাঠামো তৈরী করতে গিয়ে নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার শ্রমিক মারা যান বলে অভিযোগ উঠে! কাতারের অনিরাপদ কর্ম পরিবেশ থেকে শুরু করে প্রায় দাসত্বের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল কাতার! (চলবে)
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।