ছাতক-সুনামগঞ্জ রেলপথ কোন পথে, দ্বন্দ্বে বিলম্বিত হতে পারে উন্নয়ন

বিশেষ প্রতিনিধি
ছাতক-সুনামগঞ্জ-মোহনগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ ইস্যু নিয়ে সুনামগঞ্জের জনপ্রতিনিধিদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য গত দুইদিন হয় সুনামগঞ্জের প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেছে। সুনামগঞ্জবাসী মনে করছেন, বিভেদের কারণে সুনামগঞ্জ জেলাবাসীর বহুদিনের রেলপথের দাবির বাস্তবায়ন না হলে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের উপরই ক্ষুব্ধ হবে মানুষ। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন এমপি এই বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি বলেছেন, কেউ কেউ এই বিষয়ে আমাকে জড়ানোয়, আমি স্তম্ভিত।
প্রায় ৬৬ বছরেরও আগে (১৯৫৪ সালে) সুনামগঞ্জের থানা শহর ছাতক পর্যন্ত রেললাইন এসেছে। কিন্তু সুনামগঞ্জ জেলা শহর এখনো যুক্ত হয় নি রেল লাইনের সঙ্গে। সুনামগঞ্জের উৎপাদিত ধান, সবজি, মাছ, পাথর কম পরিবহন খরচে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর জন্য রেলপথের দাবি বহুদিনের। ১৯৬১ সালে হাসননগরের বাসিন্দা তৎকালীন সিলেট ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের সদস্য রাবেয়া লেইস প্রথম ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের সভায় এই দাবি তুলেছিলেন। এরপর ২০১১ সালে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেয়। ২০১৪ সালে রেলমন্ত্রী, রেল সচিবকে এই বিষয়ে অনুরোধপত্র পাঠান সুনামগঞ্জের সন্তান তৎকালীন পিএসসি চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ এই বিষয়ে সংসদে কথা বলেন।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে’এর পক্ষ থেকে সুনামগঞ্জ-ছাতক রেল লাইনের সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এরপরে একাধিকবার সুনামগঞ্জ-ছাতক রেললাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়।
গত সোমবার সুনামগঞ্জের পাঁচজন সংসদ সদস্য যথাক্রমে মুহিবুর রহমান মানিক, পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, ড. জয়া সেন গুপ্তা ও শামিমা শাহরিয়ার রেলপথমন্ত্রী বরাবর একটি ডিও লেটার দেন।
এমপিরা ডিও লেটারে লিখেন, আগের এলাইনমেন্ট অনুযায়ী (ছাতক বাজার-শিবপুর-হাসনগর পর্যন্ত) কাজ না হলে ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ জেলা সদর পর্যন্ত রেললাইন টানার যে সুলভ ও সহজ পথটি রয়েছে, সেটি রুদ্ধ হয়ে যাবে। ছাতক থেকে মাত্র ২৭ কিলোমিটার লাইন টানলেই রেলের সঙ্গে সহজে যুক্ত হবে সুনামগঞ্জ জেলা সদর। বর্তমানে যেদিকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ঘোরানো-পেঁচানো ৫০ কিলোমিটার হাওরের দুর্গম এলাকা দিয়ে নির্মাণ করতে হবে রেললাইন। ফলে নির্মাণ ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
সুনামগঞ্জে রেল লাইন স্থাপনের জন্য রেলমন্ত্রীর কাছে বৃহস্পতিবার ডিও লেটার পাঠিয়েছেন সিলেট- ১ আসনের সংসদ সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বৃহস্পতিবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের কাছে প্রেরিত ডিও লেটারে রেলপথ বাস্তবায়নে সুনামগঞ্জের পাঁচ সংসদ সদস্যের সাথে একমত পোষণ করে চিঠি পাঠান তিনি।
ছাতক-দোয়ারাবাজারের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক শনিবার এই প্রতিবেদককে বললেন, সংসদে বার বার আমি ছাতক-সুনামগঞ্জ রেলপথের কথা বলেছি, ছাতক-শিবগঞ্জ-শ্রীপুর-বেতগঞ্জ হয়ে রেললাইন সুনামগঞ্জে আসার জন্য আগে থেকে সমীক্ষা হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ থেকে রেললাইন সুনামগঞ্জে আসতে হলে বহু মানুষের বসতি তুলে দিতে হবে। ব্যয়ও বাড়বে। অথচ. পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান সাহেব সেদিকেই মত দিয়েছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই পথের মানুষজন সড়ক পথেই চলাচল করে আসছেন, তাদের রেলপথের প্রয়োজন নেই।
সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ও বললেন, ছাতক থেকে দোয়ারাবাজারের শিবপুর হয়ে রেলপথ আসলে জীব বৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে না, নদী থেকেও এই পথ তিন কিলোমিটার দূরে। দোয়ারাবাজারের বিপুল সংখ্যক মানুষও যাতায়াত ব্যবস্থায় তাতে উপকৃত হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট বললেন, পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান সাহেব রেলপথ কোন দিকে যাবে, এই নিয়ে কোন মতামত দেন নি। একজন সংসদ সদস্য বিভেদ সৃষ্টি করে রাখার জন্য তাঁর (পরিকল্পনা মন্ত্রী) নাম জড়িয়েছেন।
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান, সুনামগঞ্জের বাসিন্দা কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক বললেন, ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথের দাবি বহুদিনের। সমীক্ষার কাজও হয়েছে। সুনামগঞ্জ থেকে মোহনগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন হলে ভালো, কিন্তু সেটি অনেক ব্যয়বহুল। এখনো এই অংশের সমীক্ষাও হয় নি। ছাতক-সুনামগঞ্জের রেল লাইনের কাজ যেহেতু বহুদুর এগিয়েছে, এই কাজটি হলে সুনামগঞ্জবাসীর স্বপ্নপূরণ হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম বললেন, সুনামগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ আসুক চাই আমরা। রেলপথের পথ নিয়ে দ্বন্দ্বে, এই উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হলে, কাউকেই ছাড় দেবে না জেলাবাসী।
রেলওয়ের ডিজি ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার শনিবার বিকালে এ প্রতিবেদককে বললেন, ছাতক-সুনামগঞ্জের রেল লাইন সম্প্রসারণের কাজ প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আমরা এই রেলপথ কোন পথে যাবে, এর একটি সমীক্ষা করেছি। সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্যগণ তাতে দ্বিমত পোষণ করেছেন। আমাদের যারা কাজ করেছেন, তারা টেকনিক্যাল পার্সন, সংসদ সদস্যগণ রাজনীতি করেন, তাদের মতামতের বিষয়টি সমন্বয় করবেন মাননীয় রেলমন্ত্রী। এই বিষয়ে এর বেশি বলতে চান নি তিনি।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান বললেন, আমি স্তম্ভিত, আমি চিন্তাও করতে পারি নি আমার সহকর্মীরা আমাকে এই বিষয়ে জড়াবেন। ছাতক-সুনামগঞ্জের রেলের এলাইনমেন্ট নিয়ে আমি রেলমন্ত্রী কিংবা রেল সচিব কারো সঙ্গে কথা বলি নি, কোন চিঠিও দেই নি। রেল মন্ত্রণালয়ে বিজ্ঞ মন্ত্রী আছেন, ওখানে সচিব আছেন, অন্যান্য কর্মকর্তা আছেন. টেকনেশিয়ানরা আছেন তারা স্টাডি করবেন। পথ নির্ধারণ করবেন। সরকারের সিন্ধান্ত হবে। সরকার বা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের সহযোগিতা করা হবে আমার কাজ। আমি রেল মন্ত্রণালয়কে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণের কথা বার বার বলেছি। কোন পথে রেল যাবে, আমি মুখে কিংবা লিখিতভাবে কাউকে বলি নি। এই বিষয়ে অযথাই আমাকে হেয় করা বা জেলাবাসীর উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা সমীচিন নয়। এই বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে চিঠি নেবারও প্রয়োজন ছিল না।