চাহিদামাফিক টাকায় দ্রুত, নইলে সার্ভার প্রবলেম

বিশ্বজিত রায়
‘জন্ম নিবন্ধনের কাগজটি দিছি আট-নয়মাস হয়। আমি ভাবছি না কাগজটি আনতে যে আট-নয় মাস হইব। পাঁচশডা টেকা দিছি। বাংলারে ইংলিশ করার লাগি। আমার স্ত্রীর একটা, আমার একটা আর আমার মেয়ের একটা, তিনডা। তিনডায় পাঁচশ’ টেকা কইছে আমি সাথে সাথে দিয়া দিছি সালাউদ্দীন ভাইরে।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে কথাগুলো বলছিলেন সাচনা বাজার ইউনিয়নের ভরতপুর গ্রামের স্বাধীন রঞ্জন দাস।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি থাকতাম পারি না, সময়ও পাই না। আমার ভাই যে বিমল, তারে দায়িত্ব দিছলাম আনার লাগি। সে অনেকবার গিয়াও কাগজ আনতে পারে নাই, এখন কি করতাম?’
একই ইউনিয়নের হরিহরপুর বাগহাঁটি গ্রামের আবুল কাসেম জানিয়েছেন, তিনি পরিবারের পাঁচজনের জন্মনিবন্ধন করতে এক সপ্তাহ ধরে সালাউদ্দিনের কাছে হাঁটাহাটি করছেন। পাঁচ নিবন্ধনে ১৫০ টাকা করে ৭৫০ টাকা তিনি আগেই দিয়ে দিছেন। সবকটি হয়ে গেছে একটার একটু সমস্যা আছে। আগামীকাল যাওয়ার কথা বলেছে সালাউদ্দিন।
জামালগঞ্জে ইউনিয়ন পরিষদে জন্ম নিবন্ধন করতে এসে জন্মের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। উদ্যোক্তা নামের ব্যক্তির কাছে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ছে স্ব-স্ব ইউনিয়নের সেবা গ্রহীতারা। শুধু ইউনিয়ন পরিষদই নয় জন্ম নিবন্ধনের ভুল সংশোধন করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় গিয়েও মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা ই-সেবা কেন্দ্র দুই জায়গায় ক্রমাগত দৌঁড়ঝাঁপের পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা গুণে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরছে মানুষ। সংশ্লিষ্ট ইউপি সচিবদের যোগসাজশে উদ্যোক্তারা সেবা গ্রহীতাদের বেকায়দায় ফেলে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে বলেও কথা উঠছে। উর্ধ্বতনরা অবশ্য হয়রানি কিংবা বাড়তি টাকা নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোটা অংকের উৎকোচ দিলে দ্রুত, আর না দিলে সার্ভার প্রবলেম কিংবা অন্যকিছুর দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষকে নজিরবিহীন হয়রানি ও ভোগান্তির মুখোমুখী দাঁড় করানো হচ্ছে। যদিও লোকবল সঙ্কটসহ সার্ভার প্রবলেম প্রতিটি ইউনিয়নেই রয়েছে, এটা সত্য। তবে দাবি অনুযায়ী বাড়তি টাকা দিলে কম সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজ কিভাবে বের হয়ে আসে এই প্রশ্ন অনেকের।
উপজেলার প্রায় সবকটি ইউনিয়নেই জন্ম নিবন্ধন করতে এসে অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এক্ষেত্রে সাচনা বাজার, জামালগঞ্জ সদর ও উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ ভোগান্তি ও বাড়তি টাকা আদায়ের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে দাবি অনেকের। সাধারণ মানুষের হয়রানির বিষয়টি কারও নজরে না আসায় জনমনে চরম অস্বস্তি ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা যায়, ২০০৪ সালে জন্মনিবন্ধন আইন করার পর কার্যকর হয় ২০০৬ সালে। শুরুতে হাতে লেখা সনদ ছিল। ২০১০ সালের শেষদিকে এসে তা ডিজিটালে রূপান্তরিত হয়। সরকার বিয়ে নিবন্ধন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকরিতে নিয়োগ, জমি রেজিস্ট্রেশন, ভোটার তালিকা তৈরিসহ ১৭টি সেবার ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে। প্রায় সর্বক্ষেত্রেই জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করায় জরুরী প্রয়োজনে মানুষ স্ব-স্ব ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে হন্যে হয়ে ছুটছে। কিন্তু নিয়মবহির্ভুত আর্থিক সুবিধা গ্রহণসহ সার্ভার সঙ্কটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিক সেবা। চাহিদা অনুযায়ী টাকা গুণতে পারলে, নির্ধারিত সময়েরও কম সময়ে পাচ্ছে জন্ম নিবন্ধন। যারা উৎকোচ দিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন তারা দিনের পর দিন হেঁটে কুল-কিনারা পাচ্ছেন না।
ইউনিয়ন পরিষদের সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনলাইন জন্ম নিবন্ধন ও সনদ জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে বিনামূল্যে, ৫ বছর পর্যন্ত ২৫ টাকা এবং ৫ বছরের ঊর্ধ্বে ৫০ টাকা নেওয়ার কথা। এ সেবা ৭ কার্যদিবসের মধ্যে দেওয়ার কথা বলা আছে। এছাড়া জন্ম নিবন্ধনের দ্বি-নকল সনদ তিন কার্যদিবসের মধ্যে ৫০ টাকা এবং জন্ম নিবন্ধন সংশোধন ১০০ টাকা রশিদ মূলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রদান করার কথা উল্লেখ আছে। বাস্তবে এর কানাকড়িও মানা হচ্ছে না। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনিয়ন পরিষদের এক গ্রাম পুলিশ জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদে চাকরির সুবাদে পাড়া-প্রতিবেশী নতুন জন্ম নিবন্ধনসহ পুরোনো নিবন্ধনে ভুলভ্রান্তি ঠিক করতে বলেন। ইউনিয়ন পরিষদ ভুল সংশোধন করতে আমার কাছ থেকেই ২০০ টাকা রাখে। পরে ইউএনও অফিসের ই সেবা কেন্দ্রের সাইদুর ভাইয়ের কাছে গেলেও টাকা লাগে। তিনি আমার কাছ থেকে ১০০ টাকা রাখলেও আমার সামনেই যার কাছ থেকে যত পারছেন, নিচ্ছেন।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের কালীপুর গ্রামের সোহেল রানা বলেন, আমার এক গার্জিয়ান উত্তর ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েছিলেন জন্ম নিবন্ধন করার জন্য। তার কাছে তিন হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল (কে চেয়েছে নাম বলেননি)। পরে তিনি টাকা দেননি।
ভোগান্তির শিকার কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি পরিষদের সভাপতি বিদ্যুৎ জ্যোতি চক্রবর্ত্তী বলেন, এক সচিব ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের কোন লোকবল নেই। কম্পিউটার চালনায় অদক্ষ মানুষ দিয়ে কাজ পরিচালনা করায় কেবল ভুল আর ভুল। ভুল সংশোধনের যে পদ্ধতি সেটাও লম্বা প্রসেস। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে উৎকোচ দাবীদাররা। তাতে সাধারণ মানুষ হেনস্থার শিকার হচ্ছে।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউপি সচিব প্রদীপ রায় বলেন, জনভোগান্তি দূর করতে সরকারিভাবে ক্যাম্পেইন চলছে। ক্যাম্পেইনের পর থেকে এ ভোগান্তি নেই। এখন মাঠপর্যায় থেকে তথ্য আনা হচ্ছে। কোন ইউনিয়নেই এখন জন্ম নিবন্ধনের জটলা নেই। তিনি দাবি করলেন, উদ্যোক্তা না যে কেউ, নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত টাকা নিলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, জন্মনিবন্ধনের বিষয়টিতে দফায় দফায় মিটিং করে সতর্ক করা হয়েছে। আমরা কড়াকড়িভাবে মনিটরিং করছি। নিবন্ধনের সংশোধনটা একদিনের মধ্যে সংশোধন করে দিতে হবে। আমার কার্যালয়ে যদি আমার কাছে সংশোধনীর জন্য আসে সেটা সরাসরি আমি দেখছি। কারও কাছে যাওয়া লাগবে না, আমার অফিসেও আসা লাগবে না। এটা অনলাইনে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমার কাছে আসবে। আমি ছয় ঘন্টার মধ্যে নিষ্পত্তি করে দেব। কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।