ছনবাড়ী-ইসলামবাজার সড়ক সংস্কার ও পাকাকরণের দাবি

বিজয় রায়, ছাতক
ছাতকের সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের ছনবাড়ী-ইসলামবাজার সড়ক সংস্কার ও পাকাকরণের দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী। তারা মনে করেন উপজেলার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১৮ হাজার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে এ সড়কটিই হতে পারে একটি বৃহৎ মাইলফলক।
জানা যায়, সীমান্তবর্তী মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য আশি দশকের শেষের দিকে মাটি ভরাটের মাধ্যমে এ সড়ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময়ে মাঝে-মধ্যে টুকটাক কাজ হলেও প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বড় ধরনের কোন সংস্কার কাজ করা হয়নি সড়কে। প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ কাঁচা সড়ক পাকাকরণেও নেয়া হয়নি কোন উদ্যোগ। ফলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের ২৫-৩০টি গ্রামের প্রায় ১৮ হাজার মানুষের সহজ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো মান্দাদার আমলের মতোই রয়েছে।
সীমান্তবর্তী মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যোগাযোগের ক্ষেত্রে অবহেলিত ইসলামপুর ইউনিয়নের মানুষকে পিছনে রেখেই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সরকার বাহাদুর। সীমান্তবর্তী এসব মানুষের ভাগ্য সরকারের উন্নয়নের মহাসড়কে যুক্ত হতে পারেনি।
ভৌগোলিক দিক বিবেচনায় সুনামগঞ্জ জেলার বৃহত্তম ইউনিয়ন ইসলামপুর। পাহাড়ি নদী পিয়াইন ও চেলা ইসলামপুর ইউনিয়নের বুক চিরে ছাতকে এসে সুরমা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। নদী, অসংখ্য খাল-বিল ছাড়াও এ ইউনিয়নের রয়েছে ছোট-বড় পাহাড় ও টিলা। চুনাপাথর আমদানীর ক্ষেত্রে উপজেলার একমাত্র শুল্ক স্টেশন ইছামতি ইসলামপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। প্রতিদিন এ শুল্ক স্টেশন দিয়ে লক্ষ-লক্ষ টন চুনাপাথর আমদানী করে ইছামতি এলাকায় ডাম্পিং করে রাখেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া মরা চেলা নদী বালু মহালও রয়েছে এ ইউনিয়নে। বালু ও চুনাপাথর থেকে প্রতি অর্থবছর প্রচুর পরিমানে রাজস্ব জমা হচ্ছে সরকারি কোষাগারে। আমদানীকৃত চুনাপাথর ডাম্পিং সাইড থেকে শুধুমাত্র বর্ষা মৌসুমে নৌকাযোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ইউনিয়নে দেশের বৃহত্তম ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
অভিজ্ঞজনরা মনে করেন, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ইসলামপুর ইউনিয়নের উন্নয়নের মাধ্যমে গোটা উপজেলার ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। ভৌগোলিক জটিলতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনরকম অন্তরায় হতে পারে না। উপজেলার প্রথম শ্রেণির একটি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে নোয়ারাই ও ইসলামপুর ইউনিয়নের অবস্থান সুরমা নদীর উত্তর পাড়ে। যে কারণে উপজেলা সদরের সাথে ইসলামপুর ইউনিয়নের সরাসরি কোন সড়ক যোগাযোগ নেই। ভৌাগোলিক জটিলতার কারণে ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সাথেও ইউনিয়নের শতকরা ৮০ ভাগ গ্রামের নেই সড়ক যোগাযোগ। ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষ উপজেলা সদরে আসা-যাওয়ার জন্য ক্যাম্পের বাজার-ফকিরটিলা সড়ক ছিল একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থা। এ সড়কটিও সংস্কারের অভাবে বর্তমানে অস্থিত্ব সংকটে পড়েছে। ফলে সীমাস্ত অঞ্চলের মানুষ উপজেলা সদরে আসতে হয় ইছামতি বাজার থেকে নৌকা যোগে ছাতক, নতুবা কোম্পানীগঞ্জ থেকে সিলেট হয়ে ছাতক অথবা ইছামতি বাজার থেকে মোটরসাইকেলে চেলা নদীর মুখ, পরে নদী পাড়ি দিয়ে আবারো মোটরসাইকেল যোগে দোয়ারা উপজেলার নরসিংপুর বাজার থেকে ফকিরটিলা বা নোয়ারাই হয়ে ছাতকে পৌঁছা ছাড়া আর কোন সহজ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
ছনবাড়ী-ইসলামবাজার সড়কটি সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কটির ছৈদাবাদ এলাকায় রয়েছে একটি মাত্র কালভার্ট। কাঁচা এ সড়কটি আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত অনেকটাই সোজা। গাড়ি না চললেও মোটরসাইকেল যোগে অথবা পায়ে হেঁটে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ এ সড়ক দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সহজেই যাতায়াত করে আসছিল। সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যায় কালভার্টের এপ্রোচসহ সড়কটির বিভিন্ন অংশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। ফলে এ সড়ক দিয়ে জনচলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের উপজেলা সদরে পৌছতে প্রায় দু’ঘন্টা সময় লেগে যায়। ছনবাড়ি-ইসলামবাজার সড়কটি সংস্কার ও পাকাকরণ করা হলে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের মধ্যেই উপজেলা সদরে পৌঁছতে পারবে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ। ইউনিয়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কার ও পাকাকরণ করা হলে ছনবাড়ি, ছনবাড়ী বাজার, রাশনগর, ধনিটিলা, রতনপুর, নিজগাঁও, বাগানবাড়ি, নতুনবস্তি, গাংপার-নোয়াকুট, বনগাঁও, বৈশাকান্দি, পুরান-নোয়াকুট, দারোগাখালি, পুরান-দারোগাখালি, কাজীরগাঁও, লুবিয়া, রহমতপুর, বাহাদুরপুর, ছৈদাবাদ, আলমপুর, রাবারড্যাম বাজার, শারফিন বাজার, নয়া বাজার, ইছামতি বাজার, হাদা-চানপুর, পান্ডব, ইসলামবাজার সহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ সহজেই উপজেলা ও জেলা সদরে যাতায়াত করতে পারবে।
১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রউফ জানান, সড়কটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বড় ধরনের কোন সংস্কার করা হয়নি। ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হেকিম তার দায়িত্বকালীন সময়ে সড়কের কিছু অংশে মাটি ভরাট কাজ করে ছিলেন। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ক্ষেত্রে দুর্ভোগ লাঘবে সড়কটি সংস্কার করতে মুহিবুর রহমান মানিক এমপি’র কৃপা দৃষ্টি কামনা করেছেন তিনি।
সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দা মঈন উদ্দিন, ফজর আলী, আব্দুল মান্নান, মাসুক আলী, রফিক আলী জানান, অন্তত ১৫-২০টি গ্রামের মানুষের জন্য এ সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়কটি সংস্কার না হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ইসলামপুর ইউনিয়ন বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সভাপতি, ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান কামরুল ও আদিবাসী যুবনেতা মিলন সিংহ জানান, এলসির মাধ্যমে চুনাপাথর আমদানীর একমাত্র স্পট ইছামতি। এ সড়কটি পাকাকরণ করা হলে জনদুর্ভোগ লাঘবের পাশাপাশি পরিবহন খরচ অনেকটাই কমে যাবে। এছাড়া সীমান্ত অঞ্চলের সাথে উপজেলা সদরের দহরম-মহরম বৃদ্ধি পাবে। সীমান্তের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদেরও সাদর আমন্ত্রন জানাবে এ সড়ক। এতে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে।
রাবারড্যাম পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল জব্বার খোকন জানান, এক সময় সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের পদচারণায় এ সড়কটি ছিল মুখরিত। সাম্প্রতিক বন্যায় সড়কটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়কটি সংস্কার ও পাকাকরণ করা এ অঞ্চরের মানুষের এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হেকিম জানান, তার দায়িত্বকালীন সময়ে সড়কের উন্নয়নে কাজ করার চেষ্টা করেছেন তিনি। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় তিনি সম্পূর্ণ সড়কের সংস্কার কাজ করতে পারেননি। অবহেলিত সীমান্তবাসীর ভাগ্য পরিবর্তনে সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।